১৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অদম্য যোদ্ধা কেভিতোভা

  • কোহিনুর আক্তার

ছোটবেলায় মার্টিনো নাভ্রাতিলোভার একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন কেভিতোভা। এখন পর্যন্ত তাকেই আদর্শ মানেন। আর তাকে দেখেই টেনিসের ব্যাট হাতে নিয়েছিলেন। কিন্তু তা ছিলো শখের বসে। কে জানতো, এই শখই তাকে টেনিসের শীর্ষস্থানীয় রাণীদের একজন করে তুলবে? ১৯৯০ সালে চেক প্রজাতন্ত্রে জন্মগ্রহণ করেন কেভিতোভা। পরিবারের কেউই পেশাদার টেনিস খেলোয়াড় ছিলেন না। ছোটবেলা থেকে শিক্ষক বাবার সঙ্গে কিংবা দুই ভাইয়ের সঙ্গে বিকেলে বাড়ির আঙিনাতে খেলাটায় ছিল তার হাতেখড়ি। ১৬ বছর বয়সে নিজ শহর ফুলনেকে ইন্সট্রাক্টরের কাছে প্রথমবারের মতো টেনিসের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়া শুরু করেন কেভিতোভা। তিনিই পেত্রাকে পরামর্শ দেন পেশাদার টেনিসে নাম লেখানোর জন্য। তার কথাতেই ২০০৬ সালে সবকিছুর তল্পি-তল্পা গুটিয়ে টেনিসেই ধ্যান দেন এই চেক রমণী। এভাবেই শুরু পেত্রা কেভিতোভার। মেধাবীরা হঠাৎ করেই আলোচনায় আসেন। ব্যতিক্রম হয়নি কেভিতোভার ক্ষেত্রেও। নিজে যেমন আদর্শ মানেন নাভ্রাতিলোভাকে, তেমনি তার খেলার মধ্যেও নাভ্রাতিলোভার স্টাইল লক্ষণীয়। খেলোয়াড়ি জীবন শুরু করার মাত্র দুই বছরের মাথায় অর্থাৎ ২০০৮ সালে টেনিসের বর্তমান একনম্বর খেলোয়াড় সেরেনা উইলিয়ামসকে হারিয়ে চমকে দেন সবাইকে। আর টেনিস বিশ্বকে নিজের ক্ষমতা সম্পর্কেও আগাম বার্তাটা ভালোই দেন। ওই ম্যাচটি দিয়েই বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ের ৫০ নম্বরে উঠে আসেন পেত্রা কেভিতোভা।

বর্তমান বিশ্ব টেনিসের আলোচিত নাম পেত্রা কেভিতোভা। দুটি গ্র্যান্ডসøাম জিতেছেন চেক প্রজাতন্ত্রের এই টেনিস তারকা। দুটিই আবার উইম্বলডনে। ২০১১ সালে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডসøাম জয়ের পর ২০১৪ সালে দ্বিতীয়টি। এরপর আর বড় কোন শিরোপা জয়ের স্বাদ পাননি তিনি। তবে দমে যাননি পেত্রা কেভিতোভা। সবকিছুকে পেছনে ফেলে অদম্য গতিতে ছুটে চলছেন বিশ্ব টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের এই তারকা খেলোয়াড়। ২০১৯ সালে ইতোমধ্যেই সিডনি ইন্টারন্যাশনাল টেনিস টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। এছাড়াও খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনাল। বিশ্ব টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়েও অগ্রগতি হয়েছে তার। এই মুহূর্তে র‌্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে উঠে এসেছেন তিনি। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না চেক তারকা। জানালেন, পারফর্মেন্সের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চান পেত্রা কেভিতোভা। দীর্ঘ আট বছর আগে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডসøাম জয়ের স্বাদ পান পেত্রা কেভিতোভা। তার তিন বছরের বিরতি শেষে জিতেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় মেজর শিরোপা। তবে এর পরের সময়টাতে নিজেকে আর সেভাবে মেলে ধরতে পারছিলেন না ছয় ফুট উচ্চতার এই চেক তারকা। নিস্প্রভ পারফর্মেন্সের পাশাপাশি তার বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় চোট। তবে ২০১৯ সালে দেখা যায় এক ভিন্ন কেভিতোভাকে। নতুন মৌসুমে দুর্দান্ত শুরু করেছেন পেত্রা কেভিতোভা। শুরুটা করেন সিডনি ইন্টারন্যাশনাল টেনিস টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হয়ে। মৌসুমের প্রথম শিরোপা জয়ের স্বাদ পান তিনি। এরপর খেলেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনাল। মৌসুমের প্রথম মেজর টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও নিজের পারফর্মেন্সে দারুণ সন্তুষ্ট চেক প্রজাতন্ত্রের এই টেনিস তারকা। অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের পর বেশ কয়েকটা দিন বিশ্রামে কাটান তিনি।

বিশ্রাম শেষে মঙ্গলবার থেকেই নতুন মিশন শুরু করেন পেত্রা কেভিতোভা। দুবাই চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্য নিয়েই কোর্টে নামেন বর্তমান বিশ্ব টেনিস র‌্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বর খেলোয়াড়। ২০১৩ সালে প্রথমবারের মতো দুবাইয়ের এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছিলেন কেভিতোভা। এর পর অবশ্য নিজেকে আর মেলে ধরতে পারেননি এই টুর্নামেন্টে। গত বছর তো কাতার ওপেনের শিরোপা জয়ের পরও দুবাই থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন তিনি। তবে এবার নিজের পারফর্মেন্স নিয়ে দারুণ সন্তুষ্ট চেক তারকা। দুবাইয়ের এই টুর্নামেন্টে কোর্টে নামার আগে পেত্রা কেভিতোভা বলেন, ‘গত বছর আগে এই টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছিলাম তা ভুলে গেছি। তবে এটা মনে করতে পারি যে, সেবার একাকী খেলতে এসেছিলাম এখানে। কোচ ছিল না সেবার। সত্যি কথা বলতে আমার সঙ্গী কেউ ছিল না আর। আমি শুধু নিজের চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমেই যা পারি খেলেছি। এই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী স্মৃতি বলতে এটাই মনে বেশি মনে পড়ছে আমার। এখানে আবার আসতে পেরে আমি তাই অনেক খুশি। এখানের সময়টা আমি সত্যিই খুব উপভোগ করি।’ দুবাইয়ে কোন অতিরিক্ত মোটিভেশন নিয়ে এসেছেন কী না? সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে এমন প্রশ্ন করা হয় কেভিতোভাকে। চেক তারকার খুব সহজ উত্তর, ‘আমার আসলে আলাদা কোন মোটিভেশন নেই। অন্য সব সপ্তাহে যেমনটা থাকি এবারও ঠিক তাই। এখানে এসে আবার কোর্টে নামতে পারছি তাতেই আমি অনেক খুশি। আমার কাছে এটাই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।’

তবে কেভিতোভার অতীত গল্পটা সত্যিই দুর্বার! চেক প্রজাতন্ত্রের এই টেনিস তারকাই যে এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার শিকার হয়েছিলেন ২০১৬ সালে। অস্ট্রেলিয়ান ওপেন শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে। চেক প্রজাতন্ত্রে নিজের বাড়িতেই ভয়ঙ্কর আক্রমণ হয়েছিল তার ওপর। দুর্বৃত্তের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায় তার বাঁ হাত। বাঁহাতি কেভিতোভার পাঁচটি আঙ্গুলই বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা জেগেছিল। সবচেয়ে ক্ষতি হয় তর্জনি। আঙ্গুলগুলো বাঁচাতে প্রয়োজন হয় সূক্ষ্ম সার্জারির। চিকিৎসকরা তো স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, কেভিতোভার বাঁ হাতে র‌্যাকেট নেওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ১০ শতাংশ! কিন্তু লড়াকু কেভিতোভা দমে যাননি। সেলেসের মতো অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে কোর্টে ফিরেন সাময়িক বিরতি নিয়ে। দুইবারের উইম্বলডন চ্যাম্পিয়নের প্রত্যাবর্তন এক কথায় দুর্দান্ত। ৫টি শিরোপা জিতেছেন, যার মধ্যে সর্বশেষটি বছরের শুরুতে সিডনি ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ট্রফি। এরপর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনের ফাইনাল! উইম্বলডনের পর যা তার ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ডস্লাম ফাইনাল। মেলবোর্নে টানা ৬ ম্যাচ জিতে উঠে যান ফাইনালে।

নির্বাচিত সংবাদ