১৮ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সময়ে ইসলাম প্রচার

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর খলীফা বা প্রতিনিধি করে। মানুষকে তিনি সৃষ্টি করেছেন শুধুমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য। মানুষকে তিনি দান করেছেন পথ চলার দিশা। হযরত আদম ‘আলায়হিস্ সালাম থেকে আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম পর্যন্ত প্রায় এক লাখ চব্বিশ হাজার মতান্তরে দুই লাখ চব্বিশ হাজার নবী-রসূল পৃথিবীতে এসেছেন মানুষকে সঠিক পথে চলবার দিশা দেয়ার জন্য। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু মানুষকে দান করেছেন দীন বা জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম আল্লাহ্র দেয়া একমাত্র জীবন ব্যবস্থা, যা হযরত আদম (আ) হতে প্রচারিত হতে হতে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে। তিনি পৃথিবীতে আবির্ভূত হন সমগ্র মানবজাতির জন্য, তিনি আবির্ভূত হন বিশ্ব জগতের জন্য রহমতরূপে। তিনি আবির্ভূত হন সিরাজাম মুনীরারূপে অর্থাৎ প্রদীপ্ত চেরাগরূপে। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ইরশাদ করেন, হে নবী, নিশ্চয়ই আপনাকে প্রেরণ করা হয়েছে সাক্ষ্য দাতারূপে, সুসংবাদদাতারূপে, সতর্ককারীরূপে এবং আল্লাহ্র দিকে তাঁরই অনুমতিক্রমে আহ্বানকারীরূপে এবং প্রদীপ্ত চেরাগরূপে। (সূরা আহযাব: আয়াত ৪৫)।

৬১০ খ্রিস্টাব্দের ২৭ রমাদান রাতে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তাঁর নিকট প্রথম ওহী প্রেরণ করেন। তিনি প্রথম ওহী পেয়ে অতি সঙ্গোপনে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তিন বছর সঙ্গোপনে ইসলাম প্রচার করার পর তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার করার জন্য ওহীপ্রাপ্ত হলেন। আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু তাঁকে নির্দেশ দিলেন : (হে রসূল) আপনাকে যে বিষয়ে আদেশ করা হয়েছে আপনি তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন আর মুশরিকদের পরোয়া করবেন না। (সূরা হিজর : আয়াত ৯৪)। আপনার নিকটাত্মীয়বর্গকে সতর্ক করে দিন। (সূরা শু’আরা : আয়াত ২১৪)।

এই নির্দেশ পেয়ে প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইসলাম প্রচারের উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। তিনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মক্কার বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ধরে উচ্চঃস্বরে আহ্বান করলেন। সবাই এসে পাহাড়ের পাদদেশে জড়ো হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন : যদি আমি কোন কথা তোমাদের নিকট উপস্থাপন করি, তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে না? সবাই বলল, আপনি আল-আমীন, আমরা আপনার কথা বিশ্বাস করব। আপনি তো নির্দোষ ও নিষ্কলঙ্ক। তিনি বললেন : আমি যদি বলি, এই পর্বত শ্রেণীর আড়াল থেকে একটি অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের আক্রমণ করতে ছুটে আসছে তাও কি তোমরা বিশ্বাস করবে? সবাই সমস্বরে বলে উঠল : নিশ্চয়ই বিশ্বাস করব। আপনি যে আল আমীন, আপনি তো আস্সাদীক। তিনি তখন বললেন : তাহলে তোমরা শোনো, আমি তোমাদের কঠোর আজাবের সতর্কবাণী শোনাচ্ছি।

তিনি একে একে এক একটি গোত্রকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, হে বনু আব্দি মনাফ, বনু জাহারা, আমার আত্মীয়স্বজনকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য আমাকে আদেশ করা হয়েছে। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্- এই কলেমায় তোমরা ইমান আনো। যদি তোমরা এতে ইমান না আনো তাহলে তোমাদের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধন অসম্ভব হবে।

প্রিয়নবী (সা) প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যে পদ্ধতি অবলম্বন করলেন, তাতে লক্ষ্য করা যায় যে, আসল কথা তুলে ধরার পূর্বে তিনি সমবেত সকলের মন-মানসিকতা এবং তঁাঁর প্রতি তাদের আস্থা যাচাই করে নিলেন। ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তাঁকে এবং তাঁর সাহাবীগণকে দারুণ কষ্ট, লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হয়েছে। কিন্তু কোন কিছুই তাঁকে এই মহান কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। বরং তিনি ঘোষণা করেছেন, আল্লাহর কসম, আমার এক হাতে সূর্য এবং অন্য হাতে চন্দ্র এনে দেয়া হলেও আমি আমার কর্তব্য পালন করা থেকে বিরত হব না।

তিনি হযরত যায়দ বিন হারিসা রাদি আল্লাহ্ তা’আলা আন্হুকে সঙ্গে নিয়ে তায়েফে গিয়েছেন সেখানকার মানুষকে হিদায়াত দান করার জন্য, তাদের মধ্যে ইসলাম প্রচার করার জন্য। তায়েফে তিনি প্রায় এক মাস অবস্থান করেন। এই সময়ে তিনি তায়েফের মানুষের নিকট ইসলামের দাওয়াত দিতে থাকেন। তায়েফের মানুষ তাঁর দাওয়াত গ্রহণ তো করলই না বরং তাঁকে কঠোর ভাষায় বিদ্রƒপ করতে লাগল, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করল, এমন কি দৈহিক নির্যাতন চালাল, পাথর মেরে তার জিসম মুবারক রক্তাক্ত করে দিল। তাঁর জিসম ও কদম মুবারক থেকে পবিত্র খুন প্রবাহিত হলো। তিনি এমন অবস্থাতেও ধৈর্য ইখ্তিয়ার করলেন। তিনি তায়েফবাসীর অকথ্য জুলুম-নির্যাতনের কথা ভুলে গিয়ে তাদের জন্য দোয়া করলেন এই বলে : আল্লাহ্ গো, আমার দুর্বলতা, উপায়হীনতা এবং মানব দৃষ্টিতে হেয়তার জন্য আপনার দরবারেই ফরিয়াদ করছি, হে রহমানুর রহীম, হে পরম করুণাময় দয়ালুদাতা, সমস্ত দুর্বলের রব্ আপনি এবং আপনিই আমার রব। যদি আপনি আমার ওপর ক্রুদ্ধ না হয়ে থাকেন তাহলে আমি কোন পরোয়া করি না। আপনার শান্তি, আপনার আফিয়াত আমার আশ্রয়। আমি আপনার সেই নূরের আশ্রয় প্রার্থনা করছি যে নূর মুবারকে আসমান যমিন রওশান হয়েছে, যে নূরের ছটায় অন্ধকার বিদুরিত হয়, যে নূরের ছটায় দুনিয়া ও আখিরাতের কর্ম সম্পাদন হয়। সেই নূর মুবারকের উসিলায় আপনি আপনার গযব নাযিল করবেন না, আপনার অসন্তুষ্টি নাযিল করবেন না। একমাত্র আপনার সন্তুষ্টি সাধন করাই আমার কর্তব্য যতক্ষণ না আপনি সন্তুষ্ট হন। লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিকা।

সেদিন তায়েফে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে অত্যাচার জর্জরিত অবস্থায় তিনি ধৈর্য ধারণ করে যারা তাঁকে আঘাত করল তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করে ইসলাম প্রচারের কি নীতিমালা হওয়া উচিত তার অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। তিনি সেদিন ক্ষমার পথ বেছে নিলেন, তিনি তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলেন। তিনি বললেন : হয়ত আল্লাহ্ তা’আলা তায়েফবাসীদের কারও বংশে এমন মানুষ পয়দা করবেন যারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং আল্লাহ্র সঙ্গে কারও শরিক করবে না।

পরবর্তীকালে হযরত ‘আয়িশা রাদিআল্লাহ্ তা’আলা আন্হা প্রিয়নবী (সা)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন : হে আল্লাহর রসূল, ওহোদের চেয়ে আপনার জীবনে কি কোন কঠিনতর দুর্দিন এসেছে? প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন : তায়েফে আমার জীবনে সবচেয়ে কঠিন দুর্যোগের দিন এসেছিল।

মদিনায় হিজরতের পূর্বে হজ মৌসুমে মক্কার আকাবাতে মদিনার বনী খাজরায ও বনী আউসের কিছু প্রধান ব্যক্তির সঙ্গে অতি গোপনে প্রিয়নবী (সা) মিলিত হন এবং তাদের বলেন : তোমারা আল্লাহর ইবাদত করবে। তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের কথা শুনবে ও মানবে, সুখে-দুঃখে আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ ব্যয় করবে। আল্লাহর আদেশ প্রচারে কোন নিন্দাকারীর নিন্দাকে পরোয়া করবে না। তোমাদের সঙ্গে সম্মিলিত হলে আমাদের সাহায্য করবে। যেভাবে তোমরা স্ত্রী, সন্তান ও নিজেদের রক্ষা কর ঠিক সেভাবে আমাকে রক্ষা করবে। চলবে...

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ