২৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ঢাকার ৯৮ শতাংশ হাসপাতাল অগ্নিঝুঁকিতে : ফায়ার ডিজি

ঢাকার ৯৮ শতাংশ হাসপাতাল অগ্নিঝুঁকিতে   :  ফায়ার ডিজি

স্টাফ রিপোর্টার ॥ অগ্নিঝুকি মোকাবেলায় ঢাকা মহানগরীর ৯৮ ভাগ হাসপাতাল ও ক্লিনিকই ঝুকিপূর্ণ বলে দাবী করেছে ফায়ার সার্ভিস কতৃপক্ষ। সংস্থাটির করা এক জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এসব হাসপাতাল বা ক্লিনিকে আগুণ লাগলে ঝুকি মোকাবেলায় করণীয় সম্পর্কে সরকারী বেসরকারী কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিক কতৃপক্ষেরই কোন প্রকার প্রশিক্ষণ নেই।

তাই অগ্নিনির্বাপনে ব্যবহূত সকল প্রকার সরঞ্জাম সঠিক নিয়মে পরিচালনের কৌশল জানতে সরকারের কাছে হাসপাতাল কতৃপক্ষকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করতে ও হাসপাতাল এলাকায় বিশেষায়িত ফায়ার স্টেশন চালুর জন্য জোর দাবী জানিয়েছেন হাসপাতালের মালিক ও পরিচালকরা।

বুধবার রাজধানীর কাজী আলাউদ্দীন রোডে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরে সংস্থাটি কতৃক ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার হাসপাতালসমূহের মালিক, পরিচালক ও তাদের প্রতিনিধিদের সাথে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবী জানানো হয়। হাসপাতাল সমূহের অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে করণীয় শীর্ষক সভায় রাজধানী ও এর আশেপাশের প্রায় ৪ শতাধিক মালিক ও প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

সভায় সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহাম্মেদ খান, পিএসসি (অবঃ),পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) যুগ্ম সচিব মোঃ হাবিবুর রহমান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের উপসচিব আমিনুল ইসলাম সহ বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাগণ এ সময় উপস্থিত ছিলেন। সভায় পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে কি-নোট উপস্থাপন করেন। তিনি বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেণ।

সভায় সংস্থাটির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আলী আহমেদ খান (অব:) বলেন, মূলত হাসপাতালগুলোর আগুনের ৭০ শতাংশই লেগে থাকে বৈদ্যুতিক ত্রুটি থেকে। অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালের ভবনগুলোই অনেক পুরোনো। ওইসব ভবনের বৈদ্যুতিক লাইনগুলোও পুরোনো। এ জন্য বিদ্যুতের ভল্টেজ সামান্য উঠা নামা করলেও অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়ে যায়। হাসপাতালগুলোর অগ্নিঝুঁকি কমাতে সর্বপ্রথম পুরোনো বৈদ্যুতিক লাইনগুলো পরিবর্তন করা দরকার। এরপর হাসপাতাল গুলোতে প্রয়োজনীয় পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি হাসপাতালেই র্যাম্প ও স্পোম ডিটেক্টর স্থাপনের স্থাপনের কথা বলেন।

মহাপরিচালক বলেন, পুরনো হাসাপাতালগুলোর জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে কোনো আপস করা যায় না। হাসপাতাল চালুও রাখতে হবে আবার তা নিরাপদও রাখতে হবে। তিনি জরুরি মুহূর্তে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসার জন্য পজিটিভ প্রেশারে আইসোলেটেড বহির্গমন জরুরি সিঁড়ি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি বলেন, ফায়ার ডোর স্থাপনের মাধ্যমে এ ধরনের ইমার্জেন্সি এক্সিট সংরক্ষণ করতে পারলে জীবনহানির আশঙ্কা কমে যাবে। মহাপরিচালক বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে আগত মালিক-পরিচালকদের মতামত প্রদান ও উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ প্রদান করেন।

ব্রিগেডিয়ার আলী আহমেদ বলেন, হাসপাতালগুলোর অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা একটি স্পর্শকাতর ও উদ্বেগজনক বিষয়। স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে হাসপাতালের দুর্ঘটনায় জীবনহানির আশঙ্কা অনেক বেশি থাকে। কারণ একটি হাসপাতালে যারা অবস্থান করেন তাদের বেশিরভাগই থাকেন রোগী, যাদের পক্ষে অন্যের সাহায্য ছাড়া দুর্ঘটনার সময় বের হয়ে আসা সম্ভব নয়। এ কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য পূর্ব প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।

তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অগ্নি দুর্ঘটনার সম্পর্কে বলেন, ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে আমরা সেখানে একটি মহড়া করেছিলাম। আমরা মনে করি, সেই মহড়ার সুফল হিসেবে সেখানে জীবনহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে আমাদের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন করা হলে হয়তো অগ্নি দুর্ঘটনায় সম্পদের ক্ষতির পরিমাণও সহনীয় পর্যায়ে থাকতো।

সভায় অধিদপ্তরের পরিচালক শাকিল নেওয়াজ বলেন, আমরা হাসপাতালগুলোতে যে সার্ভে কার্যক্রম পরিচালনা করেছি তাতে দেখা যায় ঢাকা মহানগরীর ৪শ ৩৩টি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে ২শ ৪৯টি ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১শ ৭৩টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তবে আমাদের সার্ভেকৃত হাসপাতালের মোট সংখ্যার ৯৮ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। মেজর শাকিল জানান, ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী, ভবনে র্যাম্প ও জরুরি সিঁড়ির অভাব, স্টোরিং গাইডলাইনের অভাব, দক্ষ ফায়ার সেফটি প্রফেশনালের অভাব, ফায়ার ডিটেকশন ও প্রটেকশন সিস্টেম এর অভাব, আর্থিং ব্যবস্থা না থাকা, এলপিএস (লাইটিং প্রটেকশন) সিস্টেম না থাকা, পর্যাপ্ত পানির অভাব, আবাসিক ভবনে হাসপাতাল স্থাপন, ইভাকুয়েশনের জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব ইত্যাদির কারণে হাসপাতালগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এর সাথে যেসব অগ্নিঝুঁকি বিরাজ করে তা হলো অক্সিজেন ও নাইট্রাস অক্সাইড ইত্যাদির ব্যবহার, রান্নাঘর স্থাপন, লন্ড্রি হাউসের অব্যবস্থাপনা, অনিরাপদভাবে বয়লার ব্যবহার, বৈদ্যুতিক স্থাপনা (জেনারেটর, ট্রান্সফর্মার ইত্যাদি), ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন, কার পার্কিং, খোলা বাতির ব্যবহার (মোমবাতি, মশার কয়েল ইত্যাদি), ধূমপান, অপরিকল্পিত স্টোর, দুর্বল হাউজ কিপিং ইত্যাদি।

মেজর শাকিল জানান, ফায়ার সার্ভিস থেকে হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহে সার্ভে পরিচালনা করে ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়, ঝুঁকির উপর ভিত্তি করে তা নিরসণের জন্য সুপারিশমালা প্রণয়ন, অগ্নি দুর্ঘটনা মোকাবেলার জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান, নিয়মিত মহড়া অনুশীলন, অগ্নি দুর্ঘটনা বিষয়ক হাসপাতালে সচেতনামূলক কার্যক্রম অব্যাহত আছে। হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারে সুপারিশমালা তুলে ধরে তিনি বলেন, নিরাপত্তা কমিটি গঠন, ফায়ার রিস্ক এসেসমেন্ট, আপদকালীন কর্মপরিকল্পনা (ফায়ার এন্ড সেফটি প্ল্যান), ফায়ার সেফটি অফিসার এবং ফায়ার ফাইটিং টিম (২৪/৭) সংরক্ষণ, নিয়মিত অগ্নি নির্বাপণের প্রশিক্ষণ ও মহড়া পরিচালনা, ইভাকুয়েশনের জন্য বহির্গমণ পথ সর্বদা বাধামুক্ত ও আলোকিত রাখা, ফায়ার এলার্ম ও ডিটেকশন সিস্টেম স্থাপন, পিএ সিস্টেম সংরক্ষণ, বহনযোগ্য অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র সংরক্ষণ, রিফিউজ এলাকা এবং সেফটি লবি সংরক্ষণ, এসেম্বেলি এরিয়া সংরক্ষণ, ফায়ার পাম্প সিস্টেম সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত পানির রিজার্ভার সংরক্ষণ, স্ট্যান্ডপাইপ সিস্টেম সংরক্ষণ, ফায়ার হোজ এবং ফাস্ট এইড হোজ কানেকশন সংরক্ষণ, ফায়ার ডিপার্টমেন্ট কানেকশন এবং ফায়ার হাইড্রেন্ট সংরক্ষণ, ফায়ার লিফ্ট ও হাসপাতাল লিফ্্ট সংরক্ষণ, ফায়ার কমান্ড স্টেশন স্থাপন করতে গবে।

মতবিনিময় সভায় হাসপাতালের নানা দিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নির্দেশনা ও এক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের সহযোগিতা চেয়ে হাসপাতালেল প্রতিনিধিরা বক্তব্য প্রদান করেন।

মতবিনিময় সভায় হপাসাতালের প্রতিনিধিরা তাদের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন।