২০ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কৃষিবিদ দিবস ২০১৯ ॥ বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই কৃষির গৌরবোজ্জ্বল অগ্রগতি

  • ড. মোঃ আলী আকবর

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (বাকসু) কর্তৃক বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন ম-পে আয়োজিত সংবর্ধনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারদের মতো কৃষিবিদদের চাকরি ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদা ঘোষণা দেন। তাঁর ঐতিহাসিক ঘোষণার পথ ধরেই আজ কৃষিবিদগণ সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড পদমর্যাদায় অধিষ্ঠিত। কৃষি শিক্ষা ও কৃষিবিদদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রদানের ঐতিহাসিক ঘোষণা আজও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে স্লোগান হিসেবে ‘বঙ্গবন্ধুর অবদান-কৃষিবিদ ক্লাস ওয়ান’ সোচ্চার কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। জাতির পিতার স্মৃতি জাগানিয়া ঐতিহাসিক স্থানটি চিহ্নিত করে গড়ে তোলা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু স্মৃতি চত্বর।’ জাতির জনকের দেয়া কৃষিবিদদের ঐতিহাসিক এ সম্মানকে স্মরণীয় করে রাখতেই প্রতি বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি জাঁকজমকপূর্ণভাবে কৃষিবিদগণ দিবসটিকে ‘কৃষিবিদ দিবস’ হিসাবে পালন করে আসছেন। এ বছর আগামী ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় দিবসটি পালনে ক্যাম্পাসে আলোকসজ্জা, আতশবাজি, ফানুস উড্ডয়ন, আনন্দ শোভাযাত্রা, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে কৃষি উন্নয়ন অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত ও সংহত করার ক্ষেত্রে করণীয় নির্ধারণ বিষয়ক ‘টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে আধুনিক কৃষি’ বিষয়ক একটি জাতীয় সেমিনার, কৃতি এ্যালামনাই সংবর্ধনা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য পরম আনন্দ ও গৌরবের।

বাংলাদেশের মতো একটি কৃষিপ্রধান দেশে কৃষি উন্নয়ন মূলত জাতীয় উন্নয়নেরই সমার্থক। দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিতে অভাবনীয় উন্নয়ন সাধন করায় বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ আজ খাদ্যশস্য উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। সেই সঙ্গে ক্রমাগত মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ফল ও শাক-সবজির উৎপাদনও বৃদ্ধি পাচ্ছে দ্রুত গতিতে। দারিদ্র্য বিমোচন ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের প্রচেষ্টায় কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি যথেষ্ট সহায়ক ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। বহুলাংশে এ সফলতার গর্বিত অংশীদার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এখন প্রয়োজন খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

এ দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির চাবিকাঠি কৃষি ও কৃষকের উন্নয়ন তথা গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশকে অবারিত করার মাঝেই নিহিত। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল, প্রয়োজন উচ্চ প্রশিক্ষিত কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানী। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশ পৃথিবীতে চাল উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, সবজি উৎপাদনে ৩য়, আম উৎপাদনে ৭ম, মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে ৩য়, ধান উৎপাদনে ৪র্থ, পাট রফতানিতে ১ম, পেয়ারা উৎপাদনে ৮ম স্থান অর্জন করেছে এবং শাক-সবজি ফল উৎপাদনে বিস্ময়কর সফলতা বৃহত্তর কৃষি উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। দেশের জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৬ শতাংশ। স্বাধীনতার পর হতে গত প্রায় পাঁচ দশকে কৃষি জমি আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেলেও শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় চার গুণ। বাংলাদেশে কৃষির ক্রমোন্নতি ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ কর্মকা-ে নিয়োজিত দক্ষ কৃষি বিজ্ঞানীদের প্রায় সবাই ময়মনসিংহে অবস্থিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশের প্রথম উচ্চতর কৃষি শিক্ষা ও গবেষণার ঐতিহ্যবাহী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী অর্জন করেছেন, যা আমাদের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। এ যাবত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪৭ হাজার ২৬৮ জন গ্রাজুয়েট যার মধ্যে ২৮ হাজার ১২৯ জন স্নাতক, ১৮ হাজার ৪১৬ জন এমএসসি/এমএস এবং ৭২৩ জন পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। খাদ্যশস্য উৎপাদনসহ কৃষির এ বিরল সাফল্য অর্জনে দেশের লাখো কোটি কৃষকের পাশাপাশি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হতে উত্তীর্ণ কৃষিবিদদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য অবদান। ক্রমবর্ধমান বিপুল জনসংখ্যার বাংলাদেশে মানসম্মত উচ্চতর কৃষি শিক্ষাদান এবং কৃষি উন্নয়নের গুরুদায়িত্ব বহনে সমর্থ দক্ষ কৃষিবিদ, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করাই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) নির্ধারণ করেছেন। সে অনুযায়ী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে মুক্তি পেতে বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদিত শক্তি ও উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ সালের জন্য উন্নয়নের রূপকল্প ঘোষণা করেছেন। সেই সাথে আগামী ২১০০ সাল পর্যন্ত ডেল্টা প্ল্যান তৈরিও সম্পন্ন করেছেন। তার এ ঘোষণা বাস্তবে রূপ দিতে শোষিত-বঞ্চিত বীরের জাতিকে মানব সম্পদে রূপান্তর করতে হবে। বাংলাদেশের খাদ্য ঘাটতি পূরণ, পুষ্টি সরবরাহ, আত্ম-কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে এসডিজির এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের ফসল খাতের নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সম্পদের গুরুত্ব অপরিহার্য।

আগামী দিনগুলোতে কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জগুলো হলো পরিবেশ রক্ষা, জমির একক প্রতি উৎপাদন বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা, মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি ও ঝুঁকি মোকাবেলা, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষিতে আইসিটির ব্যবহার এবং সকলের জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধান করা। ফসল উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রাণিজ কৃষির বিকাশের মাধ্যমে এ লক্ষ্য পূরণ করতে হবে। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অতীতের ধারাবাহিকতায় আগামী দিনের এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দক্ষ গ্রাজুয়েট সৃষ্টি এবং কৃষি শিক্ষা, গবেষণা ও সম্প্রসারণ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে যাবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্মপ্লাজম সেন্টারের মাধ্যমে কৃষি গবেষণায় ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার-১৪১৯’ স্বর্ণপদক লাভ আমাদের অন্যতম অর্জন। এ ছাড়া ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ওয়েবমেট্রিক্স র‌্যাঙ্কিং অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটিসে বাংলাদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

কৃষির এ অর্জনের মাধ্যমেই জাতির এ মহানায়কের সম্মান রক্ষা করেছে কৃষিবিদ সমাজ। ১৯৭৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক কৃষিবিদদের প্রথম শ্রেণীর পদমর্যাদা প্রাপ্তির দিনটিকে কৃষিবিদ দিবস হিসেবে পালনের তাৎপর্য এখানেই। আমরা বিশ্বাস করি, যথাযথ পরিকল্পনা ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এর শিক্ষা ও গবেষণাসহ যাবতীয় কর্মকা-ের বিকাশ অব্যাহত থাকবে এবং এর মধ্য দিয়েই কৃষি তথা জাতীয় উন্নয়নে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন আরও ফলপ্রসূ হবে- এ ধারা অব্যাহত রাখতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

নির্বাচিত সংবাদ