২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্রেইভ নিয়ে রূপক

শুরুটা ছিল বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষামূলক নাটক-সিনেমা প্রদর্শনের মাধ্যমে। এরপর পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করে অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে তা শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে সংগঠনটি। শুধু তাই নয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে সমাজের নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডও কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে শিক্ষা স¤প্রসারণের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে লাভ করেছেন ‘জয়বাংলা ইয়ুথ এ্যাওয়ার্ড’। ব্রেইভ বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে এ্যাপস ডেভেলপ করে দিচ্ছে। স্বেচ্ছাসেবী এ সংগঠনটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তরুণ শিক্ষক রূপক রায়। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ব্রেইভকে

এগিয়ে নেয়ার গল্প লিখেছেন- রিফাত কান্তি সেন

শুরুটা করেছিলেন যেভাবে

রূপক রায়, চাঁদপুর সরকারী কলেজের সহকারী অধ্যাপক। শিক্ষার প্রতি তার প্রচণ্ড টান। দেশ যেহেতু ডিজিটাল হয়েছে সেহেতু তার মাথায় ও চেপে বসে ডিজিটাল পদ্ধতিতে যদি শিক্ষা কার্যক্রমটাকে এগিয়ে নেয়া যায় তবে মন্দ কী! তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট যাত্রা শুরু হয় স্বেচ্ছাসেবী এ সংগঠনটির। এরপর আর থেমে থাকতে হয়নি। সমাজসেবা অধিদফতরের নিবন্ধন ও লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। বিশেষ করে অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে শিক্ষাদানের ফলে বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থীকেই এখন আর প্রাইভেট পড়তে হয় না।

পেছনের গল্প

সংগঠনটি শুরু করার পেছনে এর মূল উদ্যোক্তা রূপক রায় অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে শিক্ষা প্রচারের লক্ষ্যে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের জন্য শ্রেণিকক্ষে ক্লাস শেষে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ডকুমেন্টারি ও ভাল সিনেমা দেখার আয়োজন করেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকা অবস্থায় কয়েকজন অগ্রগামী ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সিনেমা দেখানোর আয়োজন করেন। ২০১৩ সালের প্রথম দিকে চাঁদপুর পৌরসভার অর্থায়নে মাদক বিরোধী ডকুড্রামা ‘শুভ সকাল’ নির্মাণ করা হয় এবং এটি প্রায় ৪০টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়। প্রথমত প্রদর্শনীর আয়োজনে কারিগরি যন্ত্রাংশের বেশ অভাব ছিল। কখনও কখনও এক প্রতিষ্ঠানের প্রোজেক্টর নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে সিনেমা দেখানো হতো। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ অনুমতি না দিলেও বিনা অনুমতিতে লুকিয়ে প্রোজেক্টর নিয়ে সিনেমা দেখানো হতো। এ জন্য নানা ধরনের বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়েছে তাকে। পরবর্তীতে তিনি তার উৎসব বোনাসের টাকা ও নিজের সঞ্চয় দিয়ে ধীরে ধীরে প্রোজেক্টর, ল্যাপটপ, সাউন্ড সিস্টেম ইত্যাদি কিনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সিনেমা দেখানোর একটি পরিপূর্ণ অবস্থা তৈরি করেন। এভাবেই শিক্ষক শিক্ষার্থী সমন্বয়ে একটি দল তৈরি হয়, যা বর্তমান সংগঠনের রূপ লাভ করে। এ কাজ করতে গিয়ে তিনি অনুধাবন করেন ‘অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণ’ শিক্ষার্থীকে পাঠে আগ্রহী করে তুলে, পাঠ্যবিষয়কে বাস্তবসম্মতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়, শিক্ষকের সৃজণশীলতা প্রকাশের সুযোগ থাকে। অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে উপস্থাপিত বিষয়টি অনেকদিন মনে থাকে এবং যে শিক্ষার্থীর পড়ায় মন বসে না তাকে মনোযোগী হতে সাহায্য করবে। এই ভাবনা থেকে শিক্ষাকে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে রূপান্তর করতে তরুণদের সমন্বয়ে শিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পাঠ্যপুস্তককে অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে পরিণত করার জন্য তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তবে শিক্ষকদের সবাই সহজে বিষয়টি অনুধাবন না করলেও দু-একজন তরুণ শিক্ষক সমন্বয়ে কাজটি এগিয়ে যেতে থাকে। পাঠ্যপুস্তকের পাঠ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, নৈতিক, মানবিক, সামাজিক শিক্ষায় শিক্ষিত করতে অডিও-ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে কনটেন্ট নির্মাণ ও প্রদর্শন চলতে থাকে। রূপক রায় ছাত্র জীবন থেকেই অডিও ভিজ্যুয়াল মাধ্যমে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। সংগঠিত হয়ে কাজ করার পর এ সংগঠনের আরও তিনজন সদস্য (নাজমূল হক জুয়েল, নাজমুল হোসেন বাপ্পি, সালাউদ্দিন আধার) জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউট থেকে চলচ্চিত্র নির্মাণ, ডকুমেন্টারি নির্মাণ, অভিনয়, কলাকৌশল ও ক্যামেরা পরিচালনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ লাভ করেন এবং পরবর্তীতে তারা অন্য সদস্যদের মাঝে তাদের শিক্ষা ছড়িয়ে দেন। প্রশিক্ষিত সদস্যগণ ধারাবাহিকভাবে নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে শিক্ষামূলক অডিও ভিজ্যুয়াল তৈরি এবং তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা নেন।

সংগঠন চালাতে গিয়ে প্রতিবন্ধকতা

সংগঠনটি চালাতে গিয়ে এর প্রতিষ্ঠাতা বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছেন। ডিজিটাল মাধ্যমে পাঠদানের বিষয়টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বোঝনো বেশ কঠিন ছিল। এ মাধ্যমে কাজ করতে যেহেতু অনেক ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন তাই আর্থিক অসঙ্গতিটাও বড় সমস্যা ছিলো। সবাই শুধু বলতেন, এরা সব পাগলামি করছেন, ছেলেমেয়েদের বিভ্রান্ত করছেন। কেউ কেউ বলতেন টাকা পয়সা বা কোন ফান্ড জোগাড়ের ধান্দা, কয়দিন পরে থেমে যাবে। কিন্তু এই সংগঠন থামেনি। সদস্যগণ নিজেদের অক্লান্ত পরিশ্রম করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তারা দিনের বেলা চাকরি, নিজেদের পড়ালেখা করে রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে কাজ করতেন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা রূপক রায় নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে একটি স্থায়ী উপাজর্নক্ষম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যেখানে সংগঠনের সদস্যগণ পার্ট টাইম কাজ করেন এবং ধারাবাহিকভাবে সংগঠনটিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে কাজ করছেন। এখনও পর্যন্ত এ সংগঠন কারও কাছ থেকে হাত পেতে কোন দান অনুদান গ্রহণ করেনি। সদস্যগণ নিজেদের কর্মদক্ষতা কাজে লাগিয়ে উপার্জন করে নিজেদের ব্যয়ভার নির্বাহের পাশাপাশি এই সংগঠনটিকে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে একটি কাঠামো গড়ে তুলেছেন।

অর্জন

চাঁদপুর জেলার সর্ববৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাঁদপুর সরকারী কলেজ এবং চাঁদপুর সরকারী মহিলা কলেজে এই সংগঠনের দুটো সক্রিয় দল কাজ করছে। এ ছাড়া জেলার আরও আট টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংগঠনের সাপোর্ট টিম গঠিত হয়েছে। যারা নিয়মিত অডিও ভিজ্যুয়াল প্রদর্শনীর আয়োজন করছে। ইতোমধ্যে শিক্ষকদের ভিজ্যুয়াল কা¬স ধারণ করা শুরু হয়েছে এবং শিক্ষক আর্কাইভ গড়ে তোলার কাজটি চলছে। মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নিয়মিত প্রদর্শনীর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানছে চারটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাগান গড়ে তোলা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা এই কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হয়ে উঠছে।

ব্রেইভের আগামীর পরিকল্পনা

সংগঠন থেকে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরাঙ্গনা মাতা, শহীদ পরিবারের সদস্যদের কাছে শোনা সত্য ঘটনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কাহিনীচিত্র নির্মাণ করে তা সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি মুক্তিযুদ্ধের ভিজ্যুয়াল দলিল হিসেবে সংরক্ষিত হবে। নতুন প্রজন্ম আগ্রহ ভরে মুক্তিযুদ্ধ দেখবে, জানবে- যা তাদের মনে রেখাপাত করবে। দেশব্যাপী এ কার্যল্ডমটি পরিচালনার জন্য ইয়াং বাংলার সাথে তারা কাজ করতে চায়। এ ছাড়া অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্ট নির্মাণ করে বাংলা ভাষায় অডিও ভিজ্যুয়াল কনটেন্টের একটি সমৃদ্ধ ওয়েব ভাণ্ডার গড়ে তুলতে চান।

ব্রেইভকে নিয়ে স্বপ্নের কথা বলেন, রূপক রায়

গ্রাম হবে শহর এ স্লোগানটি এখন আমাদের এগিয়ে চলার প্রধান অনুপ্রেরণা। ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন শুধু কারিগরি দিকে হলে হবে না। এর কৌশলগত ও সার্বিক প্রয়োগ আমাদের ফুটিয়ে তুলতে হবে। সে লক্ষ্যে কাজ করছে ব্রেইভ। শিক্ষা ক্ষেত্রে শুধুমাত্র শহরকেন্দ্রিক শিক্ষা, ভাল স্কুল, ভাল শিক্ষক এই ধারণাগুলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক। আমরা বলতে চাই সব শিক্ষকই ভাল শিক্ষক, সব স্কুলই ভাল স্কুল। মূল্যায়নের মাপকাঠিতে ভিন্নতা থাকতে পারে, সেটা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। কিন্তু সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা কিংবা আয়োজনে কোন ভিন্নতা থাকতে পারবে না। এ জন্য গ্রামকে শহরে পরিণত করতে হলে একই মাপকাঠির শিক্ষা ব্যবস্থা, একই সুযোগ সবার জন্য আনতে হবে। ভৌগোলিক, সামাজিক কারণে হয়ত ভিন্নতা হতে পারে, তবে সেটা খুবই নগণ্য প্রতিবন্ধকতা। আর বর্তমানে বিরাজমান প্রতিবন্ধকতা দূর করার প্রধান হাতিয়ার হলো ডিজিটাল প্লাটফর্ম। এর বিকল্প নেই । আমাদের সকলেরই এ বিষয়টি সহজে গ্রহণের ক্ষেত্রে একটু দ্বিধা কিংবা ভীতি রয়েছে। সেটা দূর করতেই কাজ করছে ব্রেইভ।