১৯ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বৈশ্বিক নিরাপত্তা

বিশ্বজুড়ে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে বলে অনায়াসে বলা যায়। জঙ্গী, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিস্তার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটছে অনেকদিন ধরেই। এসব ঘটনায় মানুষ দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হচ্ছে। অভিবাসী বা শরণার্থী হিসেবে বিভিন্ন দেশে আপাত ঠাঁই পেলেও ভবিষ্যত তাদের অন্ধকারাচ্ছন্ন। তারাও ভুগছে নিরাপত্তাহীনতায়। আর বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের ধকলে মানুষ এক স্থান ছেড়ে অন্য স্থানে চলে যাচ্ছে। আর স্বাস্থ্য নিরাপত্তাহীনতার প্রকোপও বাড়ছে। মানবসভ্যতার বিকাশকে পর্যুদস্ত করে দিচ্ছে বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তাহীনতার গূঢ় কারণগুলো। মানুষে মানুষে সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্য ও হৃদ্যতার সম্পর্কগুলো ক্রমশ ঢিলে হয়ে যাচ্ছে। জার্মানির মিউনিখে সদ্য সমাপ্ত ৫৫তম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সম্মেলনে বিশ্ব নিরাপত্তা ও বিভিন্ন পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে তা আগামী দিনের সভ্যতাকে ধারণ করার পথনির্দেশিকা হিসেবে কার্যকর হতে পারে। ১৯৬৩ সালে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। স্থায়ুযুদ্ধের পটভূমিতে সূচনা হলেও পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে এই সম্মেলন বিশ্ব নিরাপত্তা ও বিভিন্ন পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আলোচনা করে আসছে। তিন দিনের এ নিরাপত্তা সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রতিনিধিরা মানবসভ্যতার বর্তমান ও আগামী দিনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন, যা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে অপরিহার্য হিসেবেই প্রতিভাত হয়। সম্মেলনে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের ভবিষ্যত এবং প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ছিল বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়। এবারের সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয় ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের বিষয়ও স্থান পেয়েছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর। বাংলাদেশ-জার্মানির সম্পর্ক অনেক পুরনো এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই পূর্ব জার্মানি বিশ্বের তৃতীয় এবং ইউরোপের প্রথম দেশ ছিল, যারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল ভুটান ও ভারতের পর। বাংলাদেশের গভীর যোগাযোগ রয়েছে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে জার্মানির সঙ্গে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে বলা যায়। বাংলাদেশের জন্য পশ্চিমা কূটনীতিতে অন্যতম ভরসার স্থল জার্মানি। এমনকি বিশ্ব নিরাপত্তার দিগন্ত বিকশিত হওয়ার পাশাপাশি এ দেশের বিদ্যুত খাতের উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন ঘটবে বলে প্রতীয়মান হয়। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনার জার্মানি সফরের সময় বালাদেশে ই-পাসপোর্ট চালুর জন্য সেখানকার সরকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করে ২০১৯ সালের জুন মাসে ই-পাসপোর্ট সরবরাহের কথা জানিয়েছেন। বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে যাত্রাপথে জার্মানির সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। নিরাপত্তা সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানসহ সাড়ে চার শ’ নীতিনির্ধারক, চিন্তাবিদ, ব্যবসায়ীসহ সমাজের অগ্রগামী শ্রেণীর প্রতিনিধি এতে অংশ নিয়েছেন। চল্লিশের বেশি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ন্যাটোসহ বিভিন্ন জোট ও সংস্থার প্রতিনিধিরাও রয়েছেন। নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) প্রধান কৌঁসুলি। ১৯৭১-এর গণহত্যা, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- এবং সাম্প্রতিককালে রোহিঙ্গা সঙ্কট ও গণহত্যা নিয়ে আইসিসির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা আরও বাড়তে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা গণহত্যার তথ্য সংগ্রহে আইসিসি তাদের প্রতিনিধি পাঠাবে বাংলাদেশে। শেখ হাসিনা একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সদস্যদের চালানো গণহত্যার জন্য তাদের বিচারের সম্মুখীন করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র নিবারণ প্রচারণা কর্মসূচীর নির্বাহী পরিচালক সাক্ষাত করে পরমাণু অস্ত্র বন্ধ করার উদ্যোগের সঙ্গে বাংলাদেশ কাজ করায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনার যে প্রয়োজন বাংলাদেশ তা স্বীকার করে। বাংলাদেশ চায় বিশ্ব শান্তি। চায় মানবতা ও সভ্যতার বিকাশ এবং বিস্তার। এই সম্মেলন সেই আশাবাদকে তুলে ধরেছে বলে তা অভিনন্দনযোগ্য।