১৭ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

ফিরোজ মান্না ॥ কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ ‘কোন এক মাকে’ কবিতায় লিখেছেন, ‘কুমড়ো ফুলে ফুলে/নুয়ে পড়েছে লতাটা/ সজনে ডাঁটায়/আর, আমি ডালের বড়ি/শুকিয়ে রেখেছি/খোকা, তুই কবে আসবি/কবে ছুটি?’ চিঠিটা তার পকেটে ছিল/ ছেঁড়া আর রক্তে ভেজা।’ একুশের আবেগ বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে দেশের বুদ্ধিজীবী শিল্পী সাহিত্যিকরা ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভাষা অন্দোলনের পটভূমি, ঘটনাপঞ্জি ও বাঙালীর চেতনা নিয়ে রচিত হয়েছে বিভিন্ন প্রকার দেশাত্মবোধক গান, নাটক, গল্প, কবিতা, উপন্যাস ও চলচ্চিত্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচিত ও আলতাফ মাহমুদ সুরারোপিত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো গানটি।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পর থেকেই বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাষা আন্দোলনের প্রভাব সূচিত হয়ে আসছে। রচনাগুলোর মধ্যে শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী রচিত নাটক কবর, কবি শামসুর রাহমানের কবিতা বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা এবং ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, জহির রায়হানের উপন্যাস একুশে ফেব্রুয়ারি, কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমানের আর্তনাদ উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ভাষা আন্দোলনকে উপজীব্য করে নির্মিত হয়েছে জহির রায়হান পরিচালিত চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া।

তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের অনেক বাঙালী মনে করেন, বাংলাভাষা আন্দোলন হয়েছিল জাতিগত জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে। এ আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানের দুই অংশের সংস্কৃতির পার্থক্যগুলো সুস্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানে এ আন্দোলনটি পাকিস্তানী জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে বিভাগীয় উত্থান বলে মনে করা হয়। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রে ‘একমাত্র উর্দু’ নীতি প্রত্যাখ্যান করাকে মুসলমানদের পারসিক-আরবী সংস্কৃতি এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠার মূল মতাদর্শের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কয়েক শক্তিশালী রাজনীতিবিদ মনে করেন, ‘উর্দু’ হলো ভারতীয় ইসলামী সংস্কৃতির অংশ, আর বাংলাকে তারা হিন্দু সংস্কৃতির সংমিশ্রণে তৈরি বাংলা সংস্কৃতি হিসেবে বিবেচনা করতেন। অধিকাংশই যারা ‘একমাত্র উর্দু’ নীতির পক্ষে ছিলেন। তারা মনে করতেন যে, উর্দু কেবল পাকিস্তান দেশের ভাষা হিসেবেই নয়, বরং গোটা জাতির ভাষা হিসেবে উর্দুকে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। এ ধরনের চিন্তা-ভাবনাও উর্দু নীতির বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কেননা, পাকিস্তানে তখন আরও কিছু ভাষাগত পার্থক্যের সম্প্রদায় ছিল।

বদরুদ্দীন উমর তার ‘পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি-১ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ‘মহম্মদ আলী জিন্নাহ, প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও মুসলিম লীগের অন্যান্য সদস্যদের ভূমিকা এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক অবস্থার সমালোচনা ও পর্যালোচনা প্রসঙ্গে ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকা ফেব্রুয়ারিতে যে সুদীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে সেটিও অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। এই প্রবন্ধে পত্রিকাটি বলে, ‘পাকিস্তানের বিধান পরিষদে লিয়াকত আলী খানের উক্তিতে বাংলাদেশে এবং তার বাইরে অনেকে আঘাত পেতে পারেন কিন্তু আমরা যে বিরাট কোন আঘাত পাইনি একথা স্বীকার করি। নিজের মনের কথা প্রকাশকালে এত চিৎকার অকপটতার পরিচয় দানের জন্য আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাই। অমুসলমানরা এখন নিশ্চিতভাবে বুঝে নেবে তাদের আসল অবস্থা কি। ভবিষ্যতে পাকিস্তানে কি অবস্থার সৃষ্টি হবে এ সম্পর্কে মুসলমানরাও চিন্তা শুরু করবে। লিয়াকত আলী খানের বক্তব্যের কোন অপরিচ্ছন্নতা, দ্বিধা অথবা দ্ব্যর্থতা নেই। আমরা ধরে নিচ্ছি এ ক্ষেত্রে তিনি লীগ নেতৃত্বের সুবিবেচিত নীতিই অনুসরণ করেছেন। পাকিস্তান বিধান পরিষদে কার্যনির্বাহী সংক্রান্ত আইনের খসড়া নিয়ে বিতর্ক চলছিল। সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়, প্রত্যেক সদস্যকে হয় উর্দু নয় ইংরেজীতে পরিষদকে সম্মোধন করতে হবে। বিরোধী কংগ্রেস দল কর্তৃক এই প্রস্তাব সংশোধনের জন্য একটি পাল্টা প্রস্তাবে উর্দু ও ইংরেজীর সঙ্গে বাংলাকেও পরিষদের সরকারী ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার অনুরোধ জানানো হয়। প্রস্তাবটি প্রাদেশিকতার ভিত্তিতে করা হয়নি। করা হয়েছিল পাকিস্তানের বিরাট জনসংখ্যার ভাষা বাংলা এই কারণে। এজন্য বাংলাকে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দেয়াই কর্তব্য। লিয়াকত আলী খান তার আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে সংশোধনী প্রস্তাবটির বিরোধিতা করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান একটি মুসলিম রাষ্ট্র, প্রত্যেক মুসলিম রাষ্ট্রের একটি মুসলিম ভাষা থাকা দরকার এবং উর্দুই হচ্ছে সর্বোৎকৃষ্ট মুসলিম ভাষা। বাংলাদেশের মুসলমানরা এই বিস্ময়কর বক্তব্যকে মনে মনে কিভাবে গ্রহণ করেছেন আমরা জানি না কিন্তু সে যাই হোক সংশোধনী প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়। এই দীর্ঘ প্রবন্ধে ভাষা নিয়ে আরও অনেক গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর ভূমিকা নিয়ে, বিশেষ করে লিয়াকত আলী খানের বক্তব্য সেদিনই প্রত্যাখ্যান করে বাঙালীরা। লিয়াকত আলী খানের বক্তব্যের অর্থ এই দাঁড়ায়, তারা যদি ইসলামী প্রভুত্ব এবং কথার আনুষঙ্গিক সবকিছুর সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে তাহলে তাদের স্থান হবে রাষ্ট্রের বাইরে। কায়েদ-ই-আজম জিন্নাহ, মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ কাউন্সিল এবং পাকিস্তান সুবায় মিঃ জিন্নাহর ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধিদের এই কি আসল অভিপ্রায়? আমরা একথা জানতে চাই। দেশের অবস্থা আজ কোথায় দাঁড়িয়েছে এ নিয়ে বাংলাদেশের হিন্দু মুসলমানরা নিশ্চয়ই একইভাবে চিন্তা করছেন।’

বশির আলহেলাল তার ‘ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট অংশে উল্লেখ করেছেন, আবু জাফর শামসুদ্দীন দেখাতে চেয়েছেন, কেবল পশ্চাৎপদ বাংলা নয়, ফ্রান্স ও ইউরোপের অন্যান্য অগ্রসর দেশেও কৃষকদের অর্থনৈতিক আন্দোলনের পেছনে খ্রীস্টান যাজকদের প্রভাব বহু সময়ে কাজ করেছে। তিনি বাংলার অধুনাতন প্রজা আন্দোলনের সঙ্গে বাংলার সেইসব ধর্মীয়-অর্থনৈতিক আন্দোলনের যোগ দেখিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্ব-বাংলার সেই গভীর তাৎপর্যময় ভাষা-আন্দোলনের চূড়ান্ত গৌরবদীপ্ত ও মর্মান্তিক ইতিহাস রচিত হয়েছিল, মুসলিম লীগ-বিরোধী রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ঐক্যজোটের যা ছিল প্রধান প্রেরণাদায়িনী শক্তি। তাই যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচীতে একুশে ফেব্রুয়ারির স্মারক-স্বরূপ একুশটি দফা যুক্ত করা হয়। ১৯৫৪ সালের ৮ থেকে ১২ মার্চ নির্বাচন হয়। গণবিরোধী পার্টি রূপে মুসলিম লীগের প্রতি জনগণের চূড়ান্ত ঘৃণা, ভাসানী-শেরে বাংলার জনপ্রিয়তা এবং সোহরাওয়ার্দীর সাংগঠনিক প্রতিভার গুণে নির্বাচনের ফল যা দেখা গেল তা যেন তারা আশাও করেননি। মোট ৩০৯ আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ পেল নয়টি আসন। সম্প্রদায়-ভিত্তিক স্বতন্ত্র নির্বাচন প্রথায় তখন মুসলিম আসন ছিল ২৩৭। এর মধ্যে ২২৮ আসন পায় যুক্তফ্রন্ট। তারা মোট ভোট পান ৯৭ শতাংশেরও বেশি। যুক্তফ্রন্ট কেবল মুসলিম আসনে প্রতিযোগিতা করেছিল। ২২৮ আসনের মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগ পেয়েছিল ১৪৩, কৃষক-শ্রমিক পার্টি পায় ৪৮, নেজামে ইসলাম ২২, গণতন্ত্রী দল ১৩ ও খেলাফতে রাব্বানী দুটি আসন। ৭২ অমুসলিম আসনের মধ্যে পাকিস্তান জাতীয় কংগ্রেস ২৫, তফসিলি ফেডারেশন ২৭, সংখ্যালঘু যুক্তফ্রন্ট ১৩, কমিউনিস্ট পার্টি ৪ আসন পায়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ২১ দফার সামান্যই সেদিন প্রতিফলিত হয়।

রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ২৪ মার্চ সন্ধ্যায় সাক্ষাত দেন। ওই সাক্ষাতকার হয় চীফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদের বাসভবনে। সেদিন সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শামসুল হক, কমরুদ্দীন আহমদ, আবুল কাসেম, তাজউদ্দীন আহমদ, লিলি খান, মহম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, অলি আহাদ, নঈমুদ্দীন আহমদ, শামসুল আলম ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম। আলোচনার শুরুতেই জিন্নাহ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের বলেন, নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে তাদের যে চুক্তি হয়েছে সেটা তিনি স্বীকার করেন না, কারণ নাজিমুদ্দীনের থেকে জোরপূর্বক সেই চুক্তিতে সই আদায় করা হয়েছে। এর প্রমাণ হিসেবে তিনি বলেন, আট দফা চুক্তির মধ্যে প্রত্যেকটি দফাতেই নাজিমুদ্দীনকে কি বলতে হবে তাই বলা হয়েছে কিন্তু অন্য পক্ষের কর্তব্য সম্পর্কে কোন উল্লেখ নেই। চুক্তি কখনও এক তরফা হয় না, সর্বোতভাবে তা একটা দ্বিপাক্ষিক বিষয়। কিন্তু আট দফা চুক্তি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তা এক পক্ষের সুবিধার জন্য করা হয়েছে এবং চুক্তিতে স্বাক্ষর জোরপূর্বকই আদায় করা হয়েছে। এবং সেই অনুসারে চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে অবৈধ এবং অগ্রাহ্য। জিন্নাহর এমন বক্তব্যের পর সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ভাষার প্রশ্নে জিন্নাহর সঙ্গে তাদের তর্কবিতর্ক হয়। পরে রীতিমতো ঝগড়ায় রূপ নেয়। প্রথমেই মহম্মদ তোয়াহা তাকে সরাসরি বলেন যে তারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চান। এর উত্তরে জিন্নাহ বলেন, তিনি তাদের কাছে রাজনীতি শিক্ষা নিতে আসেননি।