১৯ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে

নগরজীবনের নান্দনিক স্থাপত্য ঢাকা পড়ে যায় বলে বাংলা ভাষার কবি শঙ্খ ঘোষ আক্ষেপ করে লিখেছিলেন- ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’। শুধু নগরজীবন নয়, সড়ক, মহাসড়ক, জেলা, উপজেলা সদরজুড়ে বিজ্ঞাপন আর বিলবোর্ডের বাহার ক্রমশ বাড়ছে। বাস্তবিকই রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বিভাগীয় ও জেলা শহর যেন ছেয়ে আছে অসংখ্য এবং অগণিত বিলবোর্ড, ব্যানার, ফেস্টুন, তোরণ ও নানা রঙের মনোলোভা এবং চিত্তহরণকারী বিজ্ঞাপনে। আজকাল আবার নিয়ন সাইন ও আলো ঝলমলে বিলবোর্ড এবং বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি অবলীলাক্রমে জায়গা করে নিয়েছে হরেকরকম হিলিয়াম বেলুন, বিশাল বিশাল টিভি স্ক্রিন। সর্বোপরি সুবিশাল এই টিভি মনিটরে সার্বক্ষণিক স্ক্রল ভিডিও চিত্রের প্রচার। সত্য বলতে কি, মাথা খারাপ হয়ে যাওয়ার যোগাড় যেন। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষই যখন এর আধিক্য ও প্রাবল্যে অতিষ্ঠপ্রায়, তখন যানবাহন চালকদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। প্রতিনিয়ত সড়ক দুর্ঘটনার যে অন্যতম একটি কারণ এসব বিলবোর্ড ও বিজ্ঞাপন এ কথা অস্বীকার করা যাবে না। ঢাকার আশপাশসহ শহরতলী এবং বিশেষ করে হাইওয়েগুলোতে এর লাগামহীন আধিপত্য লক্ষণীয়। এমনিতেই ঢাকাসহ সারাদেশের সড়কপথ জনসংখ্যা ও যানবাহনের তুলনায় অর্ধেক। বিধি অনুযায়ী জনসংখ্যার চাহিদা অনুপাতে রাস্তাঘাটের অনুপাত পঁচিশ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। দেশে সেই অনুপাতে আছে মাত্র ৮-১০ শতাংশ। এর একটি বড় অংশ দখল করে আছে অবৈধ স্থাপনা, বিলবোর্ড ও বিজ্ঞাপন; যেগুলোর অধিকাংশই অবৈধ ও অননুমোদিত।

খোদ রাজধানীর নান্দনিক সৌন্দর্য বিনষ্টে অবদান রাখছে দেয়ালজুড়ে বিজ্ঞাপন। বাড়ি ভাড়া, ছাত্র পড়াতে চাই, কোচিং সেন্টারে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি ইত্যাদির পাশাপাশি হেন কোন পণ্যের খবর নেই যা দেয়ালে স্থান পায়নি। প্যাকেটজাত খাবার, দাঁতের চিকিৎসা, যৌন চিকিৎসা, হোমিও চিকিৎসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইলেক্ট্রনিক পণ্য থেকে শুরু করে পত্রিকার বিজ্ঞাপনও আছে দেয়ালজুড়ে। বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য এর বিকল্প যেন কোন মাধ্যম নেই। আরও মিলবে চলচ্চিত্রের শ্লীল নয় এমন পোস্টার কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জরুরী ভিত্তিতে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি, উরস মাহফিল, ওয়াজ মাহফিলের আমন্ত্রণ, রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নানা পালা-পার্বণে শুভেচ্ছা জানানো ইত্যাকার বিষয়ের পোস্টার।

বিশ্বের সব উন্নত দেশের নগরে সৌন্দর্য বর্ধন ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়মিত বিষয়। নগরীর সৌন্দর্য রক্ষায় খেয়াল-খুশিমতো দেয়াল লিখন বা পোস্টার সাঁটানো নিষিদ্ধ। ২০১২ সালের ১৮ মার্চ হাইকোর্ট এক আদেশে অননুমোদিত পোস্টার, ব্যানার ও তোরণ অপসারণের নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি রুলও জারি করে। নির্দেশানুযায়ী সিটি কর্পোরেশন তাদের নির্দিষ্ট বোর্ডের বাইরে পোস্টার লাগালে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা ঘোষণা করলেও তা ঘোষণাতেই থেকে গেছে। ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো নিয়ন্ত্রণ আইন করা হয়, যাতে নির্ধারিত স্থান ছাড়া অন্যত্র পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ। আইন ভঙ্গকারীকে কমপক্ষে দশ হাজার টাকা এবং অনুর্ধ ৫০ হাজার টাকা অর্থদ-, অনাদায়ে অনধিক ৩০ দিন বিনাশ্রমে কারাদ-ের আওতায় আনা হয়েছে। এছাড়া নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট দেয়াল লিখন ও পোস্টার মুছে ফেলার বা অপসারণের জন্য নির্দেশও রয়েছে।

আইন মানার জন্য জনগণকে আহ্বান জানানো যেমন জরুরী, তেমনি আধিক্য ও দৃষ্টিকটু বিজ্ঞাপন পরিহার করে অন্যদিকে দৃষ্টিনন্দন বিলবোর্ড স্থাপন করা যেতে পারে। নগরীর সৌন্দর্যই শুধু নয়, সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাসে অবিলম্বে এ বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা অবশ্য কর্তব্য হওয়া উচিত।