২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আমিরাতের সঙ্গে চার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর

আমিরাতের সঙ্গে চার সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর
  • প্রধানমন্ত্রীর ইউএই সফরে বিনিয়োগের নতুন দ্বার উন্মোচন

বিডিনিউজ ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আবুধাবি সফরে বাংলাদেশের বিদ্যুত, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক অঞ্চল নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চারটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে বড় ধরনের বিনিয়োগের আশা করছে সরকার।

রবিবার স্থানীয় সময় বিকেলে আবুধাবির সেন্ট রেগিজ হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এসব সমঝোতা স্মারক সই হয়। পররাষ্ট্র সচিব সাংবাদিকদের বলেন, আমার মনে হচ্ছে যে, এটার ভেতর দিয়ে বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে ব্যবসার একটা নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, যেটা আমরা আগে কখনও দেখিনি।

জার্মানি সফর শেষে রবিবার সকালে মিউনিখ থেকে আবুধাবি পৌঁছেন শেখ হাসিনা। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। এরপর সকালে আবুধাবিতে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী ও নেভাল ডিফেন্স এ্যান্ড মেরিটাইম সিকিউরিটি প্রদর্শনীতে অংশ নেন শেখ হাসিনা। দুপুরের পর ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।

যেসব সমঝোতা ॥ গবর্নমেন্ট অব দুবাইয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারী-বেসরকারী অংশীদারিত্ব (পিপিপি) চুক্তি। এতে সই করেছেন নৌ পরিবহন সচিব এম আব্দুস সামাদ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েম। পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক বলেন, এটার মূল ফোকাস হলো পোর্ট ও শিল্প পার্ক। কারণ ডিপি ওয়ার্ল্ড বলছে, তারা যেখানে পোর্ট তৈরি করে তারা সেখানে পোর্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, শিল্প পার্কও তৈরি করে। এখানে একটা ম্যাসিভ বিনিয়োগের কথা তারা চিন্তা করছে। প্রধানমন্ত্রী তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান পররাষ্ট্র সচিব। আরেকটা সমঝোতা হয়েছে বাংলাদেশের বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির। এতে সই করেছেন বিদ্যুত, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং এমিরেটস ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির গ্রুপ সিইও সাইফ আল ফালাসি। শহীদুল হক বলেন, এটার মেইন ফোকাস হলো- বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি সরবরাহ। পায়রাতে ভূমিভিত্তিক এলএনজি রিসিভং সেন্টার করা। পায়রাতে তারা ৩০০ একর জমি চেয়েছেন, যেখানে এটা করবেন। সুতরাং আমরা দেখছি, এলএনজির একটা বড় বিনিয়োগ বাংলাদেশে যাবে এবং এটা পায়রাতে। তৃতীয় সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে আমিরাতের রাজপরিবারের সদস্য ও বিনিয়োগকারী শেখ আহমেদ ডালমুখ আল মাখতুম এবং পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদের মধ্যে। এর আওতায় দুই ধাপে ৮০০ থেকে ১০০০ মেগাওয়াটের এলএনজি বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণ এবং ১০০ মেগাওয়াটের আরেকটি সৌর বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। চতুর্থ চুক্তি হয়েছে মাতারবাড়িতে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে। এটাতেও সই করেছেন শেখ আহমেদ ডালমুখ আল মাখতুম ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান। শহীদুল হক বলেন, মাতারবাড়িতে তারা ৩০০ একর জমি চেয়েছে।

আমিরাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক ॥ রবিবার বিকেলে আমিরাতের মন্ত্রী, বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, আজকের বিকেলটাই কেটেছে বিনিয়োগ সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে। আমরা যেটা ফিল করেছি যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কিন্তু অফিসিয়ালি বেশ কয়েকবার ইউএইতে এসেছেন, এখান থেকে গেছেন। কিন্তু এই ধরনের আগ্রহ এর আগে তাদের মধ্যে আমরা লক্ষ করিনি। বৈঠকে আমিরাতের অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রী সুলতান বিন সাইদ আল মনসুরি উপস্থিত ছিলেন। সচিব বলেন, একটা নতুন ধরনের অর্থনৈতিক পার্টনারশিপের ওপর ইকোনমিক মিনিস্টার গুরুত্বারোপ করছিলেন। উনারা বললেন, বাংলাদেশে উনারা নতুনভাবে ব্যবসা বাড়াতে চান। বিশেষ করে বিনিয়োগ করতে চান। সেটার মূলে দেখা যাচ্ছে বিদ্যুত-জ্বালানি, বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী উনাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইউএইর মধ্যে যৌথ ব্যবসা ফোরাম ও যৌথ অর্থনৈতিক কমিশন করার বিষয়েও আলোচনা হয়। আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ ইমরান সাংবাদিকদের বলেন, এতদিন কিন্তু আমরা চাচ্ছিলাম তাদের কাছে এগিয়ে এগিয়ে কিছু করার। তারা এখন এগিয়ে আসছে মনে হচ্ছে। যে কয়টা চুক্তি হয়েছে তার সবগুলোতেই তাদের দিক থেকে প্রচণ্ড আগ্রহ দেখেছি। তারা এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহেমদ ও প্রেস সচিব ইহসানুল করিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

চতুর্দশ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে প্রধানমন্ত্রী ॥ সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবিতে চতুর্দশ আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে (আইডিইএক্স-২০১৯) অংশ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জার্মানির মিউনিখ থেকে শনিবার রাতে ইতিহাদ এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে রওনা হয়ে স্থানীয় সময় রোববার সকাল সাড়ে ৬টায় আবুধাবি পৌঁছেন প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীরা।

এরপর আবুধাবি ন্যাশনাল এক্সিবিশন সেন্টারে প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে যান শেখ হাসিনা। আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এবং আমিরাত অব দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মাদ বিন রশিদ আল মাকতুমের আমন্ত্রণে তিনি প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। আবুধাবি ন্যাশনাল এক্সিবিশন সেন্টারে পৌঁছলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান। আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীর পাশাপাশি আবুধাবিতে নেভাল ডিফেন্স এ্যান্ড মেরিটাইম সিকিউরিটি এক্সিবিশনও আয়োজন করা হয়েছে। এই এক্সিবিশনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর বিএনএস ধলেশ্বরী অংশ নিয়েছে। প্রদর্শনীতে আমিরাতের প্রধানমন্ত্রীর পাশেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বসানো হয়। এই সমারিক প্রদর্শনীতে অংশ নেয়া ছাড়াও আরব আমিরাত সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া আবুধাবির সেন্ট রেগিস হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশীদের এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেও যোগ দেবেন তিনি। জার্মানি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছয় দিনের সফরে বৃহস্পতিবার দুপুরে মিউনিখে পৌঁছেন শেখ হাসিনা। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর এটাই শেখ হাসিনার প্রথম বিদেশ সফর। বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ ছয় শতাধিক নীতি-নির্ধারক, চিন্তাবিদ, ব্যবসায়ীসহ সমাজের অগ্রগামী শ্রেণীর প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে শুক্রবার ৫৫তম মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন শেখ হাসিনা। শুক্রবার সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিস এ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ এবং ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন আয়োজিত ‘হেলথ ইন ক্রাইসিস-হু কেয়ার্স’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সম্মেলনে অংশগ্রহণের মাঝে ২০১৭ সালের নোবেলবিজয়ী সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু এ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস-আইসিএএনের নির্বাহী পরিচালক বিয়াত্রিস ফিন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রসিকিউটর ফাতোও বেনসুদা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন। পাশাপাশি সিমেন্স এজির প্রেসিডেন্ট ও সিইও জোয়ে কাইজার এবং ভেরিডোস জিএমবিএইচের প্রধান নির্বাহী হ্যান্স উল্ফগাং কুনজও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ভেরিডোস জিএমবিএইচ বাংলাদেশে ই-পাসপোর্ট বাস্তবায়ন করছে। শনিবার সিমেন্সের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ওই বৈঠকের পর পটুয়াখালীর পায়রাতে ৩৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এলএনজিভিত্তিক একটি বিদ্যুতকেন্দ্র নির্মাণে জার্মান কোম্পানিটির সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি সই হয়। সফর শেষে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ফিরবেন শেখ হাসিনা।