২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কোন্ পথে ঢাকা মোহামেডান?

  • টি ইসলাম তারিক

৬১ লড়াইয়ে জয় ৫৬টিতে, হার মাত্র ৫টিতে। খেতাব পুনরুদ্ধারের জন্য ১৯৮০ সালে পুনরায় ল্যারি হোমসের সঙ্গে লড়ায়ে অবতীর্র্ণ হন। এই ল্যারি হোমস ছিলেন তারই শিষ্য। লড়াইটি নিয়ে সারা বিশ্বে উৎকণ্ঠা আর আগ্রহের শেষ ছিল না। টিভিতে সরাসরি সম্প্রচারের কারনে বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক লড়াইটি উপভোগ করতে পেরেছিলেন।

লড়াই শুরু হওয়া থেকে প্রতিটি রাউন্ডেই একের পর এক মার খেয়ে যাচ্ছিলেন। তার সমর্থকেরা ভাবছিলেন পরবর্তী রাউন্ডেই ঝলসে উঠবেন তিনি। কিন্তু একে একে ১১টি রাউন্ড শেষ হয়ে যায়। বিশ্বের কোটি সমর্থকদের হতাশায় নিমজ্জিত করে পরবর্তী রাউন্ডে আর রিংয়ে ফিরে আসেননি। পরাজয় স্বীকার করে নেন। এর পর তিনি অবসরের ঘোষণা দেন। তিনি বিশ্ব হ্যাভিওয়েট বক্সিং কিংবদন্তি, দর্শক নন্দিত মোহাম্মদ আলী।

প্রশ্ন হচ্ছে লেখার শিরোনামের সঙ্গে এর সম্পর্ক কি? মোহাম্মদ আলী একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়, পক্ষান্তরে ঢাকা মোহামেডান একটি ক্লাব। অথচ এই দুইয়ে দারুণ মিল। একটা সময়ে বক্সিং রিং পুরো আয়ত্তে ছিল তার। যাদেরকে নিয়ে বক্সিং রিঙয়ে ছেলেখেলা করেছিলেন তাদের একজন ল্যারি হোমসের কাছেই নকআউট হয়ে বিদায় নিতে হয়। ১৯৩৬ সালে মোহামেডানের জন্ম হলেও ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত একক প্রাধান্য ছিল ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের। ১৯৫৬ সালে ঢাকা ওয়ান্ডার্স ক্লাবের কিছু তারকা খেলোয়াড় ঢাকা মোহামেডানে যোগ দেয়। ১৯৫৭ সালে প্রথম বারের মতো শিরোপা পায় ঢাকা মোহামেডান। সেই থেকে যাত্রা শুরু যা থেমে থাকেনি ২০০২ পর্যন্ত। ফুটবল, হকি, ক্রিকেটসহ অন্যান্য ইভেন্টেও মোহামেডানের সাফল্য ছিল নজর কাড়া।

ফুটবল হকিতে যাদের গুনে গুনে গোল দিত আজ তাদের দাপটের কাছেই মাথা নিচু করে মাঠ ছাড়তে হচ্ছে। ক্রিকেটে যেখানে চ্যাম্পিয়ন ছাড়া কিছু ভাবতে পারতো না, বর্তমানে খেলার ফলাফল দেখলে সমর্থকদের লজ্জিত হতে হয়। মোহামেডান সমর্থকরা প্রতিবছর লীগের পর আশায় বুক বেঁধে থাকেন তার প্রিয় দল নিশ্চয়ই আগামীবার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু হতাশার চিত্র প্রতিবার একই রকম।

বিশ্বের সব জায়গাতেই ক্লাবের উত্থান পতন দেখা যায়। এট হতেই পারে, স্বাভাবিক ঘটনা। অবাক হতে হয় যখন দেখা যায় বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ ফুটবলের রোল অব অনারে মোহামেডানের নাম দেখা যায় না। প্রতি আসরের পর মোহামেডানের সমর্থকরা মনে করেন আগামীবার বুঝি প্রিয় মোহামেডান ঘুরে দাঁড়াবে! কিন্তু বিধি বাম। কাগজে কলমে হুংকার দেখা গেলেও বাস্তবে বিস্তর ফারাক। দেশে এবং দেশের বাইরে মোহামেডানের সাফল্য রয়েছে অনেক। দেশে ফেডারেশন কাপ ১০ বার, স্বাধীনতা দিবস কাপ ৩ বার, সুপার কাপ ২ বার, আগাখান গোল্ড কাপ ৩ বার এবং ঢাকা লীগ ১৯ বারের চ্যাম্পিয়ন। অথচ বর্তমানে সমর্থকদের মনে রেলিগেশন শংকা জাগিয়ে তুলেছে। লীগে ২০০২ সালে শেষ বারের মতো চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। মাঝে সুপার কাপ জয় করে দুই বার।

মোহামেডানের কেন আজ এই দশা? আর্থিক সঙ্কট? না কি অন্য কিছু? ১৯৭৮ সালের মোহামেডান ফুটবল দলের অধিনায়ক যিনি বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা হলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, দলবদলের পর কর্মকর্তাদের কাছে সাংবাদিকদের প্রশ্ন থাকত দল কেমন হয়েছে? কর্মকর্তারা বলতেন ‘চ্যাম্পিয়ন দল গড়া হয়েছে, চ্যাম্পিয়ন ছাড়া কিছুই ভাবছি না।’ অথচ আজ একই প্রশ্ন করলে কর্তারা উত্তর দেন ‘দল ভাল খেলবে, ইনশা আল্লাহ আগামীতে ৪/৫ জন খেলোয়াড় জাতীয় দলে সুযোগ পাবে!’ সমর্থকদের আর বুঝতে বাকি থাকে না দলের ফলাফল কি হবে। তিনি পরিষ্কারভাবে জানান, মোহামেডানের মতো ক্লাবের আর্থিক সঙ্কট এটা বিশ্বাস হয় না। আসলে যোগ্য ম্যানেজমেন্টের অভাবে বর্তমানে ক্লাবের এই হাল। তিনি ক্ষোভের সঙ্গে জানান মোহামেডানের সমর্থকগণ এখন এই ক্লাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে মোহামেডান, আবাহনী ও জাতীয় দলের সাবেক খেলোয়াড় গোলাম সারোয়ার টিপু বলেন, ‘বছরের পর বছর মোহামেডানের এই হাল দেখে আর্থিক সহযোগিতার হাত যারা আগে বাড়িয়ে দিতেন তারাও এখন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আলোয় উদ্ভাসিত সাদাকালো মোহামেডান আজ যেন সত্যিই বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছে। যে ক্লাবের কোটি কোটি সমর্থক সে ক্লাবের এ হাল দেখলে অবাক হতে হয়।’ আগে মোহামেডানের কর্তারা মাঠে বসে সব ইভেন্টের খেলা দেখতেন। আগে থেকেই আগামী সিজনে কোন খেলোয়াড় নেওয়া হবে তার ছক করে ফেলতেন। এখন তেমনটা দেখা যায় না। মনিরুল হক চৌধুরী, মইনুল ইসলাম, এম এ মালেক, সফিকুল গনি স্বপন, মোসাদ্দেক আলী ফালু ছিলেন মোহামেডানের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। তাদের সময় সাফল্য ছিল আকাশচুম্বী। বিশেষ করে ১৯৮২ সালে মোহামেডান ফুটবল হকি ক্রিকেটসহ প্রায় ১২টি ইভেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করে। ওই বছরেই মোহামেডান কলকাতা থেকে আশিস জব্বার টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়।

১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত মোহামেডান শিরোপা থেকে বঞ্চিত ছিল। কিন্তু ১৯৮৬ সালে কোচ আলি ইমামের নেতৃত্বে মোহামেডান অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। ১৯৮৭ সালে কোচ কাম খেলোয়াড় হিসেবে নিয়ে আসে ইরানের নাসের হেজাজিকে। যিনি ১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। নাসের হেজাজি এসেই যেন মোহামেডানকে নতুন পথ দেখায়। খেলার ধরন পুরো পাল্টে দিয়ে পুরো আধুনিকতার ছোয়ায় মোহামেডানকে গড়ে তুলেন। ১৯৮৭ এবং ১৯৮৮ এই দুই বছর অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে টানা তিনবার হ্যাট্রিক শিরোপার মুকুট মাথায় তুলে। বিশেষ করে হেজাজির তত্ত্বাবধানেই এশিয়ান ক্লাব কাপ চ্যাম্পিয়নশিপ টুর্নামেন্টে সেরা আটে যায়গা করে নেয় ঢাকা মোহামেডান যা এখন পর্যন্ত অন্য ক্লাবের পক্ষে সম্ভব হয়নি।

ক্লাব কর্তারা বিদেশী খেলোয়াড় সংগ্রহের ব্যাপারে ছিলেন খুবই তৎপর। ফুটবলে নাইজিরিয়ান এমেকা ইউযুগো যিনি পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে নাইজিরিয়ার বিশ্বকাপ স্কোয়াডে ছিলেন। ইরানের নালজেকার, বিজন তাহিরি এবং রহিমভ ছিলেন উল্লেখযোগ্য। ক্রিকেট এবং হকিতেও সমান তালে এগিয়ে চলতো মোহামেডান। ক্রিকেটে সনাৎ জয়সুরিয়া, অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো খেলোয়াড় খেলে গেছেন মোহামেডানে আর হকিতে খেলেছেন বিশ্বসেরা হকির ম্যারাডোনা শাহবাজ আহমেদ, কামরান আশরাফ, তাহির জামানের মতো সব নামকরা খেলোয়াড়। আজ এ মানের খেলোয়াড় কোথায়? ভাবতে অবাক লাগে একের পর এক পরাজয়ে সমর্থকরা যখন বুক ফাটা আর্তনাদ মিশ্রিত লিখা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কাঁপিয়ে তুলেন সেখানে কর্মকর্তারা একেবারেই নির্বিকার। যেন খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

বক্সিং রিঙে মোহাম্মদ আলী ছিলেন একজন ব্যক্তি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোন ব্যক্তির মুস্টির জোর কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে অর্জন কখনোই ম্লান হবার নয়। কিন্তু মোহামেডান কোন ব্যক্তি নয়, মোহামেডান একটি ক্লাব। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলতে পারলে বিগত দিনের সব অর্জন একদিন ম্লান হয়ে যাবে। নতুন প্রজন্মের কাছে মোহামেডান কেবলই একটি অতীত ইতিহাসে ঠাঁই পাওয়া ক্লাব হিসেবেই পরিচয় বহন করবে! বিগত দিনে দেখা গেছে মোহামেডান কোন ম্যাচে হেরে গেলে সেটা পরের দিন দৈনিক খবরের কাগজগুলো ঘটা করে নিউজ করত। আর এখন কালে ভদ্রে মোহামেডান জয় পেলে সেটা চটকদার নিউজ হয়! জানা গেছে মোহামেডান চত্বরে সু-উচ্চ দালান নির্মাণ হবে, যদিও ক্লাব টেন্ট এখন আগের চাইতে অনেক আরাম দায়ক। সমর্থকদের মনে প্রশ্ন সু-উচ্চ দালান, এসির ঠা-া হাওয়া, নতুন বাস কিংবা ঝলমলে পরিবেশ কি আগের সেই মোহামেডানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে?

দেশের শহর গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কোটি কোটি সমর্থক প্রতিবছর ভাবেন আগামী মৌসুমে বুঝি সব ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু আবারও একই চিত্র। চলতি মৌসুমে লীগে প্রথম তিন ম্যাচেই পরাজয়ের হ্যাটট্রিক করে গ্লানি নিয়ে মাঠ ছেড়েছে মোহামেডান। এর মাঝে আরামবাগের কাছে বিশাল ব্যবধানে হার। যা সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে কোন পথে এগুচ্ছে মোহামেডান। ভবিষ্যত কি দর্শকনন্দিত এ ক্লাবটির?