১৯ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্মাননায় ছায়ানট

বাঙালী সংস্কৃতি সেবী ও সংস্কৃতিপ্রেমীদের জন্যও সুসংবাদ বৈকি। সে সুবাদে পুরো বাঙালী জাতির জন্য গৌরববহ অবশ্যই। সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ভারতের সম্মানজনক আন্তর্জাতিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পুরস্কার বা ‘টেগোর এ্যাওয়ার্ড ফর কালচারাল হারমনি’ পুরস্কারে সম্মানিত করেছে ভারত সরকার বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’কে। এ গৌরব শুধু একা ছায়ানটের নয়, সমগ্র বাঙালীর এবং বাংলাভাষীজনেরও। কারণ বাঙালী সংস্কৃতির বিকাশ, লালন, বিস্তার এবং প্রতিবাদ-প্রতিরোধে ছায়ানট অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে প্রতিষ্ঠাকাল হতে। বাঙালীর রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল ছায়ানট। মুক্তিযুদ্ধেও তার সাহসী অবদান ছিল। বাঙালীর আশা, বাঙালীর ভাষা, বাঙালীর গান, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যকে ধারণ করে এগিয়ে যাচ্ছে ক্রমান্বয়ে প্রতিষ্ঠাকাল হতে। বাংলাদেশের নন্দিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট অনেক চড়াই-উতরাই, বাধাবিঘœ পেরিয়ে জাতিকে সম্মুখে নিয়েছে এগিয়ে। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন সাহস, সৃষ্টিশীলতা ও অঙ্গীকার পালনের ধারাবাহিকতার ভেতর দিয়ে কীভাবে জাতির জীবনে আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে তার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত ছায়ানট।

কবিগুরুর সার্ধশত জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ভারত সরকার এই আন্তর্জাতিক পুরস্কার চালু করে। একটি বহুমূল্য স্মারক ও ১ কোটি রুপী পুরস্কার সংবলিত এই পুরস্কারের প্রচলন হয় ২০১১ সালে। ২০১২ সালে বিশ্বখ্যাত সেতারশিল্পী রবিশংকরকে দিয়ে এ পুরস্কার প্রদান শুরু হয়। ২০১৫ এর এই সম্মানের জন্য সঙ্গীতজ্ঞ সন্জিদা খাতুনের নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী এই সংগঠনকে সর্বসম্মতভাবে বাছাই করেছে একটি জুরি বোর্ড। যার চেয়ারম্যান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাংলা সংস্কৃতি, সঙ্গীত, সাহিত্য বিশেষ করে রবীন্দ্র সঙ্গীত চর্চাকে বাংলাদেশ ও বিশ্বের দরবারে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ছায়ানটের বিশেষ অবদানকে এই পুরস্কারের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। নয়াদিল্লীর প্রবাসী ভারতীয় কেন্দ্রে আয়োজিত জাঁকালো অনুষ্ঠানে ছায়ানটের সভাপতি সন্জিদা খাতুনের হাতে পুরস্কার তুলে দেন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ। নরেন্দ্র মোদিও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পুরস্কার গ্রহণের পর ছায়ানট সভাপতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেছেন, ছায়ানটকে পুরস্কৃত করার মাধ্যমে ভারত এই সাংস্কৃতিক সংগঠনকে কৃতজ্ঞতার ঋণে আবদ্ধ করেছে। এই সম্মাননা ছায়ানটকে তার প্রগতিশীল কার্যক্রমে আরও অনুপ্রাণিত করবে। বাংলা ১৩৬৮ তথা ইংরেজী ১৯৬১ সালে রবীন্দ্রজন্মশত বর্ষপূর্তির উৎসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে ছায়ানটের আত্মপ্রকাশ। পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আয়োজিত অনুষ্ঠান সংস্কৃতিপ্রাণ বাঙালীর মনে আত্মবিশ্বাস এনে দেয়। তমসাচ্ছন্ন পাকিস্তানী যুগে কঠোর সামরিক শাসনে পদানত স্বদেশে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও রবীন্দ্র ভাবনা অবলম্বন করে ছায়ানট যাত্রা শুরু করে। আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে ওঠার জন্য দেশের মানুষকে আপন সংস্কৃতিতে সুপ্রতিষ্ঠিত করা, দেশীয় বৈশিষ্ট্য ও স্বাধীন সত্তা বিকাশে পারঙ্গম হওয়ার জন্য বাঙালীকে যথার্থ শিক্ষায় সমৃদ্ধ করে তোলা, শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সম্পৃক্তি নিশ্চিত করে পূর্ণ মানব গড়ে তোলার লক্ষ্যে সংস্কৃতি সমন্বিত শিক্ষার বিকাশ ঘটানো, সংস্কৃতি সাধনা ও চর্চার যথোচিত প্রয়াস এবং বিকাশের মাধ্যমে মানবপ্রীতি ও বিশ্বমানবতার অভিমুখী হওয়ার উদ্দেশ্যে ছায়ানটের কার্যক্রম পরিচালনা করা। প্রথম দিকে রবীন্দ্র সঙ্গীত ও সাহিত্যচর্চায় ব্রতী থাকলেও কালে কালে সংগঠনটি হয়ে ওঠে বাঙালিত্বের চেতনা ও স্বপ্নলালনকারী এক উজ্জীবনী অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। বাংলা নববর্ষ বরণে নতুন বছরের প্রথম সূর্যোদয়ের মুহূর্তে রমনার বটমূলে ছায়ানটের আকর্ষণীয় আয়োজন এখন ঐতিহ্যে পরিণত, যা অর্ধশতক পেরিয়েছে। বাঙালীর জন্য যা আশা জাগানিয়া মাহেন্দ্রক্ষণ। সাংস্কৃতিক বিকৃতি ও সংস্কৃতিহীনতা প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে ছায়ানট বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। রমনায় ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক অপশক্তির নৃশংস আঘাত হানার বিষয়টি বাঙালী স্মরণে রাখবে চিরকাল। এখনও সেই অপশক্তি সক্রিয়। ছায়ানটের মতো হৃদয় সংবেদী বুদ্ধিদীপ্ত সংগঠন বাঙালীর প্রয়োজন। নতুন দিনের আশাবাদ জাগাবে এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শক্তির জোগান দেবে। সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রাপ্তিতে ছায়ানটকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।