১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উর্বশী প্রিয়ংবদা

  • নিমাই সরকার

বঙ্গবন্ধুর বৃহৎ এ প্রতিকৃতিটি দেখার জন্য বুড়িমা ছুটে এসেছেন রাজশাহী থেকে।

সঙ্গে তাঁর হাতের লাঠি নির্মলা। নিজেই বলেন, সেবাশ্রম এখন ওরই হাতে। ও না হলে যে চলে না!

এই যেমন আজকে ঢাকা আসা, সেও ওকে ধরে।

তারা যথা সময়ে বাসে চেপেছেন। নেমেছেন গাবতলী। তারপর চলে এসেছেন মিলন চত্বর।

মুখে দাড়ি, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ এক তরুণের। বুড়িমা কিভাবে বুঝে ফেলেন এরা এখানকারই ছেলে।

এত বড় ছবি করেছো? বিস্ময় তাঁর মুখে।

আয়োজনটা বেশ বড়। চারুকলা থেকে করেছি আমরা।

হ্যাঁ, বিশালকা-! কাজের ছেলে বলতে হয়! বুড়িমা তরুণকে কাছে টানেন।

৬৩ ক্যানভাস, ১৫০ শিল্পী আমরা এঁকেছি প্রতিকৃতিটি। শিল্পী বুঝি ছবির ভক্ত পেয়ে যান।

৪৩ ফুট উচ্চতা, ৩৫ ফুট প্রস্থ। তরুণ ব্যাখ্যা দেন। আমরা এমন গণচরিত্রের একটা কিছু করতে চেয়েছিলাম।

বঙ্গবন্ধু আকাশ সমান। মনে মনে কথাগুলো পড়েন বুড়িমা।

একপাশে আরো একটু সরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলেন, অসাধারণ একটি কাজ করলে বাবা!

নির্মলা খেয়াল রাখছেন মাসিমার দিকে। বুড়িমাকে নির্মলা মাসি বলে ডাকেন। বয়স কম হলো না। এজন্য তরুণীর বেখেয়ালি হওয়ার সুযোগ নেই। তাই তো সর্বক্ষণ তাঁর সাথে থাকেন। সঙ্গ দেন। এ বেলায় বলেন, বড়মাপের মানুষের জন্য এমন একটি আয়োজনেরই প্রয়োজন ছিল।

এ্যাক্রিলিক রঙের এ প্রতিকৃতিটি আঁকার মধ্যদিয়ে শিল্পীদের আবেগ কাজ করেছে। শ্রদ্ধার আবেগ তাঁর বুড়িমার ওপরও।

তা ঠিক! দুইবার বলেন বুড়ি মা।

আজ অনন্য একটা দিন। আজকে বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চেয়েছিলেন। আসতে পারেননি।

তরুণটি পাশ ফিরে দাঁড়ান।

বড় ভক্তি তোমাদের। বুড়িমা অভিভূত হন।

শিল্পী প্রতিকৃতি ধরে তাঁদের ছবি তুলতে যান।

বসে কথা বলি, ছবি পরে হবে। শিল্পীর সাথে বুড়িমার কথা শেষ হয় না।

বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা থাকলে এমন বড় ছবি আঁকা সম্ভব। তিনি বলে যান আর ভাবেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন অবরুদ্ধ। এখানে বন্দি ছিলেন উর্বশী। ৩০ জন মেয়ের সঙ্গে তাকেও তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। সার্বক্ষণিক প্রহরায় থাকতো দুইজন সশস্ত্র গার্ড। তাঁরা ছিলেন সামরিক অফিসারদের ছাউনির কাছাকাছি। সেখানে প্রতি সন্ধ্যায় ৪-৫ জনকে নিয়ে যাওয়া হতো। আর ফিরিয়ে আনা হতো ভোর বেলায়। প্রতিবাদ করলে রীতিমতো প্রহার চলতো।

পাকসেনারা কাউকে ছেড়ে দেয়নি। তারা মেয়েদের গায়ের মাংস কামড়াতে কামড়াতে রক্তাক্ত করে দেয়। কোনো মেয়ের ঠোঁটের মাংস ছিঁড়ে নেয়। আবার কোনো মেয়ের আঙুল ভেঙে থেঁতলে দেয় লাঠি আর রডের পিটুনিতে। অত্যাচারে মেয়েদের পেট, ঘাড় এমনকি কোমর পর্যন্ত অক্ষত থাকেনি। গার্ড ওইদিন ভোরে রাইফেলের বাটের ওপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছিলো। অন্যজনও কোনো এক কারণে দ্বিতীয় গেটটি খুলতে যায়। এই ফাঁকে চলে এসেছিলেন উর্বশী। দৌড়, ভোঁদৌড়। তারপর আর পেছনে তাকাননি।

সেদিনের সেই উর্বশী আজকের বুড়িমা। তিনি কিছুদিন চাকরি করলেও তাড়াতাড়ি চলে আসেন উদ্যোগী ভূমিকায়। খুলেছিলেন এনজিও। তারপর আন্তর্জাতিক যোগাযোগে আকাশ বাংলা সেবাশ্রম। বঙ্গবন্ধুরই দেয়া নাম। ব্রাত্যরা তাঁর এখানে সেবা পান। তাদের তিনি নিজের সন্তান ভাবেন। বুড়িমার আলাদা দলÑ আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন, দেবতার বন্দিশালায় আমার নৈবেদ্য পৌঁছল না। পূজারী হাসি মুখে মন্দির থেকে বের হয়ে আসেন, বলেন, দেখে এলাম দেব তাকে!

ব্রাত্য নিগৃহীত সমাজে। নিম্নবর্গীয় বলে ওদের দূরে রাখার চেষ্টা সব সময়। কিন্তু তিনি তাঁদের কোলে তুলে নেন। তারা তাঁর ভালোবাসায় সিক্ত। কঠোর তাঁর বিশ্বাস। ব্রাত্য বৈদিক-কার্যে অধিকারী, ব্রাত্য মহানুভব, ব্রাত্য দেবপ্রিয়, ব্রাত্য ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় প্রভৃতির পূজ্য। অধিক্ক থাকি, ব্রাত্য স্বয়ং দেবাধিদেব। ব্রাত্য যেখানে গমন করে, বিশ্বজগৎ এবং বিশ্ব দেবগণও সেখানে অনুগমন করে। ব্রাত্য যেখানে অবস্থান করে, বিশ্ব দেবগণ সেই স্থানে অবস্থান করে। ব্রাত্যরাজা।

ছবি তুলছি, একটু দাঁড়ান! তরুণ ক্যামেরা ফোকাস করেন।

বড় ক্লান্ত আমরা বাবা! বুড়িমা নির্মলার হাত ধরে একটু ঠিক হয়ে বসেন।

এতদূর থেকে এখানে এলেন কেন?

এত বড় তোমাদের উদ্যোগ! আর আমরা আসবো না?

না বলছিলাম যে, এই চিত্রকর্ম নিয়ে আমরা সারাদেশ ঘুরবো। যার যার জায়গা থেকেই দেখতে পাবে বঙ্গবন্ধুর এই প্রতিকৃতি। ক্লিক চলতে থাকে।

এত দেরি কি আর সয়! বুড়িমা বলেন না কিন্তু তাঁর অবয়বে সে কথা স্পষ্ট।

উর্বশী সেবার ইংরেজিতে মাস্টার্স দিয়েছিলেন। রেজাল্টের পর একটা চাকরি করবেন। সেটাও বন্দোবস্ত হয়ে গিয়ে ছিলো। কিন্তু এরই মধ্যে নেমে এলো যুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে শামিল হলো দেশের ছেলেরা। আর উর্বশী ধরা পড়লেন সেই মার্চেই।

দৌড়ে ছুটে এলেন গ্রামে। না, গ্রাম তাকে নিলো না।

এ বাড়িতে তোমার জায়গা নেই। উর্বশী বলে একদিন কেউ ছিল। আজ সে মৃত। বাবা বলে দেন।

মায়ের চোখে জল। তাঁর কিছু করার নেই। তরুণীকে দেখে ছোট ভাই বলে, ও আবার কেন? উর্বশী বেরিয়ে আসেন। আবার দৌড়।

দিশা পান না উর্বশী। অলি গলি এখন অচেনা তাঁর। ছোটেন অমিতের কাছে। তরুণীর কথা সবাই জানে। অমিত বলে, আমার উর্বশী স্বর্গের কন্যা। সে তুমি নও। তাহলে আমি... এই আমিকে, জিজ্ঞেস করতে ছাড়েননি। কিন্তু তাতে লাভ হয় না।

উর্বশীর জায়গা নেই কোথাও।

ইন্দ্রলোকে থাকাকালীন অপ্সরা উর্বশী অর্জুনকে প্রেমের প্রস্তাব দেন। কিন্তু পান্ডব তাঁকে মা বলে সম্বোধন করেন। প্রত্যাখ্যাতা উর্বশী অর্জুন কেন পুংসক হবার অভিশাপ দেন। এখানে এই রাজশাহীর মতিহার নামক জায়গাটিকে এই উর্বশী মিথ্যার ভূমি বানাতে চান না। এখানে এই সেই কৃষ্ণচূড়া, যার তলে দাঁড়িয়ে, চোখে চোখ, হাতে হাত, কথা যেত হারিয়ে...। অমিত তার ধর্ম নষ্ট করতে পারে, আমিনা। উর্বশী ছোটেন।

স্বর্গে এই ঘটনার কথা জানতে পারেন দেবরাজ ইন্দ্র। উর্বশীর অভিশাপটিকে আশীর্বাদে রূপান্তরিত করেন তিনি। বলেন, এটি তাকে এক বছর অজ্ঞাতবাসে থাকাকালীন সাহায্য করবে। মর্ত্যরে উর্বশী কোনো অভিসম্পাতও করতে চান না। আর ইন্দ্রকেও দিতে চান না অন্যায় কিছু করার সুযোগ। তাঁর বিশ্বাস, আজকের ইন্দ্র হবে সত্যের পক্ষে। শ্বাসরুদ্ধ তরুণী দেরি করেন না।

কে কে তুমি?

আমি উর্বশী। আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে চাই।

বঙ্গবন্ধুর সাথে যখন তখন যে কেউ দেখা করতে পারে না।

তা জানি তবে আমি পারবো।

বেশি কথা শিখেছো দেখছি। এই মেয়ে! সেক্রেটারির ধমক!

বঙ্গবন্ধু ভেতর থেকে শুনেছেন। কেরে, কে এসেছে?

আর কোনো কথা নেই। নিশ্চুপ, নিথর চরাচর।

তার পর তিনি নিজেই এলেন। পরনে লুঙ্গি, গায়ে আটপৌরে পাতলা এক পাঞ্জাবি। হাতে তাঁর প্রাণপ্রিয় পাইপ।

আয় আমার কাছে আয়। বঙ্গবন্ধু তরুণীকে ভেতরে নিয়ে যান।

কিছুক্ষণ পর একটা কার্ড আসে তাঁর হাতে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সেক্রেটারিই বানিয়ে দেন সেটি। সেখানে লেখা উর্বশী প্রিয়ংবদা, পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।

সাতান্ন বর্ষের উর্বশীর সামনে এখন সেই মুহূর্তটিই ভেসে ওঠে। তিনি প্রতিকৃতির সামনে বসে থাকেন। নির্মলাকে বলেন, তুই যা এখন! ঘুরে আয়! আমাকে এখানেই পাবি। কী মনে করে আবার গাঝাড়া দিয়ে উঠে বলেন, নারে দেরি করা যাবে না। রাজারা যে আজ সেবা থেকে বঞ্চিত হবে!

প্রতিকৃতির দিকে তাকিয়ে বলেন, ব্রাত্যরা ভূমি পুত্র, ওরাই আসল। পিতা উর্বশী প্রিয়ংবদাকে এই মন্ত্রটিই দিয়েছিলেন। পা টিপে নির্মলার কাঁধে ভর করে তিনি আস্তে আস্তে এগোন।