২৬ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকাই চলচ্চিত্রে রোমান্টিকতা

  • সাজ্জাদ কাদির

ঢাকাই চলচ্চিত্র প্রেম-ভালবাসা থাকবে না এটা হতেই পারে না। সেটা হোক পারিবারিক গল্পের কিংবা সামাজিক এ্যাকশনধর্মী তাতে ভালবাসা থাকতেই হবে। আর নির্ভেজাল রোমান্টিক চলচ্চিত্র হলেতো কথাই নেই। এ যাবত যতগুলো ঢাকাই চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে হিসাব করলে দেখা যায় যে পারিবারিক গল্প এবং সামাজিক এ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্রের পাশাপাশি রোমান্টিক চলচ্চিত্রকেও দর্শক দারুণভাবে গ্রহণ করেছে। আজকে ভালবাসা দিবসে ঢাকাই রোমান্টিক চলচ্চিত্রের কথা বলার চেষ্টা করব।

১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রাজ্জাক-সুচন্দা জুটির জহির রায়হানের পরিচালনায় রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘বেহুলা’। এই চলচ্চিত্রে বেহুলা-লখিন্দরের এক অসাধারণ প্রেম উপাখ্যান রচিত হয়েছে। সূচন্দার দ্বিতীয় এবং রোমান্টিক নায়ক হিসেবে রাজ্জাকের প্রথম চলচ্চিত্র এটি। নতুন হিসেবে দু’জনই বেহুলা এবং লখিন্দর চরিত্রে অসাধারণ প্রেম কাহিনী ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। সব মিলিয়ে নাচে গানে ভরপুর এক নিটল প্রেমের রসায়ন রচিত হয়েছে এই চলচ্চিত্রে এবং একটি ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র এটি। এই চলচ্চিত্রটিই নায়ক রাজ রাজ্জাকের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং ঢাকাই চলচ্চিত্র দেখা পায় এক রোমন্টিক নায়কের।

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত প্রথম রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘অবুঝ মন’। কাজী জহিরের পরিচালনায় এই ছবির প্রধান দুটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক-শাবানা। সদ্য ডাক্তারি পাস করা গরিব ঘরের সন্তান মাসুম (রাজ্জাক) এবং জমিদার কন্যা মাধবীর (শাবানা) ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানগত এক অসম প্রেম কাহিনী নিয়ে এই চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে। চলচ্চিত্রটি ঐ সময় সারাদেশে অসম্ভব জনপ্রিয়তা ও খ্যাতি লাভ করে। এটিও একটি ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রে রাজ্জাক-শাবানা জুটির ঠোঁটে ‘শুধু গান গেয়ে পরিচয় চলার পথে ক্ষণিক দেখায়’ গানটি এখনও মানুষের মুখে মুখে ফিরে।

১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সুজন সখী’ চলচ্চিত্রটি এদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক মাইল ফলক। ফারুক-কবরী জুটির এই চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন খান আতাউর রহমান। পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে দুই ভাইয়ের আলাদা হয়ে যাওয়া এবং তাদের ছেলে-মেয়ের ভালবাসাকে কেন্দ্র করে মিলনের এক অসাধারণ গল্প তুলে ধরা হয়েছে এই চলচ্চিত্রে। এই চলচ্চিত্রে ‘সব সখীরে পার করিতে নেব আনা আনা তোমার বেলায় নেব সখি তোমার কানের সোনা’ গানটি ঢাকাই চলচ্চিত্রের একটি শীর্ষস্থানীয় জনপ্রিয় গান।

১৯৭৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘অনন্ত প্রেম’। ছবিটি প্রযোজনা এবং প্রথমবারের মতো পরিচালনা করেন নায়ক রাজ রাজ্জাক। পর্দায় অভিনয় করেন রাজ্জাক-ববিতা জুটি। এই চলচ্চিত্রের জন্যই চিত্রায়িত হয়েছিল বাংলাদেশী চলচ্চিত্রের প্রথম চুম্বন দৃশ্য যদিও পরে দৃশ্যটি বাদ পড়ে যায়। রাজ্জাক-ববিতা জুটির প্রেম কাহিনী সারা দেশে বেশ জনপ্রিয়তা পায় এবং এই জুটি ঢাকাই চলচ্চিত্রের এখন পর্যন্ত অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে পরিগণিত হয়। এই চলচ্চিত্রের ‘ও চোখে চোখ পড়েছে যখনি’ রোমান্টিক গানটি কোথাও বেজে ঊঠলে এখনও মানুষের কান খাড়া হয়ে যায়।

১৯৯১ সালে প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার এহতেশামের পরিচালনায় নির্মিত হয় ঢাকাই সিনেমার অন্যতম সেরা রোমান্টিক চলচ্চিত্র ‘চাঁদনী’। এই ছবিতে শাবনাজ-নাঈমের মতো একজোড়া রোমান্টিক জুটির দেখা পায় এদেশের চলচ্চিত্র দর্শক এবং রীতিমতো নড়েচড়ে বসে। প্রথমবারের মতো ঢাকায় নির্মিত হয় টিনএজের প্রেম কাহিনী। নির্মাণ, অভিনয় আর গল্পের কারণে ছবিটি দর্শক লুফে নেয়। বিশেষ করে কিশোর বয়সের দুই শিল্পীর অভিনয় দেখতে দর্শক দলে দলে সিনেমা হলে লাইন দেয়। দীর্ঘদিন মধ্যবয়স্ক নায়ক-নায়িকা দেখতে দেখতে ঢাকাই সিনেমার দর্শক যখন ক্লান্ত ঠিক তখনই ঢাকাই ছবিতে অল্প বয়সের নায়ক-নায়িকা নিয়ে কাজ করার ধারা চালু হয় এই ছবি দিয়েই। এই ছবির পরে শাবনাজ-নাঈম জুটি আরও প্রায় ২০টি রোমান্টিক ছবিতে অভিনয় করেন।

১৯৯৩ সালে সোহানুর রহমান সোহানের পরিচালনায় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। ছবিটি আমির খান-জুহি চাওলা জুটির সুপারহিট হিন্দী চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’-এর অফিসিয়াল পুনঃনির্মাণ। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এদেশের সিনেমা দর্শক পায় সালমান শাহ্র মতো সর্বকালের সেরা এক অন্যতম রোমান্টিক নায়ক। সঙ্গে মৌসুমীর মতো এক মিষ্টি রোমান্টিক নায়িকা। এই চলচ্চিত্রে দুই পরিবারের দ্বন্দ্বের মাঝে ভালবাসার এক অমর গল্প রচিত হয়। আর এই গল্পে অভিনয় করে সালমান শাহ-মৌসুমী এদেশের সিনেমা দর্শকের নিকট দারুণ রোমান্স ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। এই জুটি পরপর একসঙ্গে আরও তিনটি রোমান্টিক ছবিতে কাজ করেন। এগুলো হলো ‘অন্তরে অন্তরে’, ‘দেনমোহর’ ও ‘¯েœহ’। প্রতিটি ছবিই তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এরই মধ্যে সালমান শাহ্র সঙ্গে জুটি গড়েন আর এক নায়িকা শাবনূর। সালমান শাহ-শাবনূর জুটির রসায়ন দারুণভাবে গ্রহণ করে এদেশের সিনেমা দর্শক। তাইতো তারা একে একে উপহার দেন ১৪টি রোমান্টিক ছবি। এ তালিকায় আছে- ‘তুমি আমার’, ‘রঙিন সুজন সখী’, ‘বিক্ষোভ’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘মহামিলন’, ‘বিচার হবে’, ‘তোমাকে চাই’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘জীবন সংসার’, ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’, ‘প্রেম পিয়াসী’, ‘স্বপ্নের নায়ক’, ‘আনন্দ অশ্রু’ ও ‘বুকের ভেতর আগুন’।

মৌসুমী-শাবনূর ছাড়াও শাবনাজ, লিমা, শাহনাজ, বৃষ্টি, শিল্পী, কাঞ্চি, শ্যামা, সাবরিনা, তমালিকা কর্মকার প্রভৃতি নায়িকার সঙ্গেও সালমান শাহ জুটি গড়ে অভিনয় করেন। এই সময়ে তিনি সর্বমোট ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন। প্রতিটি চলচ্চিত্রই রোমান্টিক এবং ব্যবসাসফল। ঢাকায় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সালমান শাহ্র এই সময়েই সর্বাধিক রোমান্টিক ছবি নির্মিত হয়। এজন্য একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সালমান শাহ আমৃত্যু এদেশের সিনেমা দর্শকের নিকট রোমান্টিক নায়কদের মধ্যে এক মুকুটহীন স¤্রাট ছিলেন।

সালমান শাহ্র অকাল মৃত্যুতে যেন এদেশের সিনেমায় ভালবাসারই মৃত্যু ঘটে। সেই জায়গাটি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন পরবর্তীতে রিয়াজ এবং ফেরদৌস। ১৯৯৭ সালে রিয়াজ অভিনীত ও মোহাম্মদ হান্নান পরিচালিত ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ চলচ্চিত্রটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয় এবং রোমান্টিক নায়ক হিসেবে রিয়াজের আসনটি মজবুত হয়। এই চলচ্চিত্রে তাঁর ঠোঁটে ‘পড়ে না চোখের পলক’ গানটি তাঁকে তরুণ-তরুণীদের হার্টথ্রবে পরিণত করে। ফেরদৌস ব্যাপকভাবে আলোচিত ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন ১৯৯৮ সালে ভারতের চলচ্চিত্রকার বাসু চ্যাটার্জি পরিচালিত যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘হঠাৎ বৃষ্টি’ ছবির মাধ্যমে। ঢাকাই চলচ্চিত্রে পারিবারিক গল্প এবং সামাজিক এ্যাকশানধর্মী চলচ্চিত্রের পাশাপাশি আবারও অসংখ্য ভালবাসার চলচ্চিত্র নির্মিত হবে ভালবাসা দিবসের এই দিনে আমরা সেই স্বপ্নের কথাই বলতে চাই।