২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছি! ছি! এত্তা জঞ্জাল! ॥ পরিচ্ছন্ন রাখুন

ছি! ছি! এত্তা জঞ্জাল! ॥ পরিচ্ছন্ন রাখুন

রাজন ভট্টাচার্য ॥ রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপা-তালের সামনের সড়কটির অর্ধেক অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এই জায়গাটিতে রাখা হয়েছে, ইট, বালু, রডসহ নানা ধরনের নির্মাণ সামগ্রী! সরকারী একটি আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য এসব সামগ্রী দিনের পর দিন রাস্তার রাখা হচ্ছে। ফলে গাড়ি ও পথচারী চলাচলে বাধার সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নির্মাণ কাজে নিয়োজিতরা জানিয়েছেন, নির্মাণ সামগ্রী রাখার জন্য পৃথক কোন জায়গার ব্যবস্থা করা হয়নি। তাই রাস্তায় রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। মগবাজার থেকে বাংলামোটর পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার সড়কে রয়েছে আরও নানা ধরনের জঞ্জাল। অপরটি হল ফুটপাথ ঘেষে রাখা হয়েছে সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিন। ময়লার গন্ধে বিপর্যস্ত হাসপাতাল এলাকার পরিবেশ। চলাচলেও সৃষ্টি হয় সমস্যা। তাছাড়া রাস্তার ওপর ঝুলে থাকতে দেখা যায় ডিশের তারও। যারা নিয়মিত এই সড়কটি ব্যবহার করেন তাদের প্রত্যেকেরই এসব সমস্যা মোকাবেলা করে চলার অভ্যাস হয়ে গেছে।

বাংলামোটর থেকে মগবাজার যেতে অন্তত রাস্তার ওপর তিনটি স্থানে ইট ও বালু রাখতে দেখা যায়। সড়কের এই অংশের বেশিরভাগ ফুটপাথ গাড়ির পার্টস ব্যবসায়ী ও মোটরসাইকেল ব্যবসায়ীদের দখলে। স্থানীয় ব্যবসায়ী কাদির জানালেন, যুগের পর যুগ ধরে আমরা এই এলাকায় এভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। শো-রুম ছোট হওয়ার কারণে মোটরসাইকেল ফুটপাথজুড়ে রাখতে হয়। আবার পার্টস ব্যবসায়ীদের সমস্যাও একই। তাদের শো-রুমে জায়গা স্বল্পতার কারণে রাস্তায় গাড়ি মেরামত করেন। সরেজমিন এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও ফুটপাথ অথবা রাস্তায় গাড়ি রেখে মেরামত করাতে দেখা গেছে। মগবাজারসহ আশপাশের এলাকায় দেখা গেছে ডিশের তারের জঞ্জাল। ফুটপাথ দিয়ে হাঁটলে তার গায়ে লাগে।

কাকরাইল মোড় থেকে মালিবাগ মোড়ে আসতে সড়কের দুপাশে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। এই সড়কের বেশিরভাগ অংশে ফুটপাথ দখল করে চা স্টল বসানো হয়েছে। আছে ভাসমান হকারদের দৌরাতœ্য। সড়কে গাড়ি মেরামত, এস এ পরিবহনের কুরিয়ার সার্ভিসের গাড়িও দেখা যায় রাস্তায়। মতিঝিল পাটকল কর্পোরেশনের রাস্তার ফুটপাথে সারিবদ্ধ করে রাখা আছে হকারদের চৌকি। সুযোগ পেলেই এসব চৌকি বিছিয়ে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজানো হয় ফুটপাথের ওপর। গোটা পুরনো ঢাকার চিত্র আরও খারাপ।

ঢাকা শহরে ঘর থেকে বাইরে পা ফেললেই শত জঞ্জাল। কোথাও মাটিতে পড়ে আছে তার। কোথাও ঝুলছে। রাস্তায় নির্মাণ সামগ্রী রেখে প্রতিবন্ধকতার চিত্র না দেখার কেউ নেই। ফুটপাথ দখল, হকারদের দৌরাতœ্য, ভাসমান স্টল, গাড়ি পার্কিং, মেরামত কারখানা, ফার্নিচারের দোকান, রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, ডাস্টবিন, অবৈধ পার্কিং সবই ঢাকার মানুষের জন্য নিত্য দিনের জঞ্জালে রূপ নিয়েছে। গোটা শহরজুড়েই এরকম চিত্র দেখা যায়। অথচ একটু সদিচ্ছা থাকলেই অনেক সমস্যা সমাধান সম্ভব যা সাধারণ মানুষেরও ধারণা। কিন্তু দিনের পর দিন জঞ্জাল থাকছে। এ নিয়ে আছে সমালোচনা। আছে আইনও। কিন্তু সঙ্কটের সমাধান মিলছে না। যেসব সঙ্কট আছে, এর বেশিরভাগই ছোটখাট ও সাধারণ। সমাধান না হওয়ায় একদিকে শহর যেমন অপরিচ্ছন্ন থাকছে তেমনি উন্নয়নের সূচকে দেশ এগিয়ে থাকলেও পরিচ্ছন্নতায় পিছিয়ে থাকতে হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অপরিচ্ছন্ন ও জঞ্জালের নগরীর তালিকায় বারবার স্থান পাচ্ছে ঢাকার নাম। তবে সকল সচেতন মানুষের এক কথাই... ছি ছি নগরজুড়ে এত জঞ্জাল কেন।

অব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকা থেকে তারের জঞ্জাল অপসারণ করা যায়নি। অধিকাংশ সড়কে মাথার ওপর তাকালেই চোখে পড়ে অযতেœ জটা ধরা চুলের মতো দলা পাকানো ইন্টারনেট, ডিশ, টেলিফোন ও বিদ্যুত সঞ্চালনের তার। এসব জঞ্জালের ভারে অনেক এলাকায় নুয়ে পড়েছে সড়ক বাতির বিদ্যুতের খুঁটিও। এতে কেবল নগরীর সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, পথচারীদের চলাচলেও বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। ঝুলন্ত তার ছিঁড়ে রাস্তায় পড়ে ঘটছে দুর্ঘটনাও।

পুরান ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার উপর বিপজ্জনকভাবে ঝুলে আছে বৈদ্যুতিক, ইন্টারনেট ও ডিশের ক্যাবল। জনবহুল রাস্তার মাঝেই খোলা পড়ে আছে জোড়াতালির বিদ্যুত সংযোগ, ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। ২০০৯ সাল থেকেই সরকার রাজধানীতে ঝুলে থাকা বিদ্যুত, ডিশ ক্যাবল, ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি), মোবাইল কোম্পানি, বিটিসিএলের ল্যান্ড ফোনের তারসহ সব ধরনের তারকে বিশ্বের অনেক আধুনিক শহরের মতো মাটির নিচ দিয়ে স্থাপনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ লক্ষ্যে ন্যাশনওয়াইড টেলিকমিউনিকেশন ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) প্রকল্পের আওতায় দুটি প্রতিষ্ঠান ফাইবার এ্যাট হোম এবং সামিট কমিউনিকেশনকে মাটির নিচ দিয়ে তার পরিচালনার জন্য অবকাঠামো স্থাপনের লাইসেন্স দেয়া হয়।

পরে ২০১৪ সালের মধ্যেই বিদ্যুতের খুঁটি থেকে এসব ঝুলন্ত তার অপসারণ করার সময়সীমা বেধে দেয়া হয়। সরকারী সংস্থাগুলোর কিছু তার মাটির নিচে চলে গেলেও বেশির ভাগ ডিশ অপারেটর আর ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের তার এখনও মাটির ওপরেই রয়ে গেছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা সড়কবাতির খুঁটির সঙ্গে পেঁচিয়ে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক আকার ধারণ করেছে। রাস্তায় ঝুলে থেকে এসব তার যেমন দুর্ঘটনার কারণ তেমনি এগুলো শহরের সৌন্দর্য হানিও করছে।

বিটিআরসি তথ্য অনুযায়ী সরকারী আদেশের পর চার বছরে মাত্র ২০-৩০ শতাংশ ঝুলন্ত তার ভূগর্ভে স্থানান্তরিত হয়েছে। বাকি ৮০-৭০ শতাংশ এখনও রাস্তায় ঝুলছে। ভিআইপি সড়কে ওই সময়ে এই তারের জঞ্জাল অপসারণের জন্য অভিযান চালানো হয় এবং অনেক ডিশ ও ইন্টারনেট ক্যাবল অপারেটরের তার বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়। এই অভিযানের মোড় আবার অন্যদিকে চলে যায়, ডিস ও ইন্টারনেট ক্যাবল অপারেটর মূল সড়ক দিয়ে তার না নিয়ে এলাকার ভেতর দিয়ে তার টানা শুরু করে।

স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের মতে ঢাকায় প্রায় ১ হাজার ৭০০ কিলোমিটার ক্যাবল ভূগর্ভে স্থাপিত হয়েছে এবং বাকি ৫ হাজার ১০০ কিলোমিটার এখনও রাস্তার ওপরে ঝুলছে। যদি ভূগর্ভে স্থাপিত সমান দৈর্ঘ্যরে ৬ মিলিমিটার ডায়ামিটারের একটি অপটিক্যাল ফাইবার তার রাস্তায় ঝুলে থাকে তবে তার ওজন হয় ৬৯ হাজার ৭০০ কেজি। এরকম প্রায় ১০০টি তার যদি রাস্তার ওপরে ঝুলে থাকে তবে মোট ওজন হয় ৬ লাখ ৯৭ হাজার কেজি। বতর্মানে রাস্তার ওপরে রয়েছে প্রায় ৫ হাজার ১০০ কিলোমিটার তার। ১০০টি করে অপটিক্যাল ফাইবার তার ঝুলে থাকলে বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলো বতর্মানে প্রায় ২ কোটি ৯১ হাজার কেজি ওজন বহন করে শহরের বুকে দাঁড়িয়ে আছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুযায়ী রাস্তাঘাটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে নির্মাণ কাজ করলে জেল-জরিমানা উভয়ের বিধান রয়েছে। তাছাড়া বাড়িঘর নির্মাণের সময় রাস্তাঘাটে নির্মাণ সামগ্রী রাখার বিষয়ে সিটি কর্পোরেশন থেকে সাময়িক অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু কেউ এ নিয়ম মানছে না।

তারের জঞ্জাল সরাতে তিন মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং কমিটি ॥ ঢাকা শহরের সব সেবার ঝুলন্ত তার ‘পর্যায়ক্রমে’ ভূ-গর্ভস্থ বিতরণ লাইনের আওতায় নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। মঙ্গলবার সংসদে সরকারী দলের এ কে এম রহমতুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী একথা বলেন।

তিনি বলেন, ঢাকা শহরের রাস্তার পাশে বিভিন্ন সেবা সংস্থার ঝুলন্ত তার সরিয়ে ভূ-গর্ভে পাঠানোর জন্য বিদ্যুত ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় এবং টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে একটি ‘মনিটরিং কমিটি’ করা হয়েছে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির প্রতিনিধিরাও রয়েছেন এই কমিটিতে। ‘ইতোমধ্যে এই কমিটির মাধ্যমে ঢাকা শহরের প্রধান প্রধান সড়কের ঝুলন্ত তার অপসারণ করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সব ঝুলন্ত তার ভূ-গর্ভে যাবে। ক্যাবল টিভি, ইন্টারনেট সার্ভিস, টেলিফোন লাইন আর বিদ্যুতের লাইন মিলিয়ে ঢাকার প্রায় সব রাস্তার পাশেই মাথার ওপর তারের জঞ্জাল।

উচ্চমাত্রার বিদ্যুত পরিবাহী তারের সঙ্গে ইন্টারনেট, টেলিফোন ও ক্যাবল টিভি নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা সংস্থার এইসব তার অপসারণে আদালতের নির্দেশ থাকলেও তা মানছে না কোন সংস্থা। ২০০৯ সালে রাজধানীকে তারের জঞ্জাল থেকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। শাহবাগ থেকে উত্তরা পর্যন্ত সড়কের পাশে বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে অন্য সব সেবার তার সরানোর কাজও তখনই শুরু হয়েছিল। তবে গত এক দশকে তারের বোঝা কমেছে সামান্যই।

কত জঞ্জাল ॥ সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকাঘুরে জঞ্জালের নানা চিত্র চোখে পরে। এরমধ্যে মোহাম্মদপুর টাউনহল মার্কেটের বিপরীত পাশে গ্রীন হেরাল্ড ইন্টারন্যালনাল স্কুলের সীমানা দেয়াল থেকে জাকির হোসেন রোডের শেষ মাথা পর্যন্ত ফুটপাথ কার্যত দখল। ফুটপাথে মোটরসাইকেলের ধোঁয়া ও সারানোর কাজ চলছে সবসময়। একারণে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সুযোগ নেই। ‘পরিচয়’ হোন্ডা ওয়ার্কশপের সামনের ফুটপাথে দেখা গেছে, সারিসারি মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য রাখা আছে। মেরামত শেষে পরীক্ষামূলক চালু করা হচ্ছে গাড়ি। মেরামতের জন্য বাম্পারসহ যন্ত্রপাতিও ফুটপাথে।

পঙ্গু হাসপাতালের সামনের রাস্তায় যাত্রী ছাউনিটি যাত্রীদের ব্যবহারের আর সুযোগ নেই। পুরো ছাউনিটি হকাররা দিনভর নানা পণ্য সাজিয়ে রাখে। নিউ ইস্কাটন এলাকার ওয়াকফ ভবনের সামনের রাস্তার ফুটপাথটি ব্যবহারের অনুপযোগী অনেক আগে থেকেই। একদিনে বেশ কয়েকটি ডাস্টবিন আর ফুটপাথ দখল করে চায়ের সারিসারি স্টল বসানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকার ফুটপাথজুড়ে হকারের দাপট। গোটা গুলিস্তানজুড়ে এই সমস্যা দিনের পর দিন বাড়ছে। পরিবাগের রাস্তায় দেখা গেছে ইটের খোয়া রাখা আছে। বাংলামোটর এলাকায় বিদ্যুতের খুটিতে আছে তারের জঞ্জাল। রাস্তায় মানুষের গায়ে লাগছে ঝুঁকিপূর্ণ তার। কাওরান বাজারে স্টার কাবাবের সামনের ফুটপাথে এখন আর শান্তিতে হেটে চলার সুযোগ নেই। সরকারী ও ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার ফুটপাথজুড়ে পার্কিং করে রাখা হয়। সোমবার দুপুরেও এই চিত্র লক্ষ করা গেছে। তেজগাঁও শিল্প এলাকায় রয়েছে জঞ্জালের এরকম নানা দৃশ্য।

মোহাম্মদপুরের বছিলা এলাকার দৃশ্য আরও ভিন্ন। এই সড়কে রাস্তার ওপর ড্রেন দখল করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ক্লাব বানানো হয়েছে। ছোট ছোট টং দোকান করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা হচ্ছে দিনের পর দিন। এই জঞ্জালের কারণে পথচারীদের সমস্যার কথা কেউ ভাবে না।