১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নেপালের ক্রিকেটে আগামীর পদধ্বনি

  • মোঃ রাশেদুল হক

নেপাল আইসিসির সহযোগী সদস্যপদ লাভ করে ১৯৯৬ সালে। ২০১৪ সালে টি২০ স্ট্যাটাস পাওয়া দলটির ওয়ানডে স্ট্যাটাস পেতে অপেক্ষা করতে হয় আরও চার বছর। গত বছরের মার্চে তাদের ওয়ানডে স্ট্যাটাস মেলে। আর নিজেদের ইতিহাসে প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয় এল এক বছরেরও কম সময়ে। ২২ বছরের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেঞ্চুরি ছিল না কোন নেপালী ব্যাটসম্যানের, ছিল না সিরিজ জয়ের নজিরও। অবশেষে একই দিনে দুটি ইতিহাস গড়ে উপমহাদেশের উদীয়মান ক্রিকেট খেলুড়ে দেশটি। দুবাইয়ে জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে স্বাগতিক আরব আমিরাতকে ৪ উইকেটে হারিয়ে ২-১এ ওয়ানডে সিরিজ জিতে নেয় নেপালিরা। দুর্দান্ত সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে ইতিহাস গড়ার দিনে ম্যাচসেরা হন অধিনায়ক পরশ খড়কা (১০৯ বলে ১১৫)।

প্রথম দুই ম্যাচে ১-১ এ সমতা থাকায় তৃতীয় ম্যাচ সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচ হয়ে দাঁড়ায়। টসে জিতে নেপাল ফিল্ডিং করার সিদ্ধান্ত নেয়। শাইমান আনোয়ার আর মোহাম্মদ বুতার ৮৭ ও ৫৯ রানের ইনিংসে ৬ উইকেটে ২৫৪ রান তোলে আরব আমিরাত। ২৫৫ রানের লক্ষ্যে বিপদে পড়েছিল নেপাল। ২৬ ওভারে ১২৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলেছিল দলটি। কিন্তু অধিনায়ক খড়কার সেঞ্চরিটাই ছিল যথেষ্ট। ১০৯ বলে ১১৫ রানের এ ইনিংস দলকে ৩২ বল আগেই জয় এনে দিয়েছে। জয় থেকে ৪০ রান দূরে আউট হয়েছেন খড়কা। তাঁর ইনিংসে ছিল ১৫টি চার ও ১ ছয়। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ছয় নম্বর ইনিংসে এসে সেঞ্চুরি পেয়েছেন নেপালের এই অলরাউন্ডার। দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত হওয়া এই সিরিজে নেপালের শুরুটা হয়েছিল অবশ্য হার দিয়ে। প্রথম ম্যাচে ৩ উইকেটে হারে তারা। নেপালকে ১১৩ রানে অলআউট করে সতেরো ওভার পাঁচ বল বাকি থাকতেই ম্যাচ জেতে আরব আমিরাত। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ঘুরে দাঁড়ায় নেপাল। আমিরাতকে ১৪৫ রানের বড় ব্যবধানে হারায় তারা। নেপালের দেওয়া ২৪৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মাত্র ৯৭ রানে অল আউট হয় আমিরাত। একটা সময় বাংলাদেশের ক্রিকেট এই পর্যায়ে ছিল। ওয়ানডেতে বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করতে পারবেন, সেটা যেন কল্পনাও করা যেত না। শুরুটা করে দিয়েছিলেন মেহরাব হোসেন অপি। বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান। আর এখন নিয়মিতভাবেই প্রতি সিরিজে কেউ না কেউ সেঞ্চুরি করে যাচ্ছেন। মেহরাব যেমন বাংলাদেশের তেমনি এ সেঞ্চুরিতে নেপাল ক্রিকেট ইতিহাসেরই অংশ হয়ে গেলেন খড়কা। এই সিরিজেই সবচেয়ে কম বয়সে হাফ আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরি হাকিয়ে গ্রেট শচীন টেন্ডুলকরকে (১৬ বছর ২১৩ দিন) পেছনে ফেলেন রোহিত পাউদেল (১৬ বছর ১৪৬ দিন)। আইপিএল, বিগ ব্যাশ, বিপিএল খেলার সুবাদে স্পিনার সন্দীপ লামিচানে তো রীতিমতো তারকা। সব মিলিয়ে হিমালয়কণ্যা নেপালের ক্রিকেট ভালই আলো ছাড়াতে শুরু করেছে।

রূপকথার দেশ নেপাল। হিমালয় অধুষ্যিত দক্ষিণ এশীয় দেশটি মূলত পর্যটন শিল্পের কারণে বিখ্যাত। ১৯৯৬ সাল থেকে দলটি ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)’র সহযোগী সদস্যভূক্ত দেশ। এরপূর্বে ১৯৮৮ সাল থেকে আইসিসি’র অনুমোদনপ্রাপ্ত সদস্য দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করতো। নেপাল ক্রিকেট সংস্থার মাধ্যমে নেপাল দলটি পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে দলের অধিনায়কত্ব করছেন পরশ খড়কা। একটি দলতো আর এমনি এমনি আর এসে পড়েনি। এই আসার পিছনেও রয়েছে এক বিরাট ইতিহাস। রাণা রাজবংশের আমলে নেপালে ক্রিকেটের সূচনা। ১৯২০-এর দশকে ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষে তাঁরা দেশে ফিরে ক্রিকেট খেলার ন্যায় রাজকীয় ক্রীড়ার প্রচলন ঘটায়। কেবলমাত্র অভিজাত সম্প্রদায়ের মাঝেই এ খেলা সীমাবদ্ধ রাখা হতো। ১৯৪৬ সালে নেপাল ক্রিকেট সংস্থা গঠিত হয়। ১৯৫১ সালে নেপালী জনগণ রাণা পরিবারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করলে ক্রিকেট খেলা সাধারণ জনগণের মধ্যে ছডড়িয়ে পড়ে।

১৯৬১ সালে নেপাল ক্রিকেট সংস্থা (সিএএন) জাতীয় ক্রীড়া সংস্থার অংশ হয়। এর ফলে ক্রিকেটকে সমগ্র নেপালে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগী ভূমিকা নেয়া হয়। কিন্তু ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত রাজধানী কাঠমান্ডু এলাকাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে কাঠমান্ডুর বাইরে ১৯৮০-এর দশকে ক্রিকেট খেলাকে বিস্তৃত করা হয়। ১৯৮৮ সালে নেপাল আইসিসির অন্যতম অনুমোদনপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৯৯০-এর শুরুতে আঞ্চলিক ও জেলা প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে বড় ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়। এছাড়াও বিদ্যালয়গুলোতে ক্রিকেটের প্রসারে উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করা হয়। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দলীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগের শৈথিল্যসহ আরও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়। এ প্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ নেপালকে সহযোগী সদস্যপদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং দলীয় প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগের শৈথিল্যসহ আরও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়। এ প্রেক্ষিতে ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল কর্তৃপক্ষ নেপালকে সহযোগী সদস্যপদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। একই বছর কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত এসিসি ট্রফি প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো জাতীয় দল অংশগ্রহণ করে। প্রথম রাউন্ডে ছয় দলের মধ্যে চতুর্থ স্থান দখল করে। ব্রুনাই এবং জাপান তাদের কাছে পরাজিত হয়। ১৯৯৬ সাল থেকে দলটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অংশগ্রহণ করছে। পাশাপাশি প্রতিটি এসিসি ট্রফি,এসিসি টুর্নামেন্টে টি২০ কাপ, ২০০১ আইসিসি ট্রফি এবং দুটি আইসিসি আন্তঃমহাদেশীয় কাপ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। সাম্প্রতিককালে আইসিসি বিশ্ব টি২০ বাছাই পর্বে নেপাল দলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। নেপাল বর্তমানে ২০১৩ সালের আইসিসি বিশ্ব ক্রিকেট লীগ ডিভিশন থ্রী প্রতিযোগিতা বিজয়ী। এরফলে তারা নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অংশগ্রহণের জন্য যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৪ আইসিসি বিশ্ব টি২০ যোগ্যতা নির্ধারণ প্রতিযোগিতা নবেম্বর ২০১৩ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হয়। এই টুর্নামেন্টে ৩য় স্থান অর্জন করে ২৭ নবেম্বর, ২০১৩ তারিখে তারা বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের আইসিসি বিশ্ব টি২০ প্রতিযোগিতায় প্রথমবারের মতো ১৬ দলের অংশগ্রহণে অন্য দশটি পূর্ণাঙ্গ সদস্যদের সঙ্গে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এর ফলে দলটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত প্রথম বড় ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে। গ্রুপ-পর্বে নেপাল দল বাংলাদেশ, হংকং ও আফগানিস্তানের মোকাবেলা করে। এর মধ্যে আফগানিস্তান আর হংকংকে হারাতে পারলেও তারা নেট রান রেটের কারনে তারা সুপার টেনে কোয়ালিফাই করে নাই। ২০১৬’র জন্য হওয়া ২০১৫’র বাছাইপর্বে নেপাল কোয়ালিফাই করেনি।