২১ এপ্রিল ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সাকিববিহীন বাংলাদেশের ভরসা পেসাররাই

সাকিববিহীন বাংলাদেশের ভরসা পেসাররাই

মোঃ মামুন রশীদ ॥ সর্বশেষ দুটি সিরিজ দেশের মাটিতেই খেলেছে বাংলাদেশ দল। আর সে কারণেই জিম্বাবুইয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দলের মূল অস্ত্র ছিলেন স্পিনাররা। এ দুটি সিরিজে পেসাররা একেবারে অপাংক্তেয়ই ছিলেন। কারণ দেশের মাটিতে কন্ডিশন ও উইকেটের গতি-প্রকৃতি বিবেচনায় স্পিনাররাই সবসময় দাপট দেখান। তবে উপমহাদেশের বাইরের চিত্রটা আলাদা। সেসব দেশে স্পিনারদের জন্য সুবিধাজনক কিছুই নেই, তাই পেসাররাই হন সফল। এমনকি বাংলাদেশের পেসাররাও বিদেশের মাটিতে বরাবরই স্পিনারদের চেয়ে সাফল্যে এগিয়ে। এখন পর্যন্ত বিদেশের মাটিতে সব ফরমেট মিলিয়ে (টি২০, ওয়ানডে ও টেস্ট) ১৯৩ ম্যাচের পরিসংখ্যান থেকেই সেটা নিশ্চিত হওয়া যায়। বাংলাদেশের পেসারদের দখলে যেখানে ৬৯০ উইকেট, সেখানে স্পিনাররা পেয়েছেন ৫৫৯টি। তবে ব্যক্তিগত বোলিং নৈপুণ্যে সবার চেয়ে আলাদা বাঁহাতি স্পিন অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের পক্ষে বিদেশের মাটিতে সব ফরমেট মিলিয়ে তিনিই সর্বাধিক ১৬১ উইকেট নিয়ে শীর্ষে। এবার ইনজুরিতে সাকিব না থাকায় তাই পেসাররাই একমাত্র ভরসা বাংলাদেশ দলের। কারণ নিউজিল্যান্ডের মাটিতেও বোলিং পরিসংখ্যানে সবার ওপর সাকিব।

উপমহাদেশের বাইরে যে কোন ক্রিকেট খেলুড়ে দেশেই পেসারদের জন্য সুবিধাজনক উইকেট থাকে। বিশেষ করে নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার উইকেটগুলো দ্রুতগতির এবং বাউন্সি। তাছাড়া আবহাওয়াটাও যেমন থাকে, তাতে করে পেসাররা এসব দেশের উইকেটে বরাবরই দাপট দেখান। কিন্তু উপমহাদেশে ঠিক উল্টোটাই দেখা যায়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের উইকেটগুলো ধীরগতির এবং সবসময়ই এসব দেশের উইকেটে ব্যাটসম্যানদের জন্য ভয়ঙ্কর স্পিনাররা। এ কারণে দেশের মাটিতে যখনই বাংলাদেশ দল কোন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলতে নামে তাদের মূল শক্তির জায়গা হয়ে ওঠে স্পিন। পেসাররা সুযোগই পান না। দেশের মাটিতে সর্বশেষ দুই সিরিজে জিম্বাবুইয়ে ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেটাই দেখা গেছে। এমনকি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হওয়া সর্বশেষ টেস্ট ম্যাচে স্বীকৃত ৪ স্পিনারকে নিয়ে একাদশ সাজালেও কোন পেসারের জায়গা হয়নি। তবে কি বাংলাদেশের পেসাররা হারিয়ে গেছেন? সেটা ওই সময় বাংলাদেশ দলের কোচ স্টিভ রোডসসহ জাতীয় দল সংশ্লিষ্ট কেউ মানেননি, বরং দাবি করেছেন কন্ডিশন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় শুধু স্পিনারদের খেলানো হয়েছিল, কিন্তু পেসবান্ধব উইকেট এলেই আবার পেসারদের আধিক্য থাকবে একাদশে। তাদের কথার প্রমাণ এবার সদ্য সমাপ্ত বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ (বিপিএল) টি২০ আসরে দেখিয়েছেন পেসাররা। সাকিব ২৩ উইকেট নিয়ে শীর্ষে থাকলেও এরপরের চারটি জায়গাই পেসারদের। তাসকিন আহমেদ, মাশরাফি বিন মর্তুজা ও রুবেল হোসেন প্রত্যেকেই নিয়েছেন ২২টি করে উইকেট। এরপরই মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন ১৯ উইকেট নিয়ে। এখান থেকে প্রমাণ পাওয়া গেছে সুবিধামতো উইকেটে ম্যাচে নামার সুযোগ পেলে গতির ঝড় তোলার জন্য মুখিয়ে আছেন পেসাররা।

ঘরের মাটিতে স্পিনারদের ওপর ভরসা করলেও বিদেশের মাটিতে বরাবরই বাংলাদেশ দলের আস্থার প্রতীক ছিল পেসাররা। আর সে কারণেই তিন ফরমেটের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সবমিলিয়ে ১৯৩ ম্যাচে বোলিং নৈপুণ্যে স্পিনারদের চেয়ে পেসাররাই সফলকাম হয়েছেন। সবমিলিয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশী পেসাররা ৬৯০ উইকেট শিকার করলেও স্পিনারদের দখলে ৫৫৯টি। এমনকি নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তিন ফরমেট মিলিয়ে ২১ ম্যাচ খেলে পেসাররা নিয়েছেন ৮৪ উইকেট। যার ৪.৮৫ ইকোনমি ও ৫০.৩৮ গড়। আর স্পিনাররা নিয়েছেন মাত্র ৪৮ উইকেট!। ইকোনমি ৪.৬৫ ও ৪৬.১০ গড়। কন্ডিশন বিবেচনায় একাদশে ৩/৪ জন করে পেসার খেলানোয় বোলিংটাও তারাই করেছেন বেশি। নিউজিল্যান্ডে স্পিনাররা ৪৭৫.২ ওভার বোলিং করেছেন, পেসাররা করেছেন ৮৭২.১ ওভার। তবে সার্বিকভাবে এবং নিউজিল্যান্ডে কিন্তু বোলিং নৈপুণ্যে সেরা সাকিব। একমাত্র ব্যতিক্রম এ বাঁহাতি স্পিনার বিদেশের মাটিতে সর্বাধিক ১০৭ ম্যাচ খেলে দখল করেছেন ১৬১ উইকেট, ৩৩.৩৮ গড় ও ৩.৯৯ ইকোনমিতে। কিন্তু দ্বিতীয় স্থানেই পেস বোলার মাশরাফি। তিনি ৮৯ ম্যাচ খেলে ৩৬.৯৯ গড় ও ৪.৪৯ ইকোনমিতে ১১৬ উইকেট শিকার করেছেন। সামগ্রিক তালিকায় ৫ নম্বরে হলেও বর্তমানে জাতীয় দলে যারা খেলেন সেই তালিকায় পরের নামটিই পেসার রুবেল হোসেনের। ৪৬ ম্যাচে ৬২ উইকেট নিয়েছেন তিনি। এরপর ৬০ উইকেট নিয়ে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের নাম থাকলেও তিনি ৯৮ ম্যাচ খেলেছেন। তারপরই আছে বর্তমানদের মধ্যে মুস্তাফিজুর রহমানের নাম (২৩ ম্যাচে ৪৪ উইকেট)। মুস্তাফিজের পর শফিউল ইসলাম ২৬ ম্যাচে ৪০ উইকেট নিয়ে। অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ ২২ ম্যাচে ৪৬.৬৫ গড় ও ৪.০৫ ইকোনমিতে পরের স্থানে। এমনকি কিউইদের বিপক্ষে সর্বাধিক ১৮ ম্যাচ খেলে সাকিব ৩২.৯২ গড় ও ৪.২২ ইকোনমিতে ২৮ উইকেট পেয়েছেন। দ্বিতীয় স্থানে মাশরাফি ১৩ ম্যাচে ১৬ উইকেট নিয়ে। তিনে রুবেল ৮ ম্যাচে ১৬, চারে শফিউল ৫ ম্যাচে ৮, পাঁচে কামরুল ইসলার রাব্বি (২ ম্যাচে ৬), ছয়ে শাহাদাত হোসেন (১০ ম্যাচে ৬), সাতে তাসকিন আহমেদ (৭ ম্যাচে ৬)। অর্থাৎ সাকিবের পর সবগুলো নামই পেসারের। তাই এবার সাকিব না থাকায় বাংলাদেশের বোলিং বিভাগ নিয়ে একটা চিন্তা থাকবে। তবে পেসারদের অতীত ভাল হওয়া এবং বর্তমানে ফর্মে থাকায় বাংলাদেশের একমাত্র ভরসা এখন মাশরাফি, রুবেল, সাইফউদ্দিন, মুস্তাফিজরা। এর পাশাপাশি তরুণ অফস্পিন অলরাউন্ডার মিরাজ যে কোন পরিস্থিতিতে ধারাবাহিকভাবে ভাল করার কারণে সাকিবের অভাবটা হয়তো কিছুটা হলেও পূরণ করতে পারবেন।