২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামায়াত ছাড়লেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক

 জামায়াত ছাড়লেন ব্যারিস্টার  রাজ্জাক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য দেশের মানুষের কাছে ‘ক্ষমা না চাওয়ায়’ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক, যিনি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে শীর্ষ জামায়াত নেতাদের আইনজীবী দলের নেতৃত্বে ছিলেন। শুক্রবার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল দল থেকে রাজ্জাকের পদত্যাগ। সব মহলেই এ নিয়ে আলোচনা হয়। চলে তুমুল বিশ্লেষণ।

তবে রাজনৈতিক বোদ্ধা থেকে শুরু করে অনেকেই মনে করেন রাজনীতিতে টিকে থাকার প্রয়োজনে জামায়াত এখন ভিন্ন কৌশল নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। এরই ধারাবাহিকতার প্রথম ধাপ হতে পারে রাজ্জাকের পদত্যাগ। এতে মানুষের মধ্যে জামায়াত সম্পর্কে ভিন্ন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। এই সুযোগে তারা বিভিন্ন দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বা ভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের মধ্য দিয়ে মূল ধারার রাজনীতির সঙ্গে মিশে যেতে পারে। আবার অনেকেই বলছেন, জামায়াতের সংস্কারে যারা কথা বলেছেন তারাই নানা কৌশলে দলচ্যুত হয়েছে। তাদের একজন রাজ্জাক। আবার দলের একটি পক্ষ চায় নাম পরিবর্তন করে ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন করে রাজনীতি শুরু করা হোক।

যুদ্ধাপরাধী আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ার ৫ দিনের মাথায় তিনি দেশ ছাড়েন। রাজ্জাক যুক্তরাজ্যেরও নাগরিক। এখন তিনি সেখানেই বসবাস করছেন। রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্র দিয়েছেন জামায়াতের আমির মকবুল আহমদের কাছে। সেখানে তিনি মকবুল আহমদকে ‘পরম শ্রদ্ধেয় মকবুল ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন। যুক্তরাজ্য থেকেই তিনি পদত্যাগপত্রটি পাঠান। পদত্যাগপত্রের এক জায়গায় আবদুর রাজ্জাক লেখেন, ডিসেম্বরের নির্বাচনের (একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন) পর জানুয়ারি মাসে জামায়াতের করণীয় সম্পর্কে আমার মতামত চাওয়া হয়। আমি যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দিই। অন্য কোন বিকল্প না পেয়ে বলেছিলাম, জামায়াত বিলুপ্ত করে দিন।’

রাজ্জাকের পদত্যাগে ব্যথিত জামায়াত। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল শফিকুর রহমান বলেছেন, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যেখানে আর যেভাবেই থাকুন, তার সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ‘মহব্বতের সম্পর্কই’ থাকবে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এক বিবৃতিতে বলেন, তার পদত্যাগে আমরা ব্যথিত ও মর্মাহত। পদত্যাগ করা যে কোন সদস্যের স্বীকৃত অধিকার। আমরা দোয়া করি তিনি যেখানেই থাকুন, ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন।

লন্ডনে আইন পড়া রাজ্জাক ১৯৮৬ সালে দেশে ফিরে এ্যাডভোকেট হিসেবে এনরোলমেন্ট নেন। ওই সময় থেকেই তিনি জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর আইনজীবী হিসেবে রাজ্জাকের নাম আলোচনায় আসে। ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হলে তাদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে আদালতে দাঁড়ান রাজ্জাক।

পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক বলেছেন, একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জামায়াতে ইসলামী জনগণের কাছে ক্ষমা না চাওয়ায় এবং একবিংশ শতাব্দীর বস্তবতার আলোকে দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে দলের সংস্কার করতে ব্যর্থ হওয়ায় তার পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত। সময়ের দাবিতে সাড়া দিয়ে ‘বাংলাদেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের আওতায় ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে’ জামায়াতকে একটি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যর্থতা নিয়েও পদত্যাগপত্রে হতাশা প্রকাশ করেছেন তিনি। চার পৃষ্ঠা লেখা পদত্যাগপত্রে ১৩টি বিষয় যুক্ত করেছেন তিনি।

রাজ্জাকের বড় ছেলে ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী জানান, শুক্রবার জামায়াতের আমির মকবুল আহমদকে ওই পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তার বাবা। জামায়াতের একজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেছেন, ঢাকায় তাদের আমিরের কাছে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগপত্র আসার কথা তিনিও জানতে পেরেছেন। আব্দুর রাজ্জাকের ব্যক্তিগত সহকারী কাউসার হামিদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক দুটি কারণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন।

‘জামায়াত ’৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি এবং একবিংশ শতাব্দীর বস্তবতার আলোকে এবং অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।

জ্যেষ্ঠ বদরনেতা আব্দুল কাদের মোল্লর ফাঁসির ৫ দিন পর ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রাজ্জাক ঢাকা ছাড়েন। এসেক্সের বারকিং থেকে ঢাকায় পাঠানো ওই পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক লিখেছেন, একাত্তরে মুক্তিদ্ধের বিরোধিতা পরবর্তীকালে ‘জামায়াতের সকল সাফল্য ও অর্জন ম্লান করে দিয়েছে।’

রাজ্জাক লিখেছেন, গত প্রায় দুই দশক তিনি জামায়াতকে, বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে, একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকা ও পাকিস্তান সমর্থনের কারণ উল্লেখ করে জাতির কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়া উচিত। আমি সব সময় বিশ্বাস করেছি এবং এখনও করি যে, ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে নেতিবাচক ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া শুধু নৈতিক দায়িত্বই নয় বরং তৎপরবর্তী প্রজন্মকে দায়মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত জরুরী কর্তব্য।

জামায়াতে ইসলামীর সূচনা হয় উপমহাদেশের বিতর্কিত ধর্মীয় রাজনীতিক আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট, তখন এর নাম ছিল জামায়াতে ইসলামী হিন্দ। পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরোধিতা করায় ১৯৬৪ সালে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হলেও পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন ১১ দফাসহ বিভিন্ন দাবির বিরোধিতা করে জামায়াত। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস্ নামে বিভিন্ন দল গঠন করে জামায়াত ও এর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ। সে সময় তারা সারা দেশে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো যুদ্ধাপরাধ ঘটায়। সেই অপরাধে সর্বোচ্চ আদালতে এ পর্যন্ত জামায়াতের সাত শীর্ষ নেতার সাজা হয়েছে, তাদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হয়েছে।

১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে জামায়াতের মতো ধর্মাশ্রয়ী দলগুলো নিষিদ্ধ হলেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান তাদের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ করে দেন। আর ২০০১ সালের এক অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পর জিয়ার স্ত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে যুদ্ধাপরাধী দুই জামায়াত নেতাকে দেন মন্ত্রিত্ব।

একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করে আদালতের একটি রায়ে বলা হয়, দেশের কোনো সংস্থার শীর্ষ পদে স্বাধীনতাবিরোধীদের থাকা উচিত নয়।

শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় উচ্চ আদালতের নির্দেশ নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। ব্যক্তির পাশাপাশি দল হিসেবে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আইনী কাঠামো তৈরির কাজ করছে সরকার।

রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে শীর্ষ জামায়াত নেতাদের মামলা তিনি ‘সততা ও একাগ্রতার সঙ্গেই’ পরিচালনা করেছেন। আবার আরেক জায়গায় তিনি লিখেছেন, একাত্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের উপলব্ধি ও মুক্তির আকাক্সক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছিল বলে মনে করেন তিনি। যে কোন রাজনৈতিক দল, ইতিহাসের কোন এক পর্বে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে ত্রুটি-বিচ্যুতির শিকার হতে পারে। কিন্তু তাকে ক্রমাগত অস্বীকার করে, সেই সিদ্ধান্ত ও তার ফলাফল মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনড় অবস্থান বজায় রাখা শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয় বরং আত্মঘাতী রাজনীতি। তা কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

রাজ্জাক লিখেছেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য ‘গ্রহণযোগ্য বক্তব্য প্রদানের ব্যর্থতা এবং ক্ষমা না চাওয়ার দায়ভার’ এখন তাদেরও নিতে হচ্ছে, যারা তখন ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িত ছিল না, এমনকি যাদের তখন জন্মও হয়নি। এই ক্রমাগত ব্যর্থতা জামায়াতকে স্বাধীনতাবিরোধী দল হিসাবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছে। ফলে জামায়াত জনগণ, গণরাজনীতি এবং দেশ বিমুখ দলে পরিণত হয়েছে। দলীয় ফোরামে কবে কখন কীভাবে তিনি এ বিষয়ে যুক্তি দিয়েছেন, তার একটি তালিকা পদত্যাগপত্রে তুলে ধরেছেন এই আইনজীবী।

১৯৮৬ সালে জামায়াতে যোগ দেয়ার পর দলের ভেতর থেকেই সংস্কারের চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জানিয়ে রাজ্জাক লিখেছেন, দলের কাঠামোগত সংস্কার, নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং জামায়াতের উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও কর্মসূচীতে ‘আমূল পরিবর্তন’ আনতে তার তার প্রস্তাবগুলো গত ৩০ বছরে ইতিবাচক সাড়া পায়নি।

পদত্যাগপত্রে রাজ্জাক বলেছেন, অতীতে অনেকবার পদত্যাগের কথা ভাবলেও তিনি নিজেকে বিরত রেখেছেন এই ভেবে যে দলের সংস্কার করা সম্ভব হলে এবং একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চাইলে তা হবে একটি ‘ঐতিহাসিক অর্জন’। কিন্তু জানুয়ারি মাসে জামায়াতের সর্বশেষ পদক্ষেপ আমাকে হতাশ করেছে। তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলাম। এখন থেকে আমি নিজস্ব পেশায় আত্মনিয়োগ করতে চাই। সেই সঙ্গে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি সমৃদ্ধশালী ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করব।

ল-নে সাংবাদিকদের রাজ্জাক বলেন, জামায়াত থেকে পদত্যাগ করে নতুন কোন সংগঠনে যুক্ত হওয়ার কোন ইচ্ছা আমার নেই। তিনি তার নিজের পেশায় আত্মনিয়োগ করবেন জানিয়ে বলেন, জামায়াত কী করবে কী করবে না, সেটা আমি বলতে পারব না। পদত্যাগপত্রে বলেছি আমি আমার পেশায় যুক্ত থাকব। নতুন কোন সংগঠনে যুক্ত হচ্ছি না। তিনি বলেন, আমি জামায়াতে ইসলামীতে ছিলাম। আজকে পদত্যাগপত্র দলের আমির মকবুল আহমদের কাছে পাঠিয়েছি। আমি নিজে ফোনে কথা বলেছি তার সঙ্গে, দলের সেক্রেটারি জেনারেল ডাঃ শফিকুর রহমান সাহেবকে জানিয়েছি। আমরা বন্ধু ছিলাম। আমাদের সম্পর্ক ভাল থাকবে আশা করি।’

রাজ্জাক তার পদত্যাগপত্রে জানিয়েছেন তিনি কয়েক দফায় জামায়াতকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেন। ২০০১ সাল থেকে এ বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি তার পরামর্শ অব্যাহত রাখেন। এরমধ্যে ২০০৭-০৮ সালে, ২০১১ সালে সর্বশেষ শূরার বৈঠকে, ২০১৬ সালের মার্চে, নবেম্বরে তিনি আমিরের কাছে লিখিতভাবে প্রস্তাব করেন।

জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের পরিবারের সদস্যদের অনেকে বলছেন, জামায়াতে সংস্কারের প্রস্তাব তুলে কোন নেতাই দলে থাকতে পারেননি। তবে এবার ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের পদত্যাগ বড় ঘটনা। দলের অনেকেই এটাকে পরবর্তী নতুন সংগঠনের কৌশল হিসেবে দেখছেন। যদিও বিগত দিনে যারাই জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা প্রসঙ্গে বা সংস্কার চেয়ে কথা বলেছেন, তাদের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

১৯৮২ সালে জামায়াতের অনুজ সংগঠন ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন অধ্যাপক আহমদ আবদুল কাদের। বর্তমানে ২০ দলীয় জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের মহাসচিব তিনি। তার ভাষ্যে, ‘জামায়াতের ৭১ সালের ভূমিকা নিয়ে রিভিউ করেছিলাম। রিভিউ বলতে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা। প্রায় ২০/২৫টি প্রশ্ন ছিল আমাদের। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জামায়াতের অবস্থানের সিদ্ধান্ত জামায়াতের ফোরামে হয়নি। আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, এ সিদ্ধাস্ত কোথায় হয়েছে? কার সভাপতিত্বে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। ২৬ মার্চ পর্যন্ত জামায়াত শেখ মুজিবকে ক্ষমতা দেয়ার দাবি জানিয়েছে। তাহলে এটা চাওয়া কীভাবে ঘুরে গেল? আমরা প্রশ্ন তুলেছিলাম, আপনারা ’৭১ সালের এপ্রিলে যে বিবৃতি দিলেন, কোন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দিলেন? আপনারা আলবদর বাহিনী গঠন করলেন, এটা কোথায় করলেন, কে এই সিদ্ধান্ত নিলেন? এসব জামায়াত পছন্দ করেনি। জামায়াত ভুল করেছে। জামায়াত নাম-ই থাকা উচিত ছিল না।’

ওই সময়ে সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন ফরীদ আহমদ রেজা। বর্তমানে তিনি লন্ডনে প্রবাস জীবনযাপন করছেন। ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ তিনি গণমাধ্যমে বলেছিলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এবং আলেম সমাজের বিরোধিতাকেও বিবেচনায় নিতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর উজ্জ্বল ভবিষ্যত আছে বলে মনে করার কোন কারণ দৃশ্যমান নয়। ২০১৬ সালে জামায়াতে সংস্কারের প্রস্তাব এনেছিলেন প্রয়াত নেতা, রাজশাহী মহানগর আমির আতাউর রহমান। ওই বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি আতাউর রহমানকে কেন্দ্রীয় নায়েবে আমিরের পদ থেকে অব্যাহতির সিদ্ধান্ত হয়।

জামায়াত জাতির কাছে ক্ষমা চাইলে তাদের পুনর্মূল্যায়ন ভেবে দেখা হবে -কাদের ॥ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতে ইসলামী যদি জাতির কাছে ক্ষমা চায় তাহলে তাদের পুনর্মূল্যায়ন করা হবে কি না সে বিষয়টি ভেবে দেখবেন তারা। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকার জন্য দেশের মানুষের কাছে ‘ক্ষমা না চাওয়ার’ কারণ দেখিয়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে পদত্যাগ করেছেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক।

শুক্রবার তার পদত্যাগের খবর প্রকাশের পরপরই ধানম-িতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আমি আবার এটাও দেখেছি কোন কোন মিডিয়ায়, জামায়াতের নবীন-প্রবীণের দ্বন্দ্বটা খুবই স্পষ্ট। যারা প্রবীণ তারা তাদের পুরনো নীতি-কৌশল-আদর্শ সেটা আঁকড়ে থাকতেই অটল।

নতুনরা চেঞ্জ চাচ্ছে। এটাকে কেন্দ্র করে জামায়াত সিদ্ধান্তহীনতায় আছে। তারা এখনো কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। তবে সেটা তাদের ইন্টারনাল ম্যাটার, তারা কী সিদ্ধান্ত নেবে। আদালতের আদেশের পর নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিল করে দিলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ কোন ভোটে অংশ নেয়ার সুযোগ হারালেও দল হিসেবে সক্রিয় রয়েছে জামায়াত।

একাদশ নির্বাচনে জামায়াতের ২৫ জন নেতা স্বতন্ত্রভাবে ও ধানের শীষ প্রতীকে ভোটে অংশ নেয়। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা জামায়াতের নাম বদল করে নতুভাবে রাজনীতিতে আসার জন্য দলের একাংশ প্রস্তাব করেছে বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। তারা নতুনভাবে রাজনীতিতে এলে আওয়ামী লীগের অবস্থান কী হবে- প্রশ্ন করা হলে ওবায়দুল কাদের বলেন, আওয়ামী লীগ স্বাগত জানাবে কি জানাবে না সেটা তো এখানে কোন বিষয় নয়।

‘তারা অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চাইবে কি না? তারা ক্ষমাপ্রার্থী কি না? তারা ক্ষমাটা আগে চাক। তারপর বলব। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতকে নিয়ে কাদের বলেন, “তারা ক্ষমা চাওয়ার পরেই এ ব্যাপারে আমাদের মূল্যায়নটা, আমাদের বিশ্লেষণ নিয়ে, আমাদের রি-এ্যাকশনটা আমরা প্রকাশ করতে পারি।

একাত্তরে যুদ্ধাপরাধে দ-িতদের দল জামায়াতকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছে গণজাগরণ মঞ্চ, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়েও জামায়াতকে ‘ক্রিমিনাল’ সংগঠন বলা হয়েছিল। গোলাম আযমসহ দলটির শীর্ষনেতাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার রায় পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ‘ক্রিমিনাল দল’ জামায়াত একাত্তরে তাদের ভূমিকার জন্য কখনও ক্ষমা চায়নি। আর আদালতে মামলা থাকার কারণে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামীকে সরকার নিষিদ্ধ করতে পারছে না উল্লে করে ফেব্রুয়ারির শুরুতে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আশা প্রকাশ করে বলেন, নিবন্ধনের মতো আদালতের রায়েই জামায়াত নিষিদ্ধ হয়ে যাবে।

আওয়ামী লীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা শফী আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজ্জাকের পদত্যাগের বিষয়টি জামায়াতের ভিন্ন কৌশল হতে পারে। তারা যে আদর্শ ধারণ করে তা আজীবনের জন্য। ইচ্ছা করলেও কেউ আদর্শ পরিবর্তন করতে পারে না। তবে জামায়াতের রাজনীতির নতুন মিশন আস্তে আস্তে হয়তো পরিষ্কার হবে।