২৫ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জামায়াতের ক্ষমা চাওয়া ভণ্ডামি বলছেন ইসলামী চিন্তাবিদগণ

বিভাষ বাড়ৈ ॥ একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়া ও সংগঠনে সংস্কার ইস্যুতে হঠাৎ করে জামায়াত আলোচনায় আসলেও একে ‘দেশ ও ইসলাম বিরোধী ভণ্ডামি’ হিসেবে দেখছেন দেশের ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদরা। জামায়াত ও তার মওদুদী মতবাদকে ইসলামের ‘দুশমন’ অভিহিত করে তারা বলেছেন, ইসলাম বিরোধী মওদুদীবাদী আদর্শ ধারণ করে নাম পাল্টলেই জামায়াত ইসলামের মিত্র হয়ে যাবে না। সংস্কারের ধুয়া তুলে ক্ষমা চাইলেই একাত্তরে ইসলামের নামে জামায়াতের গণহত্যা, লাখ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ জায়েজ হয়ে যাবে না। মওদুদীবাদী বই প্রকাশনাসহ সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। দিতে হবে কঠোর শাস্তি।

গত কয়েকদিনে অনেকটা হঠাৎ করেই ভিন্ন এক ইস্যু নিয়ে আলোচনায় এসেছে একাত্তরে দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াত ও তাদের শীর্ষ নেতৃত্ব। আদালতে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে লড়েও হঠাৎ করে গেল সপ্তাহে একাত্তরের ভূমিকার জন্য জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুলে ফল না পাওয়া ও সংস্কার ইস্যুতে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে আলোচনার শুরু করেন লন্ডনে অবস্থানরত দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। পদত্যাগের পর দলে সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত কেন্দ্রীয় নেতা ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুকেও দলে থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ শনিবার দিনাজপুর জেলার ইউনিয়ন পর্যায়ে জামায়াতের এক আমির বখতিয়ার উদ্দিন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। সর্বশেষ সোমবার গাইবান্ধায় পদত্যাগ করেছেন আর চারজন।

এমন পরিস্থিতিতে শীর্ষ নেতৃত্ব কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেও নতুন রাজনৈতিক চেহারা নিয়ে জামায়াতের হাজির হওয়ার কথাও বলছে কোন কোন মহল। একাত্তরে গণহত্যাসহ অপরাধের কথা স্বীকার না করেও ব্যরিস্টার রাজ্জাক ‘একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা’ চাওয়ার কথা বলেছেন। সংস্কার করে দলের নাম পাল্টানোর উদ্যোগের কথাও আসছে আলোচনায়। অনেকে এটাকে ইতিবাচক ভাবেও দেখা শুরু করেছেন। কোন কোন মহল ইতোমধ্যেই জামায়াতের ক্ষমা চাওয়ার চিন্তাকে ইতিবাচক রাজনীতি বলেও দাঁড় করানোর চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্ব সংস্কারসহ নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা জানিয়ে কমিটি গঠনেরও তথ্য দিয়েছেন। সব মিলিয়ে ক্ষমা চাইলে ও নাম পাল্টালেই জামায়াতের সব অপরাধের শাস্তি হয়ে যাবে বলেও কৌশলে বলার চেষ্টা করছেন অনেকে।

তবে ইসলামী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দ, ইসলামী চিন্তাবিদ আলেম ওলামারা জামায়াতের প্রতি বিশেষভাবে দুর্বল মহলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, জামায়াত ও তার মওদুদী মতবাদ হচ্ছে ইসলামের শত্রু, ইসলামের দুশমন। নাম পাল্টালেই দেশ ও ইসলামের বিরুদ্ধে করা সব অপরাধ হালাল হয়ে যাবে না। এই মতবাদ এই আদর্শ লালন করে কোন দল কোন সংগঠনই দেশে চলতে পারবে না। জামায়াত যা করছে তা হচ্ছে জনগণকে ধোঁকা দেয়া। কিন্তু এতে কোন লাভ হবে না।

দেশের ইসলামী চিন্তাবিদরা সারাদেশে জামায়াতের সব নেতাকর্মীর নামসহ তথ্য সংগ্রহ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই দল ও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন ব্যক্তি যেন কোন সংগঠনই করতে না পারে। মওদুদীবাদী সব বই প্রকাশনা দেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ আবুল আলা মওদুদীর লেখা সব বই ইসলাম এবং কোরান, সূন্নাহ’র পরিপন্থী। যে বইগুলোতে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। জঙ্গী সন্ত্রাসবাদকে উস্কানি দেয়া হয়েছে।

শোলাকিয়ার খতিব ও বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামার চেয়ারম্যান আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ বলছিলেন, একাত্তরে জামায়াতের যুদ্ধাপরাধ ও নৃশংস হত্যাকা-ের বিষয়ে নিজেদের ভুল ভাঙাকে একটি শুভ লক্ষণ। তবে কেবল একাত্তরের নৃশংসতা নয়, ধর্মীয় বিষয়ে জামায়াতের যে অপপ্রচার আছে, নবী রাসূলদের নিয়ে অপব্যাখ্যা আছে সবকিছুর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে। জামায়াতকে ধর্মীয় বিষয়েও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে সুপথে আসতে হবে। সাহাবায়ে কেরাম ও নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে মওদুদী ও জামায়াতের লেখকরা সবচেয়ে বেশি সমালোচনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম সমালোচনার উর্ধে। নবী-রাসূলদের সমালোচনা করার তো প্রশ্নই ওঠে না। আল্লাহর কাছে তারা নির্বাচিত। ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ আরও বলেন, পাকিস্তানী হায়েনাদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জামায়াত কর্মীরা এ দেশের মানুষের ওপরে নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল একাত্তরে। যুদ্ধকালীন জামায়াতের ভূমিকা সম্পর্কে দায়দায়িত্ব গ্রহণ করে ক্ষমা চাওয়ার যে পরামর্শ দিয়েছেন আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাক, তা অত্যন্ত সময়োচিত প্রস্তাব। জামায়াত সবসময় ভুল পথে ছিল। মুক্তিযুদ্ধে দেশের বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান থাকলেও সেই চিন্তাধারার আলোকেই তারা এ দেশে রাজনীতি করছে। আকাবির উলামায়ে কেরাম সবসময় মওদুদী চিন্তা ও জামায়াতে ইসলামীর আদর্শের বিরোধিতা করেছেন দাবি করে আল্লামা মাসঊদ বলেন, নবী-রাসূল সমালোচনাকারীদের সঙ্গে দ্বীনদরদি মানুষ কখনোই থাকতে পারে না। নাম পাল্টানো ও সংস্কার ইস্যুতে এক প্রশ্নের জবাবে বিশিষ্ট এ ইসলাম চিন্তাবিদ বলেছেন, নাম পাল্টালেই তো আর লাখ হবে না। নাম পাল্টালেও মওদুদীবাদ মওদুদীবাদই থাকবে। আদর্শ ঠিক রেখে কেবল নাম পরিবর্তন করা তো দলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য। এটা তো চালাকি।

খাদেমুল ইসলাম বাংলাদেশে চেয়ারম্যান ও গওহর ডাঙ্গা কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ইসলাম চিন্তাবিদ মুফতী রুহুল আমিন বলছিলেন, আসলে ওদের নাম পাল্টালেই সব অপরাধ, দোষ মাফ হয়ে যাবে না। একাত্তরের ওরা যা করেছে তা ওদের ক্ষমা চাওয়ার মধ্য দিয়েই মাফ হয়ে যাবে না। মৌলিক অপরাধ, ওদের আদর্শ ঠিক রেখে কিছু করলেও কিছু হবে না। এই মওদুদীবাদ হচ্ছে কোরান, সূন্নাহ’র পরিপন্থী, সব আকিদা বিরোধী। যে বইগুলোতে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।

মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য নতুন কৌশল নিয়েছে জামায়াত এমন মন্তব্য করে সুন্নি সম্প্রদায়ের অন্যতম নেতা ও বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের মহাসচিব মাওলানা এম এ মতিন। তিনি বলেছেন, এই জামায়াত একাত্তরের ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। তার মওদুদীবাদী মতাদর্শ ইসলাম বিরোধী। এখন মানুষকে ধোঁকা দেয়ার জন্য জামায়াত নতুন কৌশল নিয়েছে। জামায়াতের নাম পরিবর্তন করলেই কি হবে? এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, ওদের আদর্শ ঠিক রেখে নাম পাল্টালেই তো আর সব অপরাধ, দোষ পরিবর্তন হয়ে যাবে না। অপরাধ অপরাধই থাকবে। মানুষ ওদের চিনেছে। কোন লাভ হবে না। সংস্কারের ধুয়া তুলে ক্ষমা চাইলেই একাত্তরে ইসলামের নামে জামায়াতের গণহত্যা, লাখ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমহানিসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ জায়েজ হয়ে যাবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ সম্মিলিত ইসলামী জোটের চেয়ারম্যান হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান। তিনি বলেছেন, মওদুদীবাদী বই প্রকাশনাসহ সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে হবে। দিতে হবে কঠোর শাস্তি। কারণ জামায়াত ও তার মওদুদী মতবাদ হচ্ছে ইসলামের শত্রু, ইসলামের দুশমন। নাম পাল্টালেই দেশ ও ইসলামের বিরুদ্ধে করা সব অপরাধ হালাল হয়ে যাবে না। এই মতবাদ এই আদর্শ লালন করে কোন দল কোন সংগঠনই দেশে চলতে পারবে না।

হাফেজ মাওলানা জিয়াউল হাসান সারাদেশে জামায়াতের সব নেতাকর্মীর নামসহ তথ্য সংগ্রহ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই দল ও সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কোন ব্যক্তি যেন কোন সংগঠনই করতে না পারে। মওদুদীবাদী সব বই প্রকাশনা দেশে নিষিদ্ধ করতে হবে। কারণ আবুল আলা মওদুদীর লেখা সব বই ইসলাম এবং কোরান, সূন্নাহ’র পরিপন্থী। যে বইগুলোতে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। জঙ্গী সন্ত্রাসবাদকে উস্কানি দেয়া হয়েছে।

এদিকে ইতোমধ্যেই জামায়াত-শিবিরের সব বই বাজেয়াফত করে পুড়িয়ে ফেলার দাবি জানিয়েছে সম্মিলিত ইসলামী গবেষণা পরিষদ। ‘ইসলাম বিকৃতি ও ফেৎনা সৃষ্টিকারী, মওদুদী ইজমবাদী, মানবতাবিরোধী এবং একাত্তরের নরঘাতকদের সব বই বাজেয়াফত করার দাবিসহ জঙ্গীবাদ নির্মূলের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচীও পালন করছে সংগঠনটি।

সংগঠনটির কর্মসূচীতে জামায়াত-শিবিরকে ইসলামের শক্র অভিহিত করে বলা হয়েছে, জামায়াত-শিবির ইসলামের নামে ধর্মপ্রাণ মুসলমান সমাজকে বিভ্রান্ত করছে। প্রকৃতপক্ষে এরা ইসলামের শক্র, স্বাধীনতার শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু। তাই অনতিবিলম্বে তাদের প্রকাশিত সব বই বাজেয়াফত করতে হবে।

নেতৃবৃন্দ বলেছেন, আমরা মুসলমান। পবিত্র ইসলাম আমাদের ধর্ম। কোরান-হাদিসে বিশ^াসী ও সঠিক গবেষণাকারী, সাহাবায়ে কেরাম ও আউলিয়ায়েজামদের অনুসারী আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের আকিদায় বিশ^াসী ও অবিচল। আর ইসলামী আন্দোলনের নামে মওদুদী অনুসারী জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা ইমান আকিদার চরম শত্রু। পবিত্র ইসলাম ধর্মে নেই কোন ধরনের অস্ত্রবাজি, থাকতে পারবে না হানাহানি আর রক্তপাতের ঘটনা।