২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সংসদ সদস্য আচরণ আইন

একজন মানুষের বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে তার আচরণে। সভ্য সমাজে মানুষের আচরণের কিছু বিধিবিধান থাকে। যা খুশি তাই করার মধ্য দিয়ে নৈতিকতা ফুটে ওঠে না। আর জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে তাদের আচরণ মানুষকে তথা ভোটারকে প্রভাবিত করে। জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিতজনদের সতর্ক থাকা সাধারণের চেয়ে অত্যধিক।

যারা আইন প্রণয়ন করেন, জনগণের সমস্যা সমাধানের দিক নির্দেশনা প্রণয়ন করেন, তাদের আচরণ যদি না হয় স্বাভাবিক ও উন্নতমানের তবে বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতেও পারে এবং হয়ও। নির্বাচনকালে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদ সদস্যদের জবাবদিহির বিষয়ে অঙ্গীকার তুলে ধরেছেন অতীতেও। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছে না। যদিও এবার একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রসঙ্গটি আর উল্লিখিত হয়নি। জনগুরুত্বপূর্ণ হলেও সম্ভবত তা চাপা পড়ে গেছে যেন। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের স্বেচ্ছাচারিতা বা দুর্নীতি রোধ এবং তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দেয়াসহ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ‘সংসদ সদস্য আচরণ আইন’ প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া যে হয়নি তা নয়। তবে তা আলোর অবয়ব অবলোকন করেনি। ২০১০ সালে নবম সংসদে সরকারী দলের একজন প্রভাবশালী সদস্য বেসরকারী বিল আকারে সংসদে তা উত্থাপন করেছিলেন। বিলটি আইন হিসেবে পাসের পক্ষে বেসরকারী বিল সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছিল, ‘জনগণের প্রতি সংসদ সদস্যদের যে দায়-দায়িত্ব রয়েছে, তার প্রতিফলনের জন্য বাংলাদেশেও একটি আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।’ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের আইন প্রণেতাদের জন্য সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। বাংলাদেশে তা হয়নি গত ৪৮ বছরেও। নবম সংসদে চাওয়া হয়েছিল জাতীয় সংসদের বাইরে সংসদ সদস্যদের আচরণ কেমন হবে সে সংক্রান্ত আইন অনুমোদন করতে। নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তার পরিবারের সদস্যদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করাসহ বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ ছিল বিলে। পঞ্চম সংসদ থেকেই দেখা গেছে সংসদ সদস্য হলেই প্রভাব বিস্তার করাসহ বিভিন্ন ধরনের কাজে তাদের ব্যাপক উৎসাহ থাকে। ওঠে দুর্নীতির নানাবিধ অভিযোগ। তা ঠেকাতে পারে একমাত্র আইন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার যেখানে শূন্য সহিষ্ণুতা বা জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে সেখানে এই আইন সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিষয়টি আড়ালেই রয়ে গেছে। সংসদ সদস্যদের অসংযত আচরণ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে রাজনৈতিক দলকেও প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। তাই প্রধান সব রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন দলের নির্বাচনী ইশতেহারে তা অন্তর্ভুক্ত শুধু নয়, অঙ্গীকারের বাস্তবায়নও করা সঙ্গত। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছেন।

সংসদ সদস্যদের আচরণের বিষয়ে একটি মানদ- অবশ্য ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ড ইন পাবলিক লাইফ’ তার পঞ্চম প্রতিবেদনে সাতটি মানদ- চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে আছে নিঃস্বার্থতা, সত্যনিষ্ঠতা, বস্তুনিষ্ঠতা, দায়বদ্ধতা, মুক্তমনা ও নেতৃত্ব। ভারতের লোকসভা সদস্যদের জন্য প্রণয়ন করা আচরণবিধিতে এসবের সঙ্গে যোগ করা হয়েছে জনস্বার্থ ও দায়িত্বের মতো বিষয়গুলো। নবম সংসদ নির্বাচনকালে আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক নির্বাচনী ইশতেহারে সংসদ সদস্যদের জন্য সর্বসম্মত আচরণ বিধিমালা প্রণয়নের সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শপথ নেয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রদানের অঙ্গীকার ছিল। কিন্তু সে অঙ্গীকার বাস্তবে রূপ পায়নি। সুশাসনে অগ্রগতি ও জবাবদিহির জন্য সংসদ সদস্য আচরণ বিলটি ২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি বেসরকারী সদস্য দিবসে উপস্থাপন করা হয়েছিল। প্রস্তাবিত বিলে ১৫টি ধারা রয়েছে। সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান ও দায়-দায়িত্ব, ব্যক্তিস্বার্থে আর্থিক প্রতিদান, উপঢৌকন বা সেবা, সরকারী সম্পদের ব্যবহার, গোপনীয় তথ্যের ব্যবহার, বাকস্বাধীনতা, সংসদ সদস্য বা জনগণকে বিভ্রান্ত ও ভুল পথে চালিত না করা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহিষ্ণুতা; নৈতিক কমিটি এবং আচরণ আইনের প্রয়োগ, আইন লঙ্ঘনের শাস্তি, নৈতিকতা কমিটির কার্যকলাপসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। উত্থাপিত আইনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে স্পীকারের নেতৃত্বে সব দলের আনুপাতিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে নয়জন সংসদ সদস্যের দ্বারা একটি সংসদীয় নৈতিকতা কমিটি গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। যে কোন ব্যক্তি গঠিত কমিটির কাছে অভিযোগ পেশ করতে যেমন পারবেন, তেমনি নৈতিকতা কমিটি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে অভিযোগ বিবেচনায় নিতে পারবে বলে প্রস্তাবও রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশকে আরও সমুন্নত করার জন্য সরকারী দলের পক্ষ থেকে আইন প্রণয়ন করা যেতেই পারে।