২৪ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

হৃদয়ে বাংলাদেশ নিয়ে পৃথিবীর পথে

ডি-প্রজন্ম : জন্ম, বেড়ে ওঠা, পরিবার, শিক্ষা...

নাহার : জন্ম লক্ষ্মীপুরে। আমি দালাল বাজার এন কে উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং লক্ষ্মীপুর সরকারী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ২০০৬ সালে বৃত্তি নিয়ে সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। পেশাগত জীবনে সুইড ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক এনজিও এর পাশাপাশি বিভিন্ন ছোট ছোট প্রজেক্টে কাজ করেছি। বর্তমানে আছি ট্রাভেলিং নিয়ে। বাবা মোহাম্মদ আমিন ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। মা তাহেরা আমিন। আট ভাই-বোনের মধ্যে আমি ছোট।

ডি-প্রজন্ম : ভ্রমণের ইচ্ছা যেভাবে এলো...

নাজমুন : খুব ছোটবেলা থেকেই মানচিত্র আমাকে টানত। আকাশে উড়ে যাওয়া পাখি দেখে ভাবতাম আমিও যদি বাঁধাহীন উড়তে পারতাম। দেখতে পারতাম মানচিত্রের সবগুলো দেশ। সে সব ছিল নিছক কল্পনা। আর সেটিকে বাস্তবে রূপ দিতে ৩টি বিষয় আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। দাদা, বাবা এবং বই। দাদা আলহাজ ফকীহ আহমদ উল্লাহ ছিলেন একজন পর্যটক, ১৯২৬-৩১ সাল পর্যন্ত আরবের বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন তিনি। তার গল্পগুলো আমায় উৎসাহ জুগিয়েছে। বাবা প্রায়ই বলতেন জীবন ছোট, একে সীমাবদ্ধ গ-ির মধ্যে আটকে রেখ না। এই ছোট্ট জীবনেই দেখতে হবে সমস্ত পৃথিবী। আর বইয়ের কথা তো না বললেই নয়। মুজতবা আলীর দেশে বিদেশে. সুনীলের ছবির দেশে কবিতার দেশে, জ্যাক ক্যারুয়াকের অন দ্য রোড, এমন অসংখ্য বই এবং ভ্রমণ কাহিনী আমায় অনুপ্রাণিত করেছে। একটি সত্যি কথা বলি, বোধোদয়ের পর থেকেই আমি স্বপ্নে উড়ে যেতাম হাজারও অচেনা জায়গায়, কখনও পথ হারিয়েছি অরণ্যে, দাঁড়িয়ে আছি পর্বত চূড়ায়। একটা বোধ আমার মধ্যে কাজ করে যে আমার জন্ম হয়েছে ভ্রমণের জন্য।

ডি-প্রজন্ম : প্রথম ভ্রমণের গল্প...

নাজমুন : প্রথমটা ছিল অভিযাত্রা। ২০০০ সালে আমি বাংলাদেশ গার্লস গাইড এ্যাসোশিয়েশনের সদস্য হিসেবে আন্তর্জাতিক এ্যাডভেঞ্চার প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করি। যেটা হয়েছিল ভূপালের পাঁচমারিতে। সেখানে অংশগ্রহণ করেছিল বিশ্বের ৮০টি দেশের ছেলেমেয়ে। ওখানে আমি প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করি। যে পতাকার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে লাখো শহীদের রক্তে ভেজা করুণ ইতিহাস। শিহরিত হয়েছিলাম আমি। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম পৃথিবীর সমস্ত দেশে এই পতাকা বয়ে নিয়ে যাওয়ার। এরপর স্বপ্নপূরণের পথে ছোটা। আমার বিশ্বাস, মানুষ জগত সম্পর্কে যত বেশি জানবে তার ভেতরের মানবিক বোধও তত বাড়বে। বিভিন্ন দেশের কৃষ্টি কালচার জানার মাধ্যমে আমরা ওই দেশের মানুষগুলোকেও আপন করতে পারব। বৃদ্ধি পাবে প্রীতি আর ভাতৃত্বের বন্ধন। ফলে সমাজ থেকে যুদ্ধ, হত্যা আর হিংসার চিন্তা সরে যাবে দূরে। আর এটাই হচ্ছে শান্তি।

ডি-প্রজন্ম : আমরা জানি দেশ ভ্রমণ একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার। অর্থের সংস্থান...

নাজমুন : অনেক পরিশ্রম করেছি আমি। পড়ালেখার পাশাপাশি ১৭-১৮ ঘণ্টা কাজ করে জমিয়েছি অর্থ। সস্তায় টিকেট কেটে ঘুরেছি বিভিন্ন দেশ। বেশিরভাগ দেশেই চলাচল করেছি সড়কপথে। একটি দেশে ফ্লাই করে গিয়ে তার আশপাশের দেশগুলো ঘুরেছি সড়কপথে। থেকেছি ইয়ুথ হোস্টেল, লোকাল ফ্যামিলির সঙ্গে।

ডি-প্রজন্ম : আমাদের দেশের পর্যটন শিল্প নিয়ে যদি কিছু বলেন...

নাজমুন : আমাদের দেশে অনেক ন্যাচারাল রিসোর্স আছে। সম্ভাবনাও আছে অনেক। আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে বিশ্বের কাছে আরও বেশি করে তুলে ধরতে হবে। হতে হবে পরিচ্ছন্ন। আমি বাইরে অনেক ছোট, গরিব দেশ দেখেছি তারা জীবন দিয়ে হলেও তাদের শহর পরিচ্ছন্ন রাখবে। কারণ ওটা থেকে তাদের আয় আসে। ট্যুরিস্টরা যেখান থেকেই আসুক না কেন তারা চায় সবকিছু একটু আর্টিস্টিক দেখতে। তারা চায় স্বচ্ছতা।

ডি-প্রজন্ম : এর জন্য কি ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন...

নাজমুন : আমাদের দর্শনীয় স্থানগুলোর ওপর আরো বেশি ডকুমেন্টরি তৈরি করতে হবে। বাড়াতে হবে তরুণদের অংশগ্রহণ। ট্যুরিজম নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করতে হবে। হতে হবে আরও বেশি সহনশীল। মনে রাখতে হবে একজন ট্যুরিস্ট আমার অতিথি। তার প্রতি সম্মান, ভালবাসা রাখতে হবে। যেন সে গিয়ে অন্য দেশে বলতে পারে ওই দেশে গিয়ে আমি এটা দেখেছি। ওই দেশের মানুষ এমন। সেই সঙ্গে মিডিয়াকেও ভূমিকা রাখতে হবে।

ডি-প্রজন্ম : আপনি তো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তরুণদের পাশাপাশি আমাদের তরুণদের অবস্থান।

নাজমুন : আমাদের তরুণদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা আছে। তারা মেধাবী। তাদের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। তাদের সাহসিকতার সঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে। ভয় পেলে চলবে না। অন্ধকারে জ্বালাতে হবে আলোর প্রদীপ। আত্মনির্ভরশীল ও পরিশ্রমী হতে হবে। যখন একটি তরুণ ভাল কিছু করবে তখন শুধু তার পরিবার নয়, সমাজ, রাষ্ট্র, পৃথিবী উপকৃত হবে।

ডি-প্রজন্ম : ফ্ল্যাগ গার্ল অব বাংলাদেশ নিয়ে আপনার অনুভূতি...

নাজমুন : ফ্ল্যাগ গার্ল অব বাংলাদেশ অবশ্যই একটি সম্মান কিন্তু তার চেয়েও বড় পাওয়া আমি পেয়েছি এবার দেশের মানুষের কাছ থেকে। আমার গল্পশুণে তারা যখন অনুপ্রাণিত হয়, ছোট্ট বাচ্চারা যখন জড়িয়ে ধরে বলে আমি তোমার মতো হতে চাই সেই অনুভূতি আমাকে আপ্লুত করে।

ডি-প্রজন্ম : অনান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশের নারীদের অবস্থান...

নাজমুন : আমাদের নারীদের সম্ভাবনা প্রচুর। রয়েছে কিছু বাধাও। এই বাধা অনেক রকম। নিজেকে ইচ্ছে করে বাধায় সঙ্গে দেয়া আবার সমাজের চাপিয়ে দেয়া বেরিয়ার। আমাদের নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় স্ট্রাগল হচ্ছে সাইক্লোজিক্যাল স্ট্রাগল। এটা যখন ওভারকাম করতে পারব তখন বাঁধা বলে কিছু থাকবে না। যারা নারীদের হাতে-পায়ে শিকল পড়িয়ে দেয় তারাও তো মানুষ। তারা কি কখনও ভেবেছে কোন অধিকারে তারা অন্যকে শিকল পরানোর চেষ্টা করে। নারীর ইচ্ছাশক্তি, আত্মপ্রত্যয় ও আত্মনির্ভরশীলতা এগিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। স্বাধীনতা চাইলে তাকে শিক্ষিত ও আত্মনির্ভরশীল হতে হবে। হতে হবে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী।

ডি-প্রজন্ম : কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান?

নাজমুন : অপূর্ব সুন্দর, ময়লাবিহীন, পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ দেখতে চাই। বিশ্বায়নের সঙ্গে তাল মেলান বাংলাদেশ। যেখানে ট্যুরিস্টরা ঘুরবে নির্দ্বিধায়।

ডি-প্রজন্ম : আগামী পরিকল্পনা...

নাজমুন : স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তিতে ২০২১ সালের মধ্যে ১৯৩টি দেশ ভ্রমণ করতে চাই। সেই সঙ্গে আরোও কয়েকটি পরাধীন দেশ ভ্রমণ করে ২শ’টি দেশ ভ্রমণ শেষ করার ইচ্ছা রাখি। আর একটি বার্তা আমি পৌঁছে দিতে চাই পৃথিবীর সব প্রান্তে। সেটি হলো স্বপ্নের কোন লিঙ্গ ভেদ নেই। স্বপ্নপূরণের অধিকার রয়েছে নারী-পুরুষ সকলেরই।

নির্বাচিত সংবাদ