২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপি-জামায়াতকে সাহায্য করতেই অস্ত্র পাঠায় আইএসআই

শংকর কুমার দে ॥ রাজধানী ঢাকায় উদ্ধার হওয়া ‘মেড ইন পাকিস্তান’ লেখা গুলি-গ্রেনেড অস্ত্রের চালান আনয়নকারী দুর্বৃত্ত-সন্ত্রাসী চক্রের শিকড় অনেক গভীরে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নাশকতা ও সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ব্যবহারের জন্য অস্ত্রের চালান পাঠিয়েছিল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর কাছে তখন একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সহায়তা চেয়েছিল বিএনপি-জামায়াত ও তাদের নেতা তারেক রহমান। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ, গোয়েন্দা নজরদারির কারণে অস্ত্রের গায়ে লেখা মেড ইন পাকিস্তান গুলি-গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নাশকতা ও সহিংসতা ঘটানো যায়নি বলে তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার দাবি।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচনের দুই-তিন বছর আগে থেকে দেশে সহিংস সন্ত্রাস, নাশকতা, নৈরাজ্য করে আসছিল সরকারবিরোধী একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী। এর মধ্যে জঙ্গী গোষ্ঠী, জামায়াত-শিবির ও বিএনপির উগ্রপন্থী পরিচিত একটি চক্র। ৩০ ডিসেম্বর, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৪ নবেম্বর রাজধানী পল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আশপাশে সহিংস সন্ত্রাসের তা-বলীলা চালিয়েছে বিএনপি উগ্রপন্থী নেতাকর্মী নামধারী দুর্বৃত্তরা। কর্তব্যরত পুলিশের ওপর আক্রমণ করে পুলিশ সদস্যদের হত্যা করে দেশে অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির মাধ্যমে নির্বাচন বানচাল করাই ছিল সহিংস সন্ত্রাস চালানোর উদ্দেশ্য বা মোটিভ। রাজধানীর পল্টন থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় গ্রেফতার হওয়া ৭২ জনের মধ্যে ৪৫ জনকে ৫ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে এই ধরনের তথ্য পেয়েছে বলে তদন্তকারী ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার দাবি।

রাজধানীর পল্টন থানার ওসি তদন্ত কাজী শাহেদুজ্জামান বলেন, রাজধানীর বিজয়নগরের ডাস্টবিন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ৮ রাউন্ড নাইন এমএম পিস্তলের গুলি, ২৮ রাউন্ড একে ফোর্ট সেভেন রাইফেলের গুলি ও ১৯ রাউন্ড শর্টগানের গুলি উদ্ধার করা হয়েছে যাতে গুলির গায়ে লেখা ‘মেড ইন পাকিস্তান’। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচনের দুই-তিন বছর আগে থেকেই দেশে সহিংস সন্ত্রাস, নাশকতা চালানোসহ নানা ধরনের কর্মকা-ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর চেষ্টার সময়ে উদ্ধার হওয়া গুলি-গ্রেনেড আনা হতে পারে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ও পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ এবং নজরদারির কারণে যেই চক্র বা গোষ্ঠী অস্ত্রের চালান এনেছে তা দিয়ে আর সহিংসতা ও নাশকতা চালানো সম্ভবপর নয়- এমনটা ভেবেই ডাস্টবিনে গুলি ও গ্রেনেড ফেলে দেয় বলে মনে হয়। একদিকে সহিংস সন্ত্রাস বা নাশকতা চালানো যেমন সম্ভবপর নয়, তেমনি আরেক দিকে গুলি, গ্রেনেডের মতো অস্ত্র নিজেদের কাছে রাখাও নিরাপদ নয়। এ কারণেই রাজধানীর পল্টন থানাধীন ডাস্টবিনে গ্রেনেড-গুলি ফেলে দেয়া হয় বলে অনুমিত হয়। পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের দল এসে গ্রেনেড নিষ্ক্রিয় করেছে। তবে কার হেফাজতে মেড ইন পাকিস্তান লেখা গুলি-গ্রেনেড ছিল তা খুঁজে বের করার তদন্ত করা হচ্ছে বলে পল্টন থানার ওসি তদন্তের দাবি।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সহায়তায় বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী ২০১৪-১৫ সালের মতো ঢাকায় আবারও নাশকতা সৃষ্টিতে সক্রিয় ছিল বলে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ভারতীয় গণমাধ্যম দ্য ইকোনমিক টাইমস। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকায় আবারও বিএনপি-জামায়াত ২০১৪-১৫ সালের মতো হত্যাযজ্ঞ চালানোর পরিকল্পনা করছিল, যাতে সাধারণ জীবনযাপন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। ডিসেম্বরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার ৪ মাস আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা সে দেশের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যে গোয়েন্দা প্রতিবেদন দাখিল করেছে তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচনের সময়ে সেখানে জঙ্গী হামলার পরিকল্পনা করে জেএমবি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দেশব্যাপী বিএনপি-জামায়াত অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে। রাজধানীর পল্টন থানাধীন এলাকায় গত রবিবার রাতে উদ্ধার হওয়া মেড ইন পাকিস্তান লেখা গুলি-গ্রেনেড সেই ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করছে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, পাকিস্তানভিত্তিক বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা জামায়াতে ইসলামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না জেনে ভোটবিহীন একটি অগণতান্ত্রিক পক্ষকে ঢাকার ক্ষমতায় বসাতে চেষ্টা করেছে বিএনপি-জামায়াত। এ জন্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অপপ্রচার চালানো হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর বৈঠকের খবর দিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘টাইমস অব আসাম’ বলছে, এতে বলা হয় নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করতে তৎপরতা চালায় জামায়াত-বিএনপি। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় জামায়াত নিয়ন্ত্রিত সরকার প্রতিষ্ঠায় তৎপর পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-আইএসআই। লন্ডনে বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও লন্ডনে অবস্থানরত জামায়াত নেতা ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে আইএসআই’র বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেছে টাইমস অব আসাম। জামায়াত বিএনপি ক্ষমতায় এলে জঙ্গীবাদের উত্থান হবে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্যও হুমকি।

গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, মেড ইন পাকিস্তান লেখা গুলি-গ্রেনেড উদ্ধার হলেও তার সঙ্গে আসা মেড ইন পাকিস্তান আগ্নেয়াস্ত্রও এসেছে বলে মনে হয়। কিন্তু এসব অস্ত্রের চালান কোথায় গেল? দেশী-বিদেশী একটি আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালানী চক্র আছে যারা মেড ইন পাকিস্তান গুলি-গ্রেনেড এনেছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ধরে নিয়েছিল নির্বাচনে আবারও জামায়াত-বিএনপি ক্ষমতায় আসছে এবং সেজন্যই তৎপরতা জোরদার করে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলে আবারও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে অস্ত্রসহ সব ধরনের সমর্থন দেয়া যাবে, বাংলাদেশের জঙ্গী সংগঠনগুলোকে তারা অস্ত্র, অর্থ ও অন্যান্য সমর্থন দিতে সহজ হবে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষের শক্তি ও ভারতের প্রতি প্রতিশোধ নেয়া যাবে। এসব বিবেচনায় নিয়েই লন্ডনে অবস্থানরত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গেও গোপন যোগাযোগ হয় পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর। গত ৪ জুলাই সৌদি আরবের জেদ্দায় তারেক রহমানের সঙ্গে আইএসআইয়ের শীর্ষস্থানীয় দুই কর্মকর্তার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যাতে দুবাই বিএনপির এক নেতার মাধ্যমে আইএসআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেন তারেক রহমান।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান ও একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ব্যবহৃত আর্জেস গ্রেনেডের সঙ্গে তারেক রহমান ও পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি তারেক রহমান। পাকিস্তান থেকে একুশে আগস্টের আর্জেস গ্রেনেডগুলো ভারতের কাশ্মীর হয়ে বাংলাদেশে আনা হয়েছে বলে তদন্তে প্রকাশ। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে মৃত্যুদ- প্রাপ্ত ১৯ জনের একজন পাকিস্তানী নাগরিক হিযবুল মুজাহিদীনের নেতা আবদুল মাজেদ ভাট। গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। পাকিস্তানে জঙ্গী সংগঠন হিযবুল মুজাহিদীন সংগঠন গড়তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। এ সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। বাংলাদেশে আসার পর তার সঙ্গে পরিচয় হয় গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি মুফতি হান্নান ও মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে। তাজউদ্দিন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর ছোট ভাই। মুফতি হান্নান ও মাওলানা তাজউদ্দিনের সঙ্গে থেকেই গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনা করেন মাজেদ ভাট। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা করে আসছিলেন তিনি। পাকিস্তান থেকে গ্রেনেড আনার কাজটিও করেন মাজেদ ভাট। সেই গ্রেনেড হামলায় ব্যবহার করা হয় একুশে আগস্টে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় আদালতে উপস্থাপিত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মাজেদ ভাট হিযবুল মুজাহিদীনকে সংগঠিত করতে কাজ করেছেন। এ কাজের জন্য পাকিস্তান থেকে তার কাছে নিয়মিত অর্থও আসত। এ ছাড়াও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফাকে বিভিন্ন সময়ে বিশাল অস্ত্রের চালান জুগিয়েছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থাটি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অস্ত্র চোরাচালানের রুট হিসেবে ব্যবহার করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির কারণে ইতিপূর্বে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ফেলে দেয়া বিশাল অস্ত্র, গুলির চালান পানির নিচে থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হয়। মাটির নিচ খুঁড়ে ময়মনসিংহ, সিলেট সীমান্ত এলাকা থেকে উদ্ধার হয়েছে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফার জন্য পাঠানো কামান, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, মেশিনগানের মতো অস্ত্র ও গুলি মজুদ। এখন আবার গত রবিবার রাতে খোদ রাজধানীর পল্টন থানাধীন এলাকার ডাস্টবিন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হলো মেড ইন পাকিস্তান লেখা গুলি ও গ্রেনেড। কারা বা কোন চক্র, কিভাবে, কী উদ্দেশ্যে, মেড ইন পাকিস্তান লেখা গুলি-গ্রেনেড বাংলাদেশে এনেছে তার রহস্য এখনও উদ্ঘাটনের চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার দাবি।