২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জনস্বাস্থ্যের জন্য ই-বর্জ্য একবিংশ শতাব্দীর বড় হুমকি

  জনস্বাস্থ্যের জন্য ই-বর্জ্য একবিংশ শতাব্দীর বড় হুমকি
  • ফেলে দেয়ার নির্দিষ্ট ডাস্টবিন নেই, নেই রিসাইক্লিং ব্যবস্থা

সমুদ্র হক ॥ একবিংশ শতকের অতি প্রয়োজনীয় পণ্য। অধিক ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে নষ্টও হচ্ছে তাড়াতাড়ি। নতুন পণ্যের সাশ্রয়ী দামের জন্য সেকেন্ডহ্যান্ড হিসেবে বিক্রি করাও যায় না। ফেলে দেয়া হয় রাস্তায়। কখনও বিক্রি হয় পরিত্যক্ত ও ভাঙ্গারি পণ্যের দোকানিদের কাছে। কেউ আবার বাসবাড়িতে গিয়ে কিনে নেয়। এসব পণ্য কখনও বছরের পর বছর পড়ে থাকে সারাইখানায়। এই পরিত্যক্ত বস্তুর নাম ‘ই-বর্জ্য (ইলেক্ট্রনিক্স ওয়েস্ট)। এর মধ্যে সেলফোন (মোবাইল ফোন) ও ট্যাব বেশি ফেলে দেয়া হয়। আছে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, বিদ্যুত সাশ্রয়ী বাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার কন্ডিশনার, ওভেন, টোস্টার ইত্যাদি।

ই-বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট কোন ডাস্টবিন ও ভাগাড় নেই। বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ ও সুধীজন বলছেন, এই বর্জ্য একবিংশ শতকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি ও সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

দেশে সেলফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা অন্তত ১৪ কোটি। এর মধ্যে আছে একাধিক সিম কার্ড (সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিটি মডিউল কার্ড)। এ জন্য অনেকেই ব্যবহার করেন একাধিক সেট। কেউ বেশি কথা বলার জন্য ব্যবহার করেন একটি সাধারণ মানের সেট। ইন্টারনেটের জন্য ভাল কোন এ্যান্ড্রয়েড বা আইফোন সেট ব্যবহার করেন, যা স্মার্টফোন। এই ফোনে নেট সংযোগ ছাড়াও স্থির ও ভিডিও চিত্রের ক্যামেরাসহ নানামুখী এ্যাপস (এ্যাপ্লিকেশন্স) আছে। মোবাইল সেট ব্যবসায়ী সমিতির এক তথ্যে জানা গেছে, প্রতিবছর সেলফোন আমদানি হচ্ছে অন্তত ৩ কোটি। এর বাইরে অবৈধ পথে আসছে ৫০ লাখেরও বেশি। সাধারণ মানের ফোনসেটগুলোর আয়ু বেশি নয়। স্মার্ট ফোনের (এ্যান্ড্রয়েড ও আইফোন) মধ্যেও ব্র্যান্ড কোম্পানি ছাড়া অন্যগুলো বেশিদিন টেকসই হচ্ছে না। এসব ফোন সেট একসময় ই-বর্জ্য হয়ে যায়। ফেলে দেয়া হয় ঘরের বাইরে, পথের ধারে। বিক্রি হয় ভাঙ্গারির দোকানে।

বিশ্বের নামী ব্রান্ডের প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে-দেশে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার ও অন্যান্য সামগ্রী রফতানি করে। একাধিক সূত্রে জানা যায়, এক ধরনের চতুর ব্যবসায়ী বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের ‘এ্যাক্সেসরিজ’ (খুচরা পার্টস) বাইরে থেকে কিনে এনে দেশে এ্যাসেম্বেল (একত্রীকরণ) করে কোন কোম্পানির নামে বিক্রি করে। কখনও মনগড়া নামও দেয়। ক্রেতারা সহজেই কম দামে এসব পণ্য কেনে। ওসব পণ্যের মডেল নম্বর দেখে ব্র্যান্ড কোম্পানির ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা যায় ওই মডেলের কোন পণ্য তাদের নেই। বিষয়টি সাধারণ ক্রেতার পক্ষে বোঝা খুব কঠিন। তারা এসব পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। কিছুদিন ব্যবহারের পর তা অকেজো হয়ে পড়ছে। মেরামতকারীর কাছে নিয়ে গেলে তারা যেমন তেমন করে সারিয়ে দিচ্ছেন। এগুলো একসময় ই-বর্জ্য হচ্ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, ই-বর্জ্যে থাকে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত ধাতু, নানা ধরনের রাসায়নিক যৌগ, সিসা, সিলিকন, টিন, রেজিন ফাইবার, ক্যাডমিয়াম, মার্কারি, ক্রোমিয়াম, নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদি। ই-বর্জ্যরে মধ্যে অনেক বিষাক্ত পদার্থ ও রাসায়নিক যৌগ আছে যা রোদে ও তাপে নানাভাবে বিক্রিয়া করে। অনেক সময় রোদে ফেলে দেয়া ইন্টিগ্রেটেড সার্কিট (আইসি) থেকে নির্গত হয় ক্ষতিকর বিকিরণ। ই-বর্জ্য পানিতে ফেললে কিংবা মাটিতে পুঁতে রাখার পরও বিষাক্ত থাবা বন্ধ থাকে না। ভয়ঙ্কর হয়ে বিক্রিয়া করে, যা মাটি মানুষ ও প্রকৃতির জন্য বিপজ্জনক। উন্নত দেশগুলো ই-বর্জ্যরে প্লাস্টিকের অংশটি আলাদা করে রিসাইক্লিং করছে। বাকি বর্জ্য বিশেষায়িত ভাগাড়ে ফেলে দিচ্ছে। উন্নত বিশ্বে কোন ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য সামান্য নষ্ট হলে বাড়ির বাইরে নিদিষ্ট স্থানে ফেলে রাখে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর লোকজন তা সংগ্রহ করে তাদের দেশে পাঠায়। এভাবেও উন্নত বিশ্বের ই-বর্জ্য কৌশলে পার হয়ে আসছে তৃতীয় বিশ্বে। কিছু ফেলা হচ্ছে মহাসাগরের। বাংলাদেশে ই-বর্জ্য ফেলে দেয়ার কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই। এ নিয়ে সরকারী-বেসরকারী কোন সংস্থার মাথাব্যথাও নেই।

ইলেক্ট্রনিক্স কিছু পণ্যে এক ধরনের রাসায়নিক ক্লোরোফ্লোরোকার্বন (সিএফসি) পাওয়া যাচ্ছে। শ্বাসকষ্ট নিরাময়ের ইনহেলারেও সিএফসি মিলছে। ওষুধসহ যে কোন পণ্যে সিএফসি ব্যবহার নিষেধ। পণ্যটি ই-বর্জ্যে পরিণত হলে পরোক্ষভাবেও এই সিএফসি কাজ করে। (এটা এক ধরনের গ্যাস)।

ইনভায়রনমেন্ট এ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) এক জরিপে বলা হয়েছে, ১১-১২ সালে ই-বর্জ্যরে পরিমাণ ছিল ৫১ লাখ মেট্রিক টন। পরের বছরেই তা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায় ১ কোটি ১০ লাখ টনে। বর্তমানে এই পরিমাণ অন্তত ১১ লাখ টন যার বেশিরভাগই আসছে মোবাইল ফোন ও ট্যাব থেকে।