২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ব্রেক্সিট প্রশ্নে কি ফের গণভোট হতে পারে

গত ১৫ জানুয়ারি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্রেক্সিট চুক্তি যেভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে আধুনিক ব্রিটিশ সরকারের আর কোন পরিকল্পনা তেমন শোচনীয়ভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়নি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রায় দু’বছর ধরে কঠিন দেন-দরবারের পর সম্পাদিত এই চুক্তিটি ছিল থেরেসা মের প্রধানমন্ত্রিত্বের মুখ্য বিষয়। পার্লামেন্টে পাঁচ দিন ধরে বিতর্ক চলার পর ব্রেক্সিট চুক্তিটি ৪৩২-২০২ ভোটে প্রত্যাখ্যাত হয়। থেরেসা মের রক্ষণশীল দলের সদস্যরা ৩-১ এ এই চুক্তির বিরুদ্ধে ভোট দেন। এর ফলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অতি বড় ধরনের সাংবিধানিক সঙ্কটে পড়েছে।

তিন শ’র আগে ব্রিটেনরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে গণভোটে ভোট দেয়। ওটা ছিল দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম ভোটাভুটি। অথচ এক বছর পর সেই একই ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত পার্লামেন্ট ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার শর্তাবলীকে অগ্রহণযোগ্য বলে রায় দিয়েছে। শর্তাবলী নিয়ে নতুন করে আলোচনায় বসতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তেমন কোন আগ্রহের পরিচয় দেয়নি। তার পরও মে গো ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ২৯ মার্চের মধ্যে এই ধাঁধার সমাধান বের করতে না পারলে ব্রিটেনকে বিনা চুক্তিতেই থাকতে হবে।

সেই বিপর্যয় এড়াতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যেটা করণীয় তা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে সময় চেয়ে নেয়া। কিন্তু সময় তাদের পক্ষে থাকলেও ব্রিটিশ এমপিরা ব্রেক্সিটের মস্ত ধাঁধার সমাধান প্রশ্নে একমত হবেন তেমন সম্ভাবনা নেই। সেই মস্ত ধাঁধাটা হলো ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কোন শর্ত বা শর্তাবলীর দ্বারা জনগণের ইচ্ছা সত্যিকার অর্থে পূরণ হবে। দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে কিন্তু ব্রিটিশ এমপিরা এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে পারছেন না। ফলে এটা পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে জনগণকেই দ্বিতীয় গণভোটের মাধ্যমে এ বিষয়টির সুরাহা করতে হবে। পার্লামেন্টে থেরেসা মের ব্রেক্সিট চুক্তি প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পেছনে গত দু’বছর তার ভুল রাজনৈতিক পথে বিচরণ দায়ী।

২০১৬ সালের গণভোটটি ৫২-৪৮ ভোটে জয়যুক্ত হয়েছিল। অথচ পরাজিত পক্ষের সঙ্গে আলাপ আলোচনা বা পরামর্শ না করে প্রধানমন্ত্রী মে ব্রেক্সিটের এক কঠোর পথ অনুসরণ করতে গিয়ে মুষ্টিমেয় কিছু পরামর্শকের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে অগ্রসর হয়েছিলেন এবং রক্ষণশীল দলকে তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিলেন। ২০১৭ সালে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর একটা ঐকমত্য গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্টতর হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তিনি তা আমলে নেননি। এমনকি পার্লামেন্ট চূড়ান্ত চুক্তির ওপর ভোট দেয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার পরও তিনি এতটুকু বিচ্যুত হননি। পার্লামেন্টের ভোট তিনি বানচাল করার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু পারেননি। ভোটে হেরে গিয়ে তিনি বিরোধী দলের এমপিদের সঙ্গে একত্রে কাজ করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সেটাও এসেছে দীর্ঘ ২ বছর তবে সঙ্কট শুধু দুর্বল নেতৃত্বের ব্যাপার নয়। ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে দুটো গভীরতার সমস্যা উন্মোচিত হয়েছে। একটা হচ্ছে বিশ্বায়িত, পরস্পর সম্পর্কযুক্ত বিশ্বে কোন দেশ নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে যে সমস্যা দেখা দেয় সেটা নিজস্ব নিয়মনীতি ও মান নির্ধারণের অধিকার ফিরিয়ে নিলে ভিন্ন নীতি ও মান অনুসরণকারী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসা করা কঠিন হয়। বাণিজ্য করতে চাইলে শেষ পর্যন্ত অধিকতর শক্তিশালী অংশীদারি নিয়মনীতিই অনুসরণ করতে হয়। সুতরাং ব্রেক্সিটের অর্থ আক্ষরিক অর্থে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেয়া হলেও বাস্তবে এর অর্থ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলা। দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো ব্রেক্সিটের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের একটা জটিল দিক উন্মোচিত হয়েছে। প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ ইতিহাস ব্রিটেনের রয়েছে যেখানে ভোটাররা তাদের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এমপিদের নির্বাচিত করে। ২০১৬ সালের গণভোট ছিল প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের এক বিরলতর দৃষ্টান্ত যেখানে জনগণ একটা নীতিগত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আজকের সঙ্কটের কারণ দুটি পক্ষের পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া। গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের জন্য সুস্পষ্ট ও বৈধ নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

এখন পার্লামেন্টের সদস্যরাও একই রকম সুস্পষ্ট ও বৈধ রায় দিয়েছে যে থেরেসা মের ব্রেক্সিট চুক্তি তাদের নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের স্বার্থের প্রতিফলন নয়। ব্রিটেনের এ বছরের ২৯ মার্চ ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা। ইইউর সঙ্গে চুক্তি হোক আর না হোক এটা একটা আইন। ব্রেক্সিট থামাতে বা বন্ধ রাখতে গেলে যুক্তরাজ্যের আইন পরিবর্তন করতে হবে। ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিস গত ১০ ডিসেম্বর রায় দিতে পারে যে যুক্তরাজ্য ইইউর বাকি ২৭ সদস্যের সম্মতি ছাড়াই ব্রেক্সিট সংক্রান্ত ৫০নং অনুচ্ছেদটি বাতিল করতে পারে এবং প্রচলিত শর্তেই ইইউতে থেকে যেতে পারে। সেটিং হবে নাকি ব্রেক্সিটের শর্ত এমনভাবে নির্ধারিত হবে যাতে জনগণের যথার্থ ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে তার জন্য বেক্সিট ইস্যুতে নতুন করে গণভোট অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

চলমান ডেস্ক

সূত্র : দি ইকোনমিস্ট