২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আত্মসমর্পণ না করা ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে শীঘ্রই অভিযান

হাসান নাসির/এইচএম এরশাদ ॥ টেকনাফের তালিকাভুক্ত ইয়াবা গডফাদার ও ডিলারদের মধ্যে যারা এখনও আত্মসমর্পণ করেনি তাদের ধরতে শুরু হবে সাঁড়াশি অভিযান। মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যে জিরো টলারেন্স অবস্থান, তাতে কেউ রেহাই পাবে না, এমনই মনোভাব প্রশাসনের। শীঘ্রই নতুন মাত্রায় এ অভিযান চালানো হবে। তবে পাশাপাশি চিহ্নিতদের মধ্যে যাদের প্রকাশ্যে চলাফেরা তাদের বিরুদ্ধে কেমন ব্যবস্থা নেয় বা তারা পার পেয়ে যাচ্ছে কিনা, তা নিয়েও এলাকায় চলছে নানা বিশ্লেষণ।

মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের মধ্যে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি শনিবার যে ১০২ জন আত্মসমর্পণ করেছে তারা নিতান্তই কম। কারণ প্রশাসনের তালিকায় এ সংখ্যা সহস্রাধিক। রয়েছেন ওই এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিও, যারা অত্যন্ত ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী। প্রকাশ্যে তাদের বিচরণ এমনই যে, তারা যেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। অনেকেই বলে বেড়াচ্ছেন তালিকায় তাদের নাম নেই বা নাম কাটা গেছে। কিন্তু জেলা ও পুলিশ প্রশাসন জানাচ্ছে, কেউ ছাড় পাবে না। মাদক নির্মূলে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ এবং উখিয়ায় ইয়াবা কারবারের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে অনেক কোটিপতির। তারা প্রাসাদতুল্য বাড়ি নির্মাণ করেছেন। অথচ, পনের বিশ বছর আগেও তাদের ছিল দিনে এনে দিন খাওয়া অবস্থা। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা বিক্রির টাকার জোরে অনেকেই হয়েছেন বড় নেতা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত। ঘুরে ফিরে এখনও আসছে সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম। তিনি যথারীতি আছেন প্রশাসন ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে। টেকনাফ থেকে নির্বাচিত সাবেক সংসদ সদস্যের ইয়াবাসংশ্লিষ্টতা সকলেরই জানা। বিষয়টি অবিশ্বাস করার মতো নয়। কেননা, যারা ইয়াবা এবং অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছেন তন্মধ্যে তার স্বজনরাও ছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ছাড় না দেয়ার কথা বার বার বলা হলেও শেষ পর্যন্ত জালে বড়রা ধরা পড়বেন কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে এলাকায়।

টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা ডন ও মিয়ানমারের নিয়োজিত ডিলারদের কেউ প্রকাশ্যে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছে। তারা নিজেদের দোষী নয় বলে দাবি করে চলছে। গত শনিবারের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনেক শীর্ষ ইয়াবা কারবারি উপস্থিত হননি। নানা পথে তাদের মাধ্যমে এখনও ইয়াবার চালান আসছে মিয়ানমার থেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে টেকনাফের শীর্ষ ইয়াবা ডিলারের এক স্বজন বলেন, মাদক নির্মূলে সরকার যে এত কঠোর থেকে কঠোরতম হবে, তা কেউ কল্পনাও করেনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেকনাফ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বক্তৃতায় বলেছেন, মাদক নির্মূলে যা যা করতে হয় করব। ইয়াবা কারবারিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, বিজিবি, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও পুলিশসহ অনেক বাহিনী ও সংস্থা। এর মধ্যে কয়টি বাহিনী থেকে নিজেকে রক্ষা করবেন, একটি না এক বাহিনী আপনাদের গ্রেফতার করবে। মাদক কারবার ত্যাগ করে সহসা প্রশাসনের কাছে ধরা দিন, নয়তো রেহাই নেই। আইজিপি জাবেদ পাটোয়ারীও জানিয়েছেন সাঁড়াশি অভিযানের সিদ্ধান্তের কথা। হুঁশিয়ারি শুনে আতঙ্ক বিরাজ করছে ইয়াবা সম্রাটদের মনে।

কক্সবাজার জেলায় ১ হাজার ১৫১ জন ইয়াবা ও মাদক বিক্রেতা রয়েছে, যারা পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার তালিকাভুক্ত। ১০২জন আত্মসমর্পণ করলেও বাকি ১ হাজার ৪৯ জন আত্মগোপনে এবং কেউ কেউ প্রকাশ্যে রয়েছে। এদের মধ্যে ইয়াবা কারবারের মূল হোতা হাজী সাইফুল করিমসহ কয়েকজন রাঘব-বোয়াল ঢাকা-চট্টগ্রামে বসে এখনও ইয়াবার চালান নিয়ন্ত্রণ করছে। বর্তমানে বেশিরভাগ চালান যাচ্ছে সাগর পথে। মাছ ধরার ভান করে মিয়ানমারের সিটওয়ে (আকিয়াব) থেকে বিশেষ কায়দায় ট্রলারে বা ফিশিং বোটে করে লাখ লাখ পিস ইয়াবার চালান আসছে চট্টগ্রাম ও ঢাকায়। সিটি এলাকায় আলিশান বাসায় ওসব ইয়াবার চালান পৌঁছে যাচ্ছে। দামী গাড়িতে করেও পৌঁছানো হচ্ছে নির্ধারিত জায়গায় জায়গায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়াকড়িতে কারবারিরা রয়েছেন বিকল্প রুট অনুসন্ধানে।

স্থানীয়রা বলছেন, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সঙ্গে টেকনাফ উখিয়া সীমান্তের লোকজনের কোন ধরনের বিরোধ থাকার কথা নয়। সুতরাং যারা প্রকৃত অর্থেই মাদক ব্যবসায় জড়িত, তাদের নামই তালিকায় উঠে এসেছে। সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি ছাড়াও ইয়াবা চোরাচালানের মূল হোতা হাজী সাইফুল করিম, টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান জাফর আহমদ, তার ছেলে সদর ইউপি চেয়ারম্যান শাহজাহান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মৌলবি রফিক উদ্দিন, তার ভাই বাহারছড়া ইউপি চেয়ারম্যান মৌলবি আজিজ উদ্দিন, কাউন্সিলর মৌলবি মুজিবুর রহমান, জালিয়া পাড়ার জাফর আলম ওরফে টিটি জাফর, শাহপরী গ্রুপের চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান ইয়াহিয়া, রামু খুনিয়াপালং ইউপি সদস্য মোস্তাক আহমদ ওরফে ইয়াবা মোস্তাক, টেকনাফ নাজির পাড়ার নুরুল হক ভুট্টো, কক্সবাজার শহরের বাস টার্মিনাল এলাকার কাশেম আনসারী, একই এলাকার আবুল কালাম ও তার ভাই বশির আহমদ, বাস টার্মিনাল এলাকার পুরনো রোহিঙ্গা আবু নফর, মহেশখালী পুটিবিলার মৌলবি জহির উদ্দীন, পৌরসভা সিকদারপাড়ার যুদ্ধাপরাধী মৌলবি জকরিয়ার পুত্র সালাহ উদ্দীন, মিঠাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়রম্যান ইউনুচ ভুট্টো ও রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন কোম্পানিসহ অনেকেই অধরা থেকে যাচ্ছে। এতে স্থানীয়দের মধ্যে নানা গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলেছে, আত্মসমর্পণ করলে সহস্রাধিক ইয়াবা কারবারিই করত। ১০২ জন স্যারেন্ডার করার পর বাইরে থাকা ইয়াবা কারবারিরা ইয়াবার চালান আনা অব্যাহত রেখেছে। তবে ওই ইয়াবা কারবারিদের বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান শুরু হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

র‌্যাব-সেভেন কক্সবাজার কোম্পানি অধিনায়ক মেজর মোঃ মেহেদী হাসান জনকণ্ঠকে জানান, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে উখিয়ার শিলের ছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৬ হাজার ৬শ’ পিস ইয়াবাসহ ৩ মিয়ানমার নাগরিককে আটক করা হয়েছে। আটকদের মধ্যে দু’জন হলো কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প, ব্লক-এফ/৪৩ এ আশ্রিত নূর আলম (৪০)। মোঃ জিয়াবুল রহমান (৩১)। একইদিন সন্ধ্যায় ১০ হাজার ৬পিস ইয়াবাসহ কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মোঃ আলী হোসেনের পুত্র মোঃ হামিদ হোসেনকে (৪০) আটক করা হয়।

সরকারের বিশেষ আইনী সহায়তা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার এ সুযোগ নিতে যারা আত্মসমর্পণ করেনি তাদের পার পাওয়ার কোন সুযোগ নেই বলে জানিয়ে দিয়েছে প্রশাসন। নতুন করে যাতে ইয়াবার অনুপ্রবেশ না ঘটে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক বেশি কঠোর। মিয়ানমার থেকে চালান আসা এবং তা অন্য জেলায় পরিবহন ঠেকাতে স্থলপথ এবং জলপথে শক্ত জাল সৃষ্টি করেছে পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্টগার্ড। কোনভাবেই দেশে মাদকের বিস্তার ঘটতে দেয়া হবে না, এটা বর্তমান সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার।