২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জরায়ুর ক্যান্সারের আছে প্রতিরোধ

জরায়ুর ক্যান্সার বর্তমানে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আর এই জরায়ুর ক্যান্সারের প্রধান কারণ হচ্ছে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস (ঐচঠ) নামক ভাইরাস। জরায়ুর ক্যান্সারকে বর্তমানে মহিলাদের চতুর্থ প্রধান ক্যান্সার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার মহিলা এই জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে এবং প্রায় ২৫ হাজার মহিলা এই রোগে মারা যাচ্ছে।

অতএব এই মরণব্যাধি জরায়ুর ক্যান্সার থেকে আমাদের মা-বোনদের রক্ষা করতে হলে আমাদের এই কারণ সম্বন্ধে ভালভাবে জানতে হবে এবং প্রতিকারসমূহ সবার কাছে তুলে ধরতে হবে।

জরায়ুর ক্যান্সারের প্রধান কারণ হিসেবে আমরা জেনেছি হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসের কথা। তাহলে এই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস কী?

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস একটি এনভেলপবিহীন ডিএনএ ভাইরাস, যার আয়তন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র (৫৫ ন্যানোমিটার), ১৯৭৬ সালে জার্মান বিজ্ঞানী হারার্ড জের হাসেন সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন যে, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস জরায়ুর ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অন্যতম ভ‚মিকা পালন করে। ২০০৮ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভ‚ষিত হন তাঁর এই অনবদ্য ভ‚মিকার জন্য।

বর্তমানে গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ২০০ ধরনের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস আবিষ্কার হয়েছে। রোগের ধরন ও চিকিৎসার সুবিধার্থে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাসকে ২ ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে।

১। মিউকোসাল টাইপ

২। নন মিউকোসাল টাইপ-ওয়ার্ট (হাতে ও পায়ে হয়ে থাকে)

নিউকোসালকে আবার ২ ভাগে ভাগ করা হয়েছে-

১) হাই রিস্ক টাইপ (১৬,১৮,৪৫,৩১,৩৩)

২) লো-রিস্ক টাইপ (১১,৪১,৪৪,৪৩)।

এই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন শুধু যৌন মিলন/সঙ্গমের মাধ্যমে ছড়ায় এবং মানুষই এই রোগের একমাত্র বাহক। তবে সৌভাগ্যের বিষয় এই যে, হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন হলে আমাদের নিজস্ব রোগ-প্রতিরোধে ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম তাকে প্রতিহত করতে পারে। প্রায় ৭০% ইনফেকশন ১ বছরের মধ্যে এবং ৯০% ইনফেকশন ২ বছরের মধ্যে ভাল হয়ে যায়।

সুতরাং হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন হওয়া মানেই জরায়ুর ক্যান্সার নয়। তবে কিছু কারণকে ঝুঁকি হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছেÑ

১) বাল্যবিবাহ

২) অধিক সন্তানের জননী

৩) জন্ম নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ ৫ বছরের বেশি সেবন।

৪) ধূমপান

৫) একের অধিক যৌনসঙ্গী

৬) অন্যান্য যৌন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত রোগীর হিউম্যান ভাইরাস ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকি বেশি।

৭) স্বামী বা পুরুষের সুন্নতে খৎনা না হওয়া।

কারণগুলোকে হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশনের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রোগ যেহেতু আছে, তার প্রতিকারও আছে। যাতে আমরা তাড়াতাড়ি এই রোগটিকে শনাক্ত করতে পারি এবং রোগীর চিকিৎসা করতে পারি, তার জন্য বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা আমাদের গবেষণাগারে করা হয়ে থাকে। যেমনÑ

- ভায়া (ঠওঅ)

- প্যাপস টেস্ট

- হিস্টোপ্যাথোলজি

- পিসিআর

- অনকো ই-৬ সারভাইক্যাল টেস্ট।

এই অনকো ই ৬ সারভাইক্যাল টেস্ট খুব সহজে ও অল্প সময়ে জরায়ুর ক্যান্সারের জন্য যে প্রোটিন দায়ী তাকে শনাক্ত করতে পারে। এই টেস্ট করার জন্য কোন বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয় না, মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে এবং কম খরচে যে কোন পরীক্ষাগারে আমরা করতে পারি।

হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন সাধারণত উপসর্গবিহীন। তবে কিছু কিছু উপসর্গ দেখে আমরা ধারণা করতে পারিÑ

Ñমাসিক বেশি হওয়া (এক মাসে ২/৩ বার হওয়া)

- স্বামী সহবাসে ব্যথা ও রক্তক্ষরণ

Ñ তলপেটে ব্যথা

Ñ দুর্বল ভাব, কোমর ব্যথা

Ñ অনেক দিন ধরে দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব যাওয়া।

উপসর্গগুলো দেখা দিলে রোগীকে অবশ্যই নিকটস্থ ভায়া (ঠওঅ) সেন্টারগুলোতে যোগাযোগ করতে হবে।

আমাদের দেশে জরায়ুর ক্যান্সারের উন্নত চিকিৎসা বর্তমানে চালু হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের সার্জারির ও মেডিক্যাল চিকিৎসার মাধ্যমে রোগী এই রোগ থেকে সুস্থ হতে পারে। তাই আমাদের এই রোগকে অতি সহজে ও দ্রæত শনাক্ত করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তাই হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ইনফেকশন হলে ভয় না পেয়ে তা প্রতিকার করতে হবে। আমাদের অবহেলিত মা ও বোনদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং ৩০ বছরের উর্ধে ও অন্যান্য জরায়ু-সম্পর্কিত সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই নিকটস্থ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। তবেই আমরা নারী পুরুষ মিলে একটি সুখী, সুস্থ, সফল, সবুজ, সুন্দর দেশ গড়তে পারব।

আপনার ডাক্তার প্রতিবেদক