১৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ডাকসু নির্বাচন

অবশেষে হতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। আটাশ বছর পর এই নির্বাচন হবে আগামী ১১ মার্চ। ইতোমধ্যে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার মধ্যেই আশা করা যায় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদের নির্বাচনেরও আয়োজন হবে। আদালতের আদেশের বাধ্যবাধকতাকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ ইতিবাচক। এমনকি দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন ও জাতীয় নেতা তৈরিতে ভাল ভূমিকা রাখবে তাতে সন্দেহ নেই। এর প্রমাণ ডাকসুতে বিজয়ী ও বিজিতরাই পরবর্তীকালে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং এখনও দিয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের সমস্যার পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকে গণতন্ত্র ও অন্যের মত প্রকাশের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মানসিকতা তৈরির লক্ষ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ গড়ে তোলা এবং সেগুলোতে নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অতীতে ছাত্রনেতাদের ফলপ্রসূ ভূমিকার পরও কেন দীর্ঘ ২৮ বছরের বেশি সময় ধরে ডাকসু, এমনকি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনের আয়োজন করা হয়নি তা বিস্ময়কর বৈকি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্বে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে সামরিক শাসকদের সময়। ব্যতিক্রম কেবল বঙ্গবন্ধু সরকারের গণতান্ত্রিক শাসনামেল ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে পর পর দুটি ডাকসু নির্বাচন আয়োজন। অবশ্য তেয়াত্তর সালের নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়ে যাওয়ায় ভোট গণনা যেমন হয়নি, তেমনি ডাকসুও গঠিত হয়নি।

১৯৭৯, ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালের পর ১৯৮৮ ও ১৯৯৯ সালে সামরিক জান্তা শাসকের আমলে ডাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর অসহযোগ আন্দোলনে ডাকসু নেতৃত্ব দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ডাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ছাত্র সংসদ নেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ডাকসু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। নির্বাচিত সরকারগুলোর সময় ছাত্র সংসদের নির্বাচন না হওয়ার নেপথে পাকিস্তানী সামরিক শাসক ও শোষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলনের তীব্রতার ভয় গণতান্ত্রিক সরকারগুলোকেও পেয়ে বসেছিল কিনা, এমন সন্দেহ স্বাভাবিকভাবেই জাগতে পারে। বলা হতে পারে ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের মতো পরিবেশ ও পরিস্থিতি ছিল না শিক্ষাঙ্গনগুলোতে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ছিল না অনুকূলে। তাই নির্বাচন নিয়ে ভাবনা-চিন্তা ছিল ভাসা ভাসা। শেখ হাসিনা সরকারের টানা তৃতীয় দফা ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নির্বাচন আয়োজনে সাহস পাচ্ছিলেন না বলে ধারণা করা হচ্ছিল। অবশেষে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে ছাত্রদের। তাদের মামলার পরিপ্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ নির্বাচন আয়োজন করেছে।

ডাকসু কখনও শাসকদের রক্তচক্ষুর কাছে মাথা নত করেনি। বরং থেকেছে প্রতিবাদী। তবে ১৯৮১-১৯৮২ সালের নির্বাচনে বিজয়ী ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছাত্র সমাজের রায় ও চাওয়াকে উপেক্ষা করে সামরিক জান্তা শাসকের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মন্ত্রী বনে যাওয়ার মতো কলঙ্কজনক ঘটনাও রয়েছে। সাধারণ ছাত্ররা তাকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণার পর তিনি গত প্রায় চার দশক ধরে ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি। ভবিষ্যত নেতৃত্ব তৈরি ও শিক্ষাঙ্গনে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ডাকসু নির্বাচন যেন হয় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। বৈধ ভোটাররা যেন নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে। ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠন এমনিতেই ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ। তাদের নির্বাচনে অংশ নেয়ার অধিকার নেই। তবে উপযুক্ত সব ছাত্রসংগঠন যেন বিনা বাধায় প্রার্থিতা দাখিল, প্রচারণা ও নির্বিঘ্নে ভোট চাইতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে ক্যাম্পাস প্রশাসনকে। ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে নেয়ার দাবি যুক্তিযুক্ত হতে পারে না। ছাত্রত্বের পরিচয় হচ্ছে হলভিত্তিক। তারা হলের ছাত্র হিসেবেই চিহ্নিত হয়। সুতরাং হলে ভোটকেন্দ্র থাকা স্বাভাবিক। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কোন সহিংসতা, হানাহানি, হাঙ্গামা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আশা করা যায়, শেষ পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের বদ্ধ দুয়ার খুলে যাবে, এই প্রত্যাশা সঙ্গত।

নির্বাচিত সংবাদ