১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রসঙ্গ ইসলাম ॥ রসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সময়ে ইসলাম প্রচার

  • অধ্যাপক হাসান আবদুল কাইয়ূম

(গত শুক্রবারের পর)

একজন জিজ্ঞেস করলেন : আপনার কথা মতো ওই কাজগুলো করলে আমাদের কি লাভ? প্রিয় নবী (সা) বললেন : জান্নাত। অর্থাৎ তিনি বোঝালেন যে, তোমরা ওইগুলো যথাযথভাবে পালন করলে জান্নাতপ্রাপ্ত হবে। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলায়হি ওয়া সাল্লামের কথা শুনে তাঁরা সবাই ইসলাম গ্রহণ করলেন। ইশা’আতে ইসলামের জন্য, ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার জন্য কি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে সে সম্পর্কে আল্লাহ জাল্লা শানুহু নির্দেশ দান করেছেন। ইরশাদ হয়েছে : তোমার রবের পথে আহ্বান কর হিকমতের সঙ্গে এবং সুন্দর সুন্দর উপদেশ দ্বারা আর ওদের সঙ্গে আলোচনা কর সদ্ভাবে আলোচনার মাধ্যমে। (সূরা নাহল : আয়াত ১২৫)

এখানে লক্ষ্য করা যায়, আল্লাহর পথের দিকে মানুষকে আহ্বান করার তিনটি পন্থা অবলম্বনের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর তা হচ্ছে : হিকমত, সদুপদেশ ও সদ্ভাবে আলোচনা। ইসলামের উপস্থাপন পদ্ধতির এই তিনটি মাধ্যম অনুসরণ করার রীতি আমরা প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের কাল থেকেই দেখে আসছি। প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন সাম্রাজ্যের সম্রাটদের কাছে, বিধর্মী শাসনকর্তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত সংবলিত যে সমস্ত পত্র দিয়েছিলেন, সে সব পত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে হিকমত সদুপদেশ ও সদ্ভাব প্রস্ফুটিত হয়ে উঠেছে। সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরিত চিঠিতে বলা হয়, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। প্রেরক : মুহম্মদ, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল। প্রাপক : হিরাকল, মহান রোম সম্রাট। সালাম বর্ষিত হোক তাদের ওপর, যারা সত্য পথের অনুসারী।

অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি, ইসলাম গ্রহণ করে নিন, নিরাপত্তাপ্রাপ্ত হবেন। আল্লাহ্্ আপনাকে দ্বিগুণ পারিশ্রমিক প্রদান করবেন। আপনি যদি অগ্রাহ্য করেন তাহলে আপনার প্রজাকুলের পাপ আপনার ওপরই বর্তাবে।

হে আহলে কিতাব, এসো আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একটি ঐকমত্য হয়ে যাক যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া কারও ইবাদত করব না, তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করব না এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেউ কাউকে রব বলে গ্রহণ করব না। আর যদি তারা একান্তই মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলে দাও, তোমরা সাক্ষী থেক আমরা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেছি- আমরা মুসলিম।

এই একটি মাত্র চিঠির কথাগুলোর মধ্যে ইসলামের দিকে আহ্বান করার যে পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, তাতে হিকমত, সৎ উপদেশ ও সদ্ভাবে আলোচনা আবেদন সবই লক্ষ্য করা যায়। এতে আরও লক্ষ্য করা যায়, প্রেরকের নাম ও পরিচয় এবং প্রাপকের নাম ও পরিচয় প্রথমে প্রদত্ত হয়েছে। চিঠি লেখার এ রেওয়াজও প্রিয় নবী (সা) প্রবর্তন করেন।

হিদায়েত শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক অর্থ বহন করে। হিদায়েত হচ্ছে সত্য পথ। হিদায়েতপ্রাপ্তির মাধ্যমে আল্লাহু তা’আলার রিয়ামন্দি ও নৈকট্য হাসিল করা সম্ভব হয়, দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সাধিত হয়। আমরা সূরা ফাতিহা তিলাওয়াতের মাধ্যমে আল্লাহর মহান দরবারে এই আরজি পেশ করি- আমাদের সরল পথ প্রদর্শন কর, তাদের পথ, যাদের তুমি নিয়ামত দান করছ। তাদের পথ নয়, যাদের প্রতি গজব নিপতিত হয়েছে এবং যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, আল্লাহর নিয়ামত প্রাপ্তগণের সর্বোচ্চ মকাম হচ্ছে আম্বিয়ায়ে কেরামের। তার পর নবীগণের। উম্মতগণের মধ্যে রয়েছেন সিদ্দিকগণ, শহীদগণ ও সালেহ্্গণ। কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে :

তারাই ওই সকল পুণ্যাত্মা, যাদের মহান আল্লাহ নিয়ামত ম-িত করেছেন, তারা হচ্ছেন নবীগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদগণ ও সালেহীন (সূরা নিসা : আয়াত ৬৯)।

সিদ্দিকগণের ও সালেহীনের অন্তর্গত হচ্ছেন সাহাবায়ে কেরাম, আওলিয়ায়ে কেরাম ও মুত্তাকি দীনদারগণ। আর যাঁরা আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে জান কোরবান করে দেন, তারাই শহীদ। ইশা’আতে ইসলামের কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী তিনটি পদ্ধতির নানা মাধ্যমে প্রয়োগ হয়ে আসছে যেমন : কলমের মাধ্যমে, ওয়াজের মাধ্যমে, বাহাসের মাধ্যমে, খিদ্্মতের মাধ্যমে, তালিমের মাধ্যমে। ইশা’আতে ইসলামের পাশাপাশি খিদ্্মতে খাল্্ক সমান গুরুত্ব দিয়ে চালু হয়েছে।

কুরআন মজিদে ইরশাদ হয়েছে : হে মুমিনগণ তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে দোজখের আগুন থেকে রক্ষা কর। (সূরা তাহরীম : আয়াত ৬)।

ইশা’আতে ইসলাম নিজের গৃহ থেকেই সূচিত করতে হবে, এটি এই আয়াত দ্বারা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, প্রিয় নবী (সা.)-এর নবুওয়াত লাভের পর পরই প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন হযরত খাদীজাতুল কুবরা রাদিআল্লাহু তা’আলা আনহা, হযরত আলী (রা.) এবং হযরত যায়দ বিন হারিসা (রা.)। এরা ছিলেন তাঁর পরিবার পরিজনের অন্তর্গত। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের যে নির্দেশ আল্লাহ তা’আলা প্রদান করেছিলেন তাতে ছিল নিকটতম আত্মীয়স্বজনের কথা। সূরা তাহরীমের ৬ নম্বর আয়াতখানি সম্পর্কে হযরত উমর রাদিআল্লাহ্্ তা’আলা আনহু প্রিয় নবী (সা.)-এর নিকট আরজ করেছিলেন : ইয়া রসূলুল্লাহ নিজেদের দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করার বিষয়টি বোধগম্য হয়, কিন্তু পরিবার-পরিজনকে কিভাবে দোযখের আগুন থেকে বাঁচাব? এ কথা শুনে প্রিয়নবী (সা) বলেছিলেন : আল্লাহ তা’আলা যে সব কাজ করতে নিষেধ করেছেন এবং যেসব কাজ করতে আদেশ করেছেন, সে সব কাজ করতে আদেশ করবে।

প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা) ইশা’আতে ইসলামের যে পদ্ধতি স্থাপন করেন তা আল্লাহ্্ কর্তৃক প্রত্যাদিষ্ট। তিনি শিক্ষিত সাহাবায়ে কেরামকে বিভিন্ন জনপদে প্রেরণ করেন।

ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তাঁকে ভীষণ বাধা-বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। দেশ ত্যাগ করতে হয়েছে, দান্দান শহীদ হয়েছে, কত সাহাবী শহীদ হয়েছেন, অনেকগুলো যুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়েছে, অতঃপর মক্কা বিজয় হয়েছে, ঘোষিত হয়েছে : সত্য এসেছে মিথ্যা দূর হয়েছে, মিথ্যা দূর হবারই।

৬২৮ খিস্টাব্দের হুদায়বিয়ার সন্ধি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে শান্তির হাওয়া প্রবাহিত হয় আরব ভূখ-ে। সেই সময় দলে দলে লোক তাঁর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা) ও হযরত আমর ইবনুল আস (রা) এই সময়েই ইসলাম গ্রহণ করেন। এই সময় তার নির্দেশে সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্য থেকে বহু সাহাবী বিভিন্ন দেশে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যান। জানা যায়, কোন কোন সাহাবী চীন, সুমাত্রা অঞ্চলে আরব বণিকদের নৌজাহাজে করে যাওয়ার পথে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরে সফর বিরতি করে এখানে কিছুকাল ইসলাম প্রচার করেন।

প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজের ভাষণের শেষ পর্যায়ে সকলের উদ্দেশে বলেন : যারা এখানে উপস্থিত আছ তারা শোনো এবং যারা উপস্থিত নেই তাদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিও। সেই নির্দেশের পথ ধরে ইসলাম প্রচারের গতিধারা অব্যাহত রয়েছে। আজ সমগ্র বিশ্বের জনগোষ্ঠীর প্রায় এক-চতুর্থাংশ মুসলিম। তারা সবাই উচ্চারণ করেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ। (সমাপ্ত)

লেখক : পীর সাহেব, দ্বারিয়াপুর শরীফ