২১ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

স্থূলতা ও কিডনি রোগ

  • অধ্যাপক ডাঃ শামীম আহমেদ

এবারের বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘স্থ’লতা কিডনি রোগ বাড়ায়, সুস্থ জীবন যাপনে সুস্থ কিডনি।’ অতিরিক্ত খাদ্য বস্তু গ্রহণ করলে খাদ্য বস্তু হজমের পর চর্বিতে রূপান্তর হয়ে দেহে জমা হয়। মানব দেহে মস্তিষ্ক ছাড়া অন্য যে কোন অঙ্গে চর্বি জমা হওয়ার সুযোগ থাকে। চর্বি জমা হওয়ার একমাত্র কারণ শুধু অধিক খাদ্য গ্রহণ নয়, বংশগত প্রবণতা, কর্ম সম্পাদনে ধীরগতি ও বিভিন্ন রকমের হরমোনের ও ওষুধের প্রভাবের জন্য হতে পারে। সারা পৃথিবীতে প্রায় ষাট কোটি লোক স্থ’ূলতা রোগে ভুগছেন। আমাদের শরীরের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের জন্য এনার্জি (শক্তি) প্রয়োজন। আমরা খাদ্যদ্রব্য গ্রহণের মাধ্যমে এই এনার্জি পেয়ে থাকি। যদি খাদ্যদ্রব্যের এই ক্যালোরি আমাদের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যয় ক্যালোরি থেকে বেশি হয়, তখন খাদ্যের অতিরিক্ত ক্যালোরি চর্বি আকারে শরীরে জমা হয়ে থাকে। শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার কারণে স্থ’ূলতা হয়ে থাকে এবং ওজন বৃদ্ধি পায়। স্থূলতা শুধু কিডনি মূল কারণ ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ নয়, স্থূলতা ধীর গতিতে কিডনি রোগের ঝুঁকির জন্য অন্যতম কারণ। স্থূলতার জন্য কিডনির ছাকনির অতিরিক্ত কাজ করতে হয়, যার ফলে ধীরে ধীরে কিডনির কার্যক্ষমতা কমে যায়। দীর্ঘ মেয়াদে দুটি কিডনি তখন অকেজো হয়ে পড়ে। তবে একটি ভাল খবর হচ্ছে, এই স্থ’ূলতা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং কিডনির কার্যক্ষমতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা যায়। শুধু স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা ও জ্ঞান, সেই সঙ্গে মনের দৃঢ়তা থাকলে স্থূলতা তথা কিডনি রোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। এই বিষয়ের উপর গুরুত্ব রেখেই এ বছর বিশ্ব কিডনি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে ‘স্থূলতা কিডনি রোগ বাড়ায় এবং সুস্থ জীবনযাপনে কিডনি সুস্থ রাখা যায়।’ স্থূলতা ও কিডনি রোগ বর্তমানে পৃথিবীতে সুপ্ত মহামারী রোগের তুল্য। সেই জন্য ২০১৭ সালের বিশ্ব কিডনি দিবসে এই প্রতিপাদ্য বিষয়টি যথা উপযোগী। ইহা প্রতীয়মান ক্রমবর্ধমানভাবে স্থূলতা বাড়তে থাকলে ২০১৫ সালের মধ্যে বিশ্বের শতকরা আঠারো ভাগ পুরুষ ও একুশ ভাগ মহিলা স্থূলতা রোগে ভুগবেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ‘মেটাবলিক সিনডম’ (স্থূলতা, ইনসুলিনের অকার্যকারিতা, রক্তে ইনসুলিনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া, রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাওয়া) কিডনির কার্যক্ষমতা ক্ষতি করতে সহায়ক। ¯ূ’লতা শুধু কিডনি রোগ নয় ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বি বৃদ্ধি, ঘুমানোর সময় শ্বাসকষ্ট, লিভারের চর্বি, পিত্তথলির রোগ, হাড়ের রোগ, মানসিক সমস্যা বা রোগ, শরীরে বিভিন্ন স্থানের ক্যান্সার, বন্ধ্যত্ব এবং সর্বোপরি জীবন যাত্রার মান বেঘাত ঘটায়। স্থূলতা কিডনির পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে আক্রান্ত করতে পারে। পরোক্ষভাবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টের রোগের জন্য দায়ী। আকস্মিক বা হঠাৎ কিডনি অকেজো স্থূলতা রোগীর ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায়।

অতএব কিডনি রোগ প্রতিরোধে সুস্থ জীবনযাপনের মাধ্যমে সুস্থ কিডনি রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি ভাল বা সুস্থ রাখার জন্য শাশ্বত নিয়মগুলোর প্রতি সজাগ হওয়া ও পালন করা উচিত। এই নিয়মগুলোর মধ্যে ১। নিজেকে সুস্থ, সবল ও কর্মঠ রাখুন (২) নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ রাখুন (৩) রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ রাখুন (৪) সুসম খাবার খাবেন, টাটকা শাক-শবজি ও ফলমূল খাবেন। সেই সঙ্গে ফাস্ট ফুড ও ড্রিংকস পানীয় পরিহার করুন। দৈনিক কায়িক পরিশ্রম করুন ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণ রাখুন। শরীরের স্থূলতা থেকে মুক্ত থাকুন (৫) প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লিটার বিশুদ্ধ পানি পান করুন। (৬) তামাক, সিগারেট ও মদ জাতীয় তরল পানীয় বর্জন করুন। (৭) বেদনানাশক ওষুধ, হারবাল ও গতানুগতিক স্থানীয় ওষুধ থেকে বিরত থাকুন। ব্যবস্থাপত্র ছাড়া ওষুধ ক্রয় ও খাবেন না। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও স্থূলতা অথবা বংশগত কিডনি রোগ থাকলে কিডনি রোগ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় কিডনি রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করুন।

পরিশেষে সুন্দর শারীরিক কাঠামো আমাদের সকলের কাম্য। মেদযুক্ত (স্থ’ূলতা) শরীর কারোরই পছন্দ নয়। কারণ স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ (হার্টের রক্তনালী প্রতিবন্ধকতা বা বøক) ও কিডনি রোগের ঝুঁকি বহন করে। উল্লেখ থাকে আমরা সহজেই খাদ্যভাস পরিবর্তন করে, কায়িক পরিশ্রম ও জীবন যাত্রার ধরন পরিবর্তন করে স্থূলতা তথা স্থূলতায় জটিলতা থেকে রক্ষা পেতে পারি।

লেখক : প্রাক্তন পরিচালক ও অধ্যাপক কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞ

জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল