১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার স্বীকৃতি জরুরী

  • জ্যোৎস্না তঞ্চঙ্গ্যা

আমি তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারের সন্তান। শৈশব থেকে আমি আমার মাতৃভাষা বা জাতিগোষ্ঠীর ভাষা শিখে এসেছি। কিন্তু শিক্ষাজীবনের সূচনায় স্কুলে গিয়ে দেখতে পেলাম সেখানে আমাকে বাংলা শেখানো হচ্ছে। শিক্ষা দিচ্ছেন বাঙালী, যিনি আমাদের ভাষা জানেন না। ফলে বাংলাকে আমি আমার মাতৃভাষার মাধ্যমে শিখতে বাধ্য হই। অনেক শব্দের অর্থ আমি নিজেদের ভাষার মতো করে বুঝে নিয়েছি সে সময়। অথচ এখন দেখতে পাচ্ছি আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণীত হয়েছে এবং শিশুরা নিজের ভাষায় প্রাইমারী শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখনও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। সেদিক থেকে আজ আমরা নিজেদের ভাষায় শিক্ষা অর্জনের দাবি জানাচ্ছি।

॥ দুই ॥

তঞ্চঙ্গ্যা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি পাহাড়ী জাতির মতো তঞ্চঙ্গ্যাদের আবাসভূমিও গড়ে ওঠে নদী সংলগ্ন উপত্যকায়। ইতিহাসের মূল উপাত্ত খুঁজে পাওয়া না গেলেও খ্রিস্টীয় ৫ম শতাব্দীর দিক থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সেই সময় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে আসছে ১০ ভাষা-ভাষী। বৈচিত্র্যময় এই জনগোষ্ঠীসমূহের জীবন ও সংস্কৃতি চিরাচরিত ঐতিহ্যে লালিত ও নান্দনিক। তাদের বর্ণিল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা খুবই সুন্দর ও দর্শনীয়। এ অঞ্চলে বসবাসরত নৃ-জনগোষ্ঠী হলো চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা বা টিপরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বম, চাক, খুমী, পাংখোয়া, লুসাই ও খিয়াং। প্রত্যেকটি জাতিরই নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও সমাজ ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিক দিয়ে ক্রমানুসারে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাই প্রধান। অবশ্য এর পর রয়েছে তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠী। তাদের জীবনধারা, ভাষা ও সংস্কৃতি অন্যদের থেকে পৃথক। তঞ্চঙ্গ্যারা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের জনগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে চতুর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠ। পার্বত্য তিন জেলায় বর্তমানে এদের সংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার। তঞ্চঙ্গ্যাদের বেশির ভাগ বান্দরবান জেলার সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, নাইক্ষ্যংছড়ি, আলীকদম উপজেলা এবং রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী, রাজস্থলী, কাপ্তাই, সদর, বিলাইছড়ি ও জুরাছড়ি উপজেলায় বসবাস রয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার জেলার রামু, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় তঞ্চঙ্গ্যাদের বসবাস করতে দেখা যায়। বাংলাদেশের বাইরে মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলে এবং ভারতের ও অন্যান্য রাজ্যে তাদের আবাস রয়েছে। তঞ্চঙ্গ্যারা দৈংনাক ও তৈন টংগ্যা নামে পরিচিত। বাংলাদেশে তৈন টংগ্যা বা তঞ্চঙ্গ্যা এবং মিয়ানমারের উত্তরাংশে ও আরাকানে দৈংনাক নামে তাদের বসবাস। বর্তমানে দৈংনাকদের একাংশ আরাকানের উত্তর-পশ্চিম দিকের মাতামুহুরীর উপনদী তৈনছড়ির উপকূলে বসতি স্থাপন গড়ে তুলেছে। নৃতাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণ মতে, তঞ্চঙ্গ্যারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মঙ্গোলীয় নৃ-ধারাভুক্ত জনগোষ্ঠী বলে জানা গেছে। এদের ভাষা আর্য ভাষা সম্ভূত বাংলার আদি রূপের সমতুল্য। পালি, প্রাকৃত ও সংস্কৃত শব্দে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা পরিপূর্ণ। তবে চাকমা ভাষার সঙ্গে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার মিল রয়েছে সমধিক। সম্প্রতিকালে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে। আসলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাসমূহ অস্ট্রো-এশীয়, ইন্দোচীন, চীন-তিব্বতি, তিব্বতি-বর্মণ, ইঙ্গো-ইউরোপীয় ও দ্রাবিড়ীয় ভাষা পরিবারের কোন না কোনটির অন্তর্ভুক্ত। বাংলা ভাষা গঠনের যুগে এই ভাষাসমূহের অবদান অপরিহার্য ছিল।

॥ তিন ॥

তঞ্চঙ্গ্যা বাংলাদেশের জীবিত ভাষার মধ্যে অন্যতম। জার্মান ভাষা বিজ্ঞানী জর্জ গিয়ারসনের সমীক্ষায় ১৯০৩ সালেই স্পষ্ট করে বলা হয় তঞ্চঙ্গ্যা একটি পৃথক ভাষা। যা ইন্দো-ইউরোপীয় পরিবারভুক্ত। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা আছে। এ ভাষার সাহিত্যও সমৃদ্ধ। এ ভাষায় বর্ণমালা মোট ৩৬টি। ব্যঞ্জনবর্ণ ৩১ এবং স্বরবর্ণ ৫টি। বর্ণমালায় নিজস্ব ফলা চিহ্নও আছে। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও ইউএনডিপি’র মাধ্যমে তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় প্রাইমারী স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। কিন্তু সেই কার্যক্রমের অগ্রগতি এখন শূন্য। এখন কম্পিউটার কিবোর্ড দিয়ে তঞ্চঙ্গ্যা বর্ণমালা লেখা যায়। ব্রিটিশ নাগরিক জন ক্লিফটন এই কাজটি করেছেন। কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা করেছিল ইউএনডিপি, সেভ দ্য চিলড্রেন ইউকে এবং এস.আই.এল বাংলাদেশ। তবে এসব কর্মকা- আমাদের মাতৃভাষার শিক্ষা খুব বেশি এগিয়ে নিতে পারেনি। অতীতে আমরা দেখতে পেয়েছি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট ২০১২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে তিন দিনব্যাপী ব্যতিক্রমী এক ভাষার মেলার আয়োজন করে। যেখানে দেশের ১৭টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্ব-স্ব ভাষা উপস্থাপিত হয়। তন্মধ্যে তঞ্চঙ্গ্যাও ছিল। ওই আয়োজনে উপস্থাপন করা হয় তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষার পরিচয় লিপি, ভাষিক এলাকা আর তাদের প্রাথমিক শিক্ষার কিছু বই ও প্রাচীন পুথির আলোকচিত্র। সঙ্গে ছিল তঞ্চঙ্গ্যাদের দৈনন্দিন জীবনাচারণ নিয়ে কিছু আলোকচিত্র।

বর্তমান পরিস্থিতি আমরা যতটুকু জানি তাতে দেখতে পাই আমরা তঞ্চঙ্গ্যারা যারা রাঙ্গামাটিতে থাকি তাদের চেয়ে বরং বান্দরবানের তঞ্চঙ্গ্যা বাসিন্দারা মাতৃভাষার চর্চা করে বেশি। এর কারণ প্রধানত প্রভাবশালী ভাষার আধিপত্য। চাকমা ভাষার প্রভাব যেমন আছে তেমনি আছে বাংলার। তবে আমরা এখন ক্রমান্বয়ে সচেতন হচ্ছি। নিজেদের তঞ্চঙ্গ্যা পরিচয়কে সকলের সামনে তুলে ধরছি। আর নিজের ভাষা ব্যবহার করছি। পার্বত্যবাসীর ভাষার প্রতিবেশগত নৈকট্যের জন্য একটি ভাষাগোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য ভাষাগোষ্ঠীর মিল থাকলেও আমরা নিজেদের স্বাতন্ত্র বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। আমরা আমাদের জাতিত্ব ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে গর্ববোধ করি। এজন্য নিজের ভাষা বাঁচিয়ে রাখার জন্য মৌখিকভাবে আমরা মাতৃভাষার চর্চা করে চলেছি। তঞ্চঙ্গ্যারা নিজেদের মাতৃভাষাকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে এটাই এখন বাস্তবতা।

চার.

মূলত তঞ্চঙ্গ্যারা সুদীর্ঘকাল নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তার অনুভূতিতে ক্রমে ক্রমে নিজস্ব ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির জন্মলাভ ঘটেছে যা পার্বত্য অঞ্চলের অপরাপর জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতি থেকে সহজে আলাদা। তঞ্চঙ্গ্যাদের ইতিহাস কোন রাজবংশ বা দলনেতার ইতিহাস নয়। তাদের ইতিহাস, তাদের সাধারণ জনমানুষেরই ইতিহাস। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের অভিযান অগ্রগতি কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির খতিয়ান নয় তা সমগ্র তঞ্চঙ্গ্যা জাতির অভিযান অগ্রগতি ও সাফল্যের খতিয়ান। এজন্য তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার দাবি আজ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

লেখক : গবেষক