১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিডনিতে ভালবাসার এক টুকরো বাংলাদেশ

  • অজয় দাশগুপ্ত

সিডনিতে বসবাস করি দুই দশককাল প্রায়। এ সময়কালে অনেক কিছু দেখলাম। কিভাবে আমাদের জাতিসত্তার মানুষ তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে এটা দেখার আনন্দ অতুলনীয়। এখন মেলা বা বড় অনুষ্ঠান মামুলি ব্যাপার। অনেকেই তা করেন। মানুষও কম হয় না। নয় নয় করে ষাট হাজার বাংলাদেশীর বাস এই শহরে। সেখানে মানুষ আসবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এখন আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হয়। মানুষ ঘরে বসেই বিনোদন পায়। দেশের টিভি চ্যানেল বা সামাজিক মিডিয়া মানুষকে সারা দিনমান ব্যস্ত রাখছে। যে কোন খবর পৌঁছে যায় নিমিষে। কাজেই বাঙালী সময় করে ভেবে-চিন্তে যায়। এখন তার কাছে সে সুযোগ আছে।

এখানকার সবচেয়ে বড় মেলা অলিম্পিক পার্কের বৈশাখী মেলা। শুধু এখানকার না বহির্বিশ্বের সবচেয়ে বড় আয়োজন। হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে তাতে। একটি স্কুলের ছোট পরিধি থেকে যেতে যেতে এখন তা অলিম্পিক পার্কের সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে হওয়া এই মেলা বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের আয়োজন। তাদের যোগ্য সভাপতি শেখ শামীমুল হকের নেতৃত্বে এর আয়তন ও বিস্তৃৃতি এখন আকাশচুম্বি। এই মেলাটির বাহিরে গিয়ে আরও যে বৈশাখী মেলা হয় তার পেছনে আন্তরিকতা আছে। তবে তার ব্যাপ্তি এখনও সীমাবদ্ধ। যাই হোক, বলছি আর একটি মেলার কথা। যেটির নাম ভালবাসার বাংলাদেশ মেলা।

এই মেলাটি আয়োজিত হচ্ছে মাত্র গত বছর থেকে। এই শহরে এখন আওয়ামী লীগারদের সংখ্যা অগুণিত। দল পাওয়ারে থাকলে সরকারে থাকলে এটাই স্বাভাবিক। যাদের হালুয়া রুটির ভাগে আনন্দ তারাও যথারীতি এসে জুটেছে। পুরনো ত্যাগী অথবা যারা আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে বিদেশে তাদের হয়ে হাল ধরত তারা এখন যুদ্ধক্লান্ত। কারণ, তাদের ভেতরেই বাস করছে অন্যেরা। আমি সবসময় মনে করি একমাত্র তারুণ্যই পারে এসব কিছু ঠেকিয়ে দেশ ও দেশের সম্মান বাঁচাতে। তাদের কাছে দল ও বিভক্তির চাইতে দেশ বড়। রাজনীতির চেয়ে বড় হোক আদর্শ এটাই আমাদের চাওয়া। চাইলেই কি আর তা হয়? সিডনি এখন মেলা সংস্কৃতিতে জমজমাট বটে। আর এই মেলাটির পেছনে আছে আমার প্রিয়ভাজন এক তরুণ। বয়সে এখনও নবীন। তবে তার কর্মস্পৃহা আমাকে আন্দোলিত করে। রাজনীতি করা যুবকটি যে সবসময় সব কাজ ভাল করে বা করতে পারে এমন না। বিদেশে দেশের দলের এমন কর্মকা- থাকা না থাকা সমান। কারণ, এখানে আমরা নৌকা, ধানের শীষে ভোট দেই না। এখানে আমরা যানজট দেখি না। এখানে আমরা দুর্নীতি বা কলুষতাও পাই কম। তাই এমন সব কাজ করা দরকার যা সরাসরি রাজনীতির বাইরে বাংলাদেশকে বাইরের জগতে বড় করবে। দেশের কথা বলতে হবে দেশে। এখানে বাংলা সংস্কৃতি আর শুদ্ধ ধারার গতি বজায় রাখার কাজ ছাড়া বাকিগুলো বিতর্কের বাইরে যেতে পারবে না। নোমান শামীম এই মেলাটির ভেতর দিয়ে সে চেষ্টা করছে। যাতে বাংলা সংস্কৃতি ও দেশজ ভাবনা বার বার বেরিয়ে আসে। শনিবার মেলায় দেখলাম ছোট ছোট বাচ্চারা কি দারুণ বাংলা গান গাইল। কী দারুণ তাদের নাচ আর বাংলাদেশ বোধ। এমন জিনিস এখন বিশ্বের দেশে দেশে হয়। আমাদের দেশ অপরিচিত কিছু না। বরং মান সম্মানে তার জায়গা বড় করে তুলেছে বাংলাদেশের মানুষ। এখন আমরা শেখ হাসিনার কারণে আরও বেশি শক্তিশালী। তাঁর নেতৃত্বে আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা দেশের মান ও গৌরব নিয়ে গেছে ভিন্ন উচ্চতায়। সেখানে আমাদের দায়িত্ব বেশি। কারণ, সব দেশের একেক ধরনের ইমেজ আছে। ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলো তাদের সুর আর গানের জন্য খ্যাত। ইউরোপ সভ্যতার জন্য। ভারতীয়দের মানুষ সম্মান করে মেধার কারণে। জাপানীরা সমাদৃত ব্যবহারের জন্য। আমাদের এখন সময় একটা নতুন ইমেজ তৈরির। যারা দেশ শাসনের নামে দেশের ভাবমূর্তিকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছিল তারা এখন দৃশ্যের বাইরে। বাংলাদেশের সামনে সুবর্ণ সুযোগ নিজেদের সঠিক ইমেজ তৈরির। সে সুযোগ কাজে লাগালে অচিরে আমরা একটি আদর্শ সমাজ আর বলিষ্ঠ জাতি পাব। তা না হলে রাজনীতির কদর্যতায় আবার ডুবে যাবে দেশ ও মানুষ।

নোমান শামীমের মেলা মানে ভালবাসার বাংলাদেশ মেলা সবে পা ফেলছে। উপস্থাপক বয়সী বাঙালী অথচ ভাল শুদ্ধ উচ্চারণে বাংলা বলেন না। এই অভিযোগ করলেন বেশ কিছু দর্শক। এগুলো তাদের ভাবতে হবে। ভাবতে হবে আরও কয়েক বিষয়। মানুষ বিনোদন আর উৎসব করতে আসেন। তাদের কেন জোর করে কবিতা শোনাতে হবে? এই কাজটি না করলেও চলে। এর জন্য আরও অনেক মঞ্চ আছে। বরং আমি মনে করি এসব জায়গায় তরুণ-তরুণীরা মন খুলে তাদের কথা বলুক। এমন একটা আয়োজন থাকতেই পারে যেখানে কিশোর-কিশোরী থেকে তরুণ-তরুণীরা বলবে তারা কি চায় কেন চায়? তারা দেশ ও সংস্কৃতি নিয়ে কি ভাবে? তাদের ভাবনার সঙ্গে মূলধারার যোগ কতটা। তাদের আমাদের মতো করে ভাবতে বাধ্য করার দরকার নেই। মুক্তিযুদ্ধ কিংবা ইতিহাস এখরও পুরোটা ধরা হয়নি। ধরা যায়নি। তাদের শুধু সে সূত্রটা ধরিয়ে দেয়া আমাদের কাজ। বাকিটা তারাই করে নেবে।

আমার ধারণা বাংলাদেশের নবীন প্রজন্ম এমনকি দেশের বাইরে জন্ম নেয়া প্রজন্মও তা জানে এবং করতে পারবে। কারণ, আমাদের সমাজে যত ধরনের অসুবিধা বা সমস্যা থাকুক মূলত আমরা দেশপ্রেমিক। ছোট দেশের বড় সাহস ইতিহাসেই লেখা আছে। সে সাহস আর প্রজ্ঞাই আমাদের শক্তি। মেলাটি দেখে আসার পর যে আনন্দময় অনুভূতি হয়েছে তার পূর্ণতা দেখতে চাই আগামীতে। কাটছাঁট আয়োজন ব্যাপক ও নির্মল বিনোদনই টেনে আনবে মানুষের স্রোত। যা অলিম্পিক পার্কের বৈশাখী মেলায় আছে। সেটা অনুকরণ যোগ্যও বটে। আনন্দ আমাদের বেশি সয় না। ফিরে এসে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনার খবর শুনে স্তম্ভিত হয়েছি। আগেই জানতাম বিস্তারিত জানার পর মনে হলো এমনও হয়? হতে পারে? বলার ইচ্ছে থাকল এ বিষয়ে।