০৬ ডিসেম্বর ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আত্মসমর্পণ

বিস্তর জল্পনা-কল্পনার পর অবশেষে ১০২ ইয়াবা ব্যবসায়ী ও চোরাচালানির আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হলো ইয়াবার সমাপনী অধ্যায়ের। অবশ্য এর মাধ্যমে দেশে ইয়াবা ব্যবসা ও আসক্তির চির সমাপ্তি ঘটবে কিনা বলা মুশকিল। কেননা, জনকণ্ঠের প্রতিবেদনেই প্রকাশ, তালিকাভুক্ত ১০৪৯ জন ইয়াবা কারবারি ও চোরাচালানি নাকি এখনও রয়েছে আত্মগোপনে। যা হোক, প্রথম পর্যায়ে ১০২ জনইবা কম কি! যাদের মধ্যে রয়েছে ২৯ শীর্ষসহ ছোট-বড় ইয়াবা চোরাচালানি, ব্যবসায়ী ও হুন্ডির কারবারি। অস্ত্রশস্ত্রসহ ইয়াবা বড়ির সংখ্যাও কম নয়, যার মধ্যে রয়েছে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭০ রাউন্ড গুলি এবং সাড়ে তিন লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট। অপরাধ স্বীকার করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার শর্তে তারা আত্মসমর্পণ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে। লোকে লোকারণ্য অনুষ্ঠানস্থলে আইজিপি, র‌্যাবের প্রধানসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদস্থ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। তবে আত্মসমর্পণ একেবারে নিঃশর্ত ও সাধারণ ক্ষমার আওতায় হয়নি। বরং ৭টি শর্তে আত্মসমর্পণ করে ইয়াবা চোরাচালানি ও কারবারিরা। ফলে সবারই ঠাঁই হয়েছে জেল হাজতে। বাড়িঘরে পড়েছে তালা। অতঃপর মাদক ও অস্ত্র আইনে প্রচলিত আদালতে মামলা-মোকদ্দমা যথারীতি চলবে এবং তদনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তদুপরি ইয়াবা ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের অর্জিত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, তা সে নামে-বেনামে, স্ত্রী বা আত্মীয়স্বজনের নামেই হোক সকল সম্পদ দুর্নীতি দমন কমিশন ও সিআইডির মানি লন্ডারিং শাখা এবং এনবিআরের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। উল্লেখ্য, আত্মসমর্পণের জন্য ইতোপূর্বে প্রধানমন্ত্রীর সদয় সম্মতির পরই এই অগ্রগতি। মাদকের প্রতি সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় সারাদেশে গত তিন মাসে প্রায় তিনশ’ ইয়াবা ব্যবসায়ীর নিহত হওয়ার পরও বাস্তবে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়ায় বিকল্প হিসেবে আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে এই সুযোগে যেন কেউ ছাড় না পায় এবং বিকল্প হিসেবে ভেজাল ইয়াবা বা ফেনসিডিল দেশে না ঢোকে তা নিশ্চিত করতে হবে বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। তদুপরি ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।

সরকার ইয়াবাসহ যে কোন ধরনের মাদকদ্রব্য আমদানি-রফতানি ও ব্যবহারের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে। মাদক নির্মূলে সারাদেশে চলছে সাঁড়াশি অভিযান। এক্ষেত্রে শুধু জেল-জরিমানাই নয়, ক্রসফায়ারে তিন শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর খবরও আছে। দুঃখজনক হলো, এরপরও মাদক আমদানি ও ব্যবহারের ব্যাপকতা কমছে না। এতে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশকে টার্গেট করেই কোন আন্তর্জাতিক শক্তিশালী চক্র কাজটি করে যাচ্ছে, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে মরিয়া। এর পেছনে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের হাত থাকাও বিচিত্র নয়। যে কোন মূল্যে এই ‘বিষচক্র’ ভাংতে হবে। সে অবস্থায় মিয়ানমার সীমান্ত একেবারে ‘সিল্ড’ করে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

দেশের অভ্যন্তরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক ইয়াবা ট্যাবলেট এবং এর কাঁচামাল প্রবেশ করে থাকে কক্সবাজার জেলার মাধ্যমে। আরও সঠিক অর্থে মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তপথে। পার্বত্য অঞ্চল দিয়েও ইয়াবার অনুপ্রবেশ বিচিত্র নয়। সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ স্থানীয় পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের অভিযানে প্রায় প্রতিদিন তা ধরা পড়ে বিপুল পরিমাণে। বাস্তবতা হলো, সীমান্তে কঠোর তৎপরতা এবং গোয়েন্দা নজরদারির পরও এর প্রায় অবাধ অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। ফলে সঙ্গত কারণেই ধারণা করা যায় যে, এর পেছনে শক্তিশালী স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটসহ বিত্তশালী ব্যক্তিদের হাত রয়েছে। ইয়াবা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পরিবারের সম্পৃক্ততার অভিযোগে জেল-জরিমানার খবরও আছে। বেদনাদায়ক হলো এরপরও ইয়াবার ছোবল ঠেকানো যাচ্ছে না। সে অবস্থায় এলাকার জনগণ যদি সততা ও সদিচ্ছার মনোভাব নিয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে প্রতিরোধে তাহলে সীমান্তপথে ইয়াবার চোরাচালান ঠেকানো অবশ্যই সম্ভব। মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণজাগরণ প্রত্যাশিত। আশার কথা এই যে, ইতোমধ্যে জঙ্গী নির্মূলের মতো ইয়াবা নির্মূলেও তৈরি করা হয়েছে এ্যাকশন প্ল্যান।