২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাদুরো কি শেষ রক্ষা করতে পারবে

ভেনিজুয়েলা আজ এক জটিল পথসিন্দুতে। ভয়ঙ্কর বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে কোন্ পথ বেছে নেবে দেশটি সেটাই আজ প্রশ্ন। দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে দাবি করেছেন দু’জন। একজন নিকোলাস মাদুরো যিনি ২০১৮ সালে চরম প্রহসনের নির্বাচনে দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী বলে ঘোষণা করেছেন। অন্য জন পার্লামেন্টের স্পীকার জুয়ান গুয়াইদো গত ২৩ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন।

মাদুরো গত কয়েক বছরে সরকারকে তার পছন্দমতো করে সাজিয়েছেন। সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের রদবদল করেছেন। জরুরী আইন জারি করেছেন। ২০১৫ সালের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে বিজয়ী-বিরোধী দলের প্রাধান্যপুষ্ট পার্লামেন্টকে কোণঠাসা করে রেখেছেন। পুরো নির্বাচন যন্ত্রকে এমনভাবে ঢেলে সাজিয়েছেন যাতে করে তিনি কোন রকম বিরোধিতা ছাড়াই ক্ষমতায় থেকে যেতে পারেন। ওদিকে গুয়াইদোর বক্তব্য শুরু থেকে প্রেসিডেন্ট পদটি শূন্য হয়ে আছে ক্ষমতার এই শূন্যতার কারণ দেখিয়ে তিনি সংবিধানের ২৩৩ ধারা বলে সাময়িকভাবে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

গুয়াইদো এ কাজে একা নন। তিনি দেশের বিভক্ত বিরোধী দলকে একত্রিত করেছেন। শপথ নেয়ার পর ৩৫ বছর বয়স্ক গুয়াইদোর সমর্থনে কারাকাসে বিশাল জনসমাবেশ হয়েছে। লাতিন আমেরিকার বেশিরভাগ দেশ, যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ রাষ্ট্র গুয়াইদোকে বৈধ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে পদতাগের জন্য মাদুরোর ওপর প্রবল অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করছে। এ অবস্থায় গুয়াইদোর লড়াই চালানোর পক্ষে যথেষ্ট শক্তি সমাবেশ করলেও লড়াইটা অত সহজ হবে না।

কারণ ভেনিজুয়েলার শক্তিশালী সামরিক বাহিনী বিরোধী দলের পক্ষে মস্ত বাধা। এ পর্যন্ত তারা মাদুরো সরকারের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল ভা-ারের দেশ ভেনিজুয়েলা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। খাদ্যাভাব সেখানে আজ এতই প্রকট যে এক বছরে সেখানকার গড় মানুষের ওজন কমেছে ২৮ পাউন্ড। সঙ্কটের কারণে দেশ থেকে ৩০ লাখ বা জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশ অন্যত্র পালিয়েছে। পশ্চিম গোলার্ধে এত ভয়াবহতম উদ্বাস্তু সঙ্কট আর হয়নি। এত সঙ্কটের মধ্যেও মাদুরো ক্ষমতায় টিকে থাকার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করেছেন। সামরিক বাহিনী ও রাজনৈতিক এলিট শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপক দুর্নীতি ও সংঘটিত অপরাধ বেশ কয়েক বছর ধরে রাজনৈতিক জীবনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যে কোন মূল্য এই স্ট্যাটাসকো বজায় রাখার ও তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিñিদ্র ক্ষমতার কাঠামো গড়ে তুলেছে। প্রচলিত ধরনের একনায়কত্ব নয়, ভেনিজুয়েলা আজ পরিণত হয়েছে এক মাফিয়া রাষ্ট্রে। সেই রাষ্ট্রের আর্থিক পরিস্থিতি শুধুমাত্র একটি দৃষ্টান্তেই ফুটে ওঠে। তা হলো অতি মুদ্রাস্ফীতি ২০১৯ সালে ১ কোটি শতাংশে পৌঁছবে বলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালে মাদুরো ক্ষমতায় আসার পর দেশটির অর্থনীতি সঙ্কুুচিত হয়েছে ৫৩ শতাংশ। সাধারণ মানুষের জীবন হয়েছে দুর্বিষহ। ১০টি পরিবারের মধ্যে ৯টি পরিবারেরই খাওয়ার মতো পর্যাপ্ত খাদ্য নেই। সহিংসতার বিস্তার ঘটেছে ভয়াবহ।

তবে দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণা যে সবাইকে স্পর্শ করছে তা নয়। ১ লাখ ৬০ হাজার সদস্যের সামরিক বাহিনীকে মাদুরো অবৈধ পথে অর্থবিত্ত গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত হওয়ার নজিরবিহীন স্বাধীনতা দিয়েছেন। পার্লামেন্টের হিসাবে সরকারের ঘনিষ্ঠজনেরা সাম্প্রতিককালে বিভিন্ন সরকারী সংস্থা থেকে কমপক্ষে ৩৫ হাজার কোটি ডলার আত্মসাত করেছে। সামরিক বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তারা মাদক ও তেল চোরাচালানের কাজে জড়িত। সামরিক বাহিনী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। প্রতি সপ্তাহে ৫টি শিশু অপুষ্টিতে মৃত্যুবরণ করা সত্ত্বেও সেনা কমান্ডার ও অন্যান্য সরকারী কর্মকর্তা জাতীয় খাদ্য কর্মসূচী থেকে অর্থ অন্যত্র পাচার করছে এবং খাদ্য আমদানি কর্মসূচীতে উচ্চ পর্যায়ের দুর্নীতি হচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। এমন দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে সামরিক বাহিনী ও প্রশাসনের আনুগত্য নিশ্চিত করার জন্য। রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভি এসএর পরিচালনার ভার মাদুরো ২০১৭ সালে এক জেনারেলের হাতে দেন। কিন্তু সেখানে অযোগ্যতা ও দুর্নীতি এত বেশি হয় যে সংস্থাটির তেল উৎপাদন দুই বছরে অর্ধেকে নেমে এসে দৈনিক ১১ লাখ ব্যারেলে দাঁড়ায়। প্রায় ৭০ বছরের মধ্যে এত কম তেল উৎপাদন সংস্থাটির আর হয়নি।

দেশটির শক্তিশালী সামরিক প্রতি গোয়েন্দা সংস্থা সর্বক্ষণ সামরিক বাহিনী অসন্তোষ ও ভিন্নমতের লক্ষণগুলোর ওপর নজরদারি করে চলেছে। সামরিক বাহিনী মাদুরোর পেছনে আছে কারণ তারা জানে মাদুরোর পতন হলে তাদের পতন হবে। সরকার বদলালে তাদের শাস্তি হতে পারে। তবে গুয়াইদো সামরিক বাহিনীর সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ রেখে চলেছেন এবং মাদুরোর নিয়ন্ত্রণ একটু একটু করে শিথিল হয়ে পড়েছে। তার তৈরি মাফিয়া কাঠামো ধসে পড়ছে। আরও খারাপ খবর আছে মাদুরো সরকারের জন্য। তেল শিল্প হলো ভেনিজুয়েলার ৯০ শতাংশ রাজস্বের উৎস। যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রায় অর্ধেক তেল কিনে থাকে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে সেই তেল কেনা বন্ধ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, এতে দেশটির অর্থনীতি আরও পঙ্গু হবে। সবদিক থেকে কোণঠাসা করে ফেলা হচ্ছে সরকারকে। অবশ্য এই সরকারের এখনও কিছু শক্তিশালী মিত্র রয়ে গেছে। রাশিয়া ও চীন মাদুরো সরকারকে সমর্থন জুুগিয়ে চলেছে তুরস্ক ভেনিজুয়েলার তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে। বৃহত্তর প্রশ্ন হলো ভেনিজুয়েলায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ হবে কিনা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও গুয়াইদো দু’জনেই তেমন সম্ভাবনা নাচক করে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। গুয়াইদো বলেছেন ওটাই হবে শেষ অবলম্বন। তবে আগামী কয়েক সপ্তাহ বা বড়জোর কয়েক মাসের মধ্যে পরিষ্কার হয়ে যাবে ভেনিজুয়েলা শেষ পর্যন্ত কোন্্ পথটি বেছে নেবে।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : টাইম