১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আবার লাশের মিছিল

আবার লাশের মিছিল
  • চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে প্রাণ গেল ৬৭ জনের

গাফফার খান চৌধুরী ॥ নিমতলীর পর ভয়াবহ চকবাজার ট্র্যাজেডি আবার দেশ-বিদেশকে শোকে ভাসিয়ে গেল। একটি গাড়ির ধাক্কায় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পাশে থাকা কেমিক্যালের গুদামে আগুন লেগে যায়। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়া সেই ভয়াবহ আগুনে নারী, শিশু বৃদ্ধসহ নানা বয়সী ৬৭ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়ে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দগ্ধ হয় ৪১ জন। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট সোয়া চার ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দগ্ধদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। লাশগুলো উদ্ধার করে যখন মসজিদের সামনে রাখা হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল সারি সারি লাশের মিছিল।

নিহতদের মধ্যে যাদের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে সরকারের তরফ থেকে এক লাখ টাকা করে অনুদান দেয়া হয়েছে। পুরনো ঢাকায় কোন কেমিক্যালের গুদাম থাকবে না বলে সরকার ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তরফ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস ও সরকারের তরফ থেকে পৃথক পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির রিপোর্টের পরেই পুরনো ঢাকায় কেমিক্যালের গুদাম সরানোর জন্য অভিযান শুরু হবে। পুরো চকবাজারসহ আশপাশের এলাকায় বিদ্যুত ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ রয়েছে। সেখানকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ চরমে। পুরো এলাকায় ভুতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে। পুড়ে যাওয়া ভবন চারটি বসবাসের উপযুক্ত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে সিআইডি ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআই। এ ঘটনায় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের তরফ থেকে শোক জানানো হয়েছে।

যেভাবে অগ্নিকা-ের সূত্রপাত ॥ প্রত্যক্ষদর্শী যুবক ফয়েজ আহমেদ ঘটনার বর্ণনা দেন। তিনি চুড়িহাট্টা শাহী মসজিদের সামনের বাম দিকের যে দুটি বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনা ঘটে, তার একটি বাড়ি সংলগ্ন বাড়ির দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা। বলছিলেন, বুধবার তখন রাত পৌনে এগারোটার মতো বাজে। তিনি দোকান থেকে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন। চুড়িহাট্টা মোড়ে প্রচ- যানজট। প্রায় সব দিনই এমন যানজট থাকে। অন্য দিনের মতো ব্যস্ত রাজধানীর চকবাজার থানাধীন নন্দ কুমার রোডের চুড়িহাট্টা মোড়। প্রচ- যানজটে আটকে আছে প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, সবজি বিক্রির ভ্যান, রিক্সা, মোটরসাইকেল, পিকআপ ভ্যানসহ অন্য গাড়ি। আচমকা একটি পিকআপ একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোবাসে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। আগুন সামনে গ্যাস সিলিন্ডারসহ দাঁড় করিয়ে রাখা একটি পিকআপে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তাপে পিকআপে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার একের পর এক বিস্ফোরিত হতে থাকে। পর পর অন্তত ২০/২৫টি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পুরো এলাকায় আগুন ধরে যায়।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আরও কারণ হচ্ছে, সেখানে রাস্তার দুই দিকেই দুটি বড় বড় হোটেল ছিল। হোটেল দুটিতে বড় বড় একাধিক গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে চুলা জ্বালানো হতো। আগুন সেই গ্যাস সিলিন্ডারে লেগে গেলে সেগুলোও বিস্ফোরিত হয়। এছাড়া যে পিকআপটি গ্যাস সিলিন্ডার দিয়ে ভরা ছিল, সেটি ছিল ৬৬ নম্বর বাড়ির খুবই কাছাকাছি। আর ওই বাড়ির নিচতলায় ছিল কেমিক্যালের গুদাম। আর পিকআপটির উপরেই ছিল বিদ্যুতের ট্রান্সফর্মার। ট্রান্সফর্মারে আগুন লাগার পর তা বিস্ফোরিত হয়। বিস্ফোরিত হয়ে আশপাশে থাকা মোট চারটি বাড়িতে আগুন লেগে যায়।

বাড়িগুলোতে বডি স্প্রে ও অন্য কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি প্রসাধনী সামগ্রীর কারখানা ছিল। আর তাতেই দ্রুত আগুন ধরে যায়। আগুন এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, যানজটে থাকা গাড়ির ভেতর থেকে অনেকেই বের হতে পারেননি। আগুন গাড়িগুলোর উপরে পড়লে গাড়িতে থাকা তেল, গ্যাসে ধরে তা আরও দ্বিগুণ হয়ে জ্বলতে থাকে। মুহূর্তেই আগুন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

বাড়িগুলো যেন কঙ্কাল ॥ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর সেখানে থাকা ৬৬ নম্বর কোনার চারতলা বাড়িটিতে মারাত্মকভাবে আগুন লেগে যায়। কারণ বাড়িটির নিচতলায় কেমিক্যালের গুদাম ছিল। বাড়ির মালিক জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান হাজী ওয়াহেদ মিয়া। ওয়াহেদ ম্যানশন বাড়িটির দ্বিতীয় তলা থেকে চতুর্থ তলা পর্যন্ত প্রতিটি ফ্লোরে চারটি করে ফ্ল্যাট। সব মিলিয়ে ১৪টি ফ্ল্যাটে অন্তত ২০টি পরিবারের বসবাস ছিল। আর প্রতিটি ফ্ল্যাটেই ছোট ছোট বডি স্প্রে বা কসমেটিক্সের গুদাম ছিল। বাড়ি থেকে বের হতে পারেনি। আর বাড়ি থেকে বের হয়েই বা যাবে কোথায়? কারণ সামনের রাস্তায় ও পাশের রাস্তায় কেমিক্যালের আগুন জ্বলছে। আর প্লাস্টিকের দানায় আগুন লেগে তা আঠালো হয়ে পুরো রাস্তায় লেপটে আছে। যেই লাভায় পা রাখছে, তিনিই আটকে যাচ্ছেন। যে কারণে রাস্তায় যানজটে থাকা লোকজনগুলো আর সরতে পারেনি। যে যে অবস্থায় ছিল, সে সেই অবস্থায়ই মারা গেছে। সবচেয়ে বেশি লোক মারা গেছে ৬৬ নম্বর বাড়িতেই। ওই বাড়ির কোন লোকই বের হতে পারেনি। আর রাস্তায় যারা যানজটে পড়ে গাড়ির ভেতরে ছিল, তাদের প্রায় সবারই মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। আগুন এতটাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে যে, ন্যূনতম কোন প্রকার সুযোগই পাননি তারা।

বাড়িটি লাগোয়া পূর্বদিকে ৬৫ নম্বর ছয়তলা বাড়িটি। ৬৬ নম্বর বাড়ি থেকে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের ৬৫ নম্বর বাড়িটিতে। আগুন পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। আগুন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির বাসিন্দারা নেমে যেতে সক্ষম হন। শুধু নিচতলায় থাকা রাজমহল হোটেল এ্যান্ড রেস্টুরেন্টটির এক ফুট সাইনবোর্ড টিকে আছে। বাকি সব পুড়ে গেছে। বাড়ি মালিক তিন ভাই বাবুল, মতিন ও আজম। বাড়িটির ভেতরে কোন লোকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

৬৫ ও ৬৬ নম্বর বাড়ির মুখোমুখি রাস্তার অপরদিকে থাকা বাড়ি দুটিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। কারণ বাড়িগুলো মুখোমুখি থাকায় তাদের মধ্যে দূরত্ব ছিল মাত্র ১৫ ফুটের মতো। মুখোমুখি থাকা চুড়িহাট্টা মোড়ের কর্নারের উত্তর দিকের রাজ্জাক ম্যানশন নামের তিন তলা বাড়িটিতে দ্রুততার সঙ্গে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তার সঙ্গে লাগোয়া থাকা পাশের পাঁচ তলা বাড়িটিতেও প্রায় একই সময়ে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ততক্ষণে এ বাড়ি দুইটির সব মানুষজন নিচে নেমে যান। ফলে বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কেউ মারা যায়নি। এ দুইটি বাড়ির মধ্যে রাজ্জাক ম্যানশন মারাত্মকভাবে পুড়ে গেছে। বাড়িটির সামনের অংশ ধসে পড়েছে। পুরো বাড়িটি দেখলে মনে হয়, যেন কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। সিমেন্টের আস্তরণ খসে পড়েছে। যেন যে কোন সময়, বাড়িটি পড়ে যাবে। একই অবস্থা ৬৬ নম্বর বাড়ির। বাড়িগুলোর ভবনের টেম্পার না থাকার কারণে এমন জীর্ণ দশা হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য।

ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি নির্বাপণ ও উদ্ধার তৎপরতা ॥ খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। তারা আগুন নেভাতে ব্যর্থ হলে আরও আটটি ইউনিট সেখানে হাজির হয়। তারাও আগুন নেভাতে ব্যর্থ হয়। এরপর ৩৭টি ইউনিট সেখানে হাজির হয়। তারা রাত তিনটার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। আগুন নেভাতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিসকে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশনস এ্যান্ড মেনটেন্যান্স) মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ জানান, সরু রাস্তা, পানির স্বল্পতা ও মানুষের কারণে ফায়ার সার্ভিসকে আগুন নেভাতে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। প্রতিটি রাস্তা সরু গলির। রাস্তার নিচের দিকে ১৫ থেকে ২০ ফুট প্রশস্ত। অথচ রাস্তা থেকে ১২ ফুট উপরের দিকে আরও চেপে গেছে। কারণ অনেকেই ভবন তোলার পর তা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়েছেন। এজন্য রাস্তা দিয়ে ফায়ার সার্ভিসের বড় গাড়ি আর ঢুকতে পারেনি। পেছন দিক থেকে অনেক ঘুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছতে হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটের ২শ’ জন সদস্য অগ্নিকা- নির্বাপণে কাজ করেছে।

পোড়া গাড়ির দীর্ঘ সারি রয়েছে। যা গাড়ির দীর্ঘ যানজটের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। এছাড়া স্থানীয়রাও তাই জানিয়েছে। যানজটের সময় গাড়ির ধাক্কায় একটি গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে গাড়িতে আগুন ধরে যায়। পরে তা সেখানে পিকআপে থাকা গ্যাস সিলিন্ডারে ধরে যায়। সেখান থেকে হোটেলের গ্যাস সিলিন্ডারে এবং ট্রান্সফর্মার ও ৬৬ নম্বর বাড়ির নিচতলায় থাকা কেমিক্যালের গুদামে আগুন লেগে যায়। যে চারটি বাড়িতে আগুন লেগেছে, প্রত্যেকটি বাড়িতে বডি স্প্রে ও কসমেটিক্স বানানোর জন্য কেমিক্যাল মজুদ ছিল। আর তৈরিকৃত বডি স্প্রের কৌটাগুলো বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর হোটেলে থাকা তিতাস গ্যাসের সিলিন্ডার আগুনের তাপে বিস্ফোরিত হয়ে আগুনকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করে। এছাড়া বাসা বাড়ির ফ্রিজ, এসিসহ নানা বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বিস্ফোরিত হয়ে আগুনকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল। ফলে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে।

তিনি বলছিলেন, ৬৬ নম্বর বাড়ির চারটি তলায় এবং বাড়িটির সামনের রাস্তায় আগুনে ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাড়িটি থেকে কেউ বের হতে পারেনি। রাত থেকেই লাশ উদ্ধার শুরু হয়। লাশগুলো বাড়িটির বিভিন্ন তলায় ও বাড়ির সামনে পড়ে ছিল। অনেকে যানজটের কবলে পড়ে সেখানেই মারা গেছেন। আর রাস্তায় প্লাস্টিকের দানা পড়ে ছিল। সেগুলো তাপে লাভার মতো হয়েছিল। ফলে মানুষ যেখানে পা দিয়েছে, সেখানেই আটকে পড়েছে। বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। অনেক মানুষ বাড়িটির সামনের রাস্তায় যানজটের ভেতরে গাড়ির বিভিন্ন কোনায় কোনায় পুড়ে পড়েছিল। অনেকের লাশ পুড়ে ছোট হয়ে গেছে। অনেকের পুরো শরীর পুড়ে কয়লা হয়ে সেখানে থাকা ময়লার সঙ্গে মিশে গেছে। তাদের অনেক কষ্টে হাড়গোড় যোগাড় করা হয়েছে। তা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। সব মিলিয়ে দুপুর নাগাদ ৬৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব লাশ স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়েছে। আর ৪১ জনকে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। দুপুর একটায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।

এখনও ২৬ জন নিখোঁজ ॥ ঘটনার পর পরই রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবীরা ফায়ার সার্ভিস, পুলিশসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাজে যোগ দেয়। রেড ক্রিসেন্টের তরফ থেকে একটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ক্যাম্প থেকে মাইকযোগে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করার কথা বলা হয়। সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক ২৬ জনের নাম নিখোঁজের তালিকায় তালিকাভুক্ত হয়। তাদের সম্পর্কে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে। তারা নিহত হয়েছে নাকি চিকিৎসাধীন আছে তা জানার চেষ্টা চলছে।

ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ ॥ অগ্নিকা-ের প্রকৃত কারণ জানতে ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন ও সিআইডির ফরেনসিক দল আলামত সংগ্রহ করেছে। আলামতের মধ্যে রয়েছে বাড়ির ভেতরের বালি, সিমেন্ট, মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ, গাড়ির যন্ত্রাংশ, বডি স্প্রের কৌটা, বৈদ্যুতিক তারসহ নানা জিনিসপত্র।

চকবাজারে হাজার হাজার মানুষের ভিড় ॥ ঘটনার পর থেকেই সেখানে ভিড় করছেন হাজার হাজার মানুষ। জনতার ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। বাড়ি চারটি একনজর দেখার জন্য সেখানে যেন জনতার ঢল নেমেছে। এতে করে পুরো এলাকার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে যানবাহন চলাচল। কোন দোকানপাট খোলা নেই।

হতাহতদের পরিবারকে আর্থিক ও চিকিৎসা সহায়তা ॥ নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এছাড়া যাদের লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে, তাদের পরিবারকে দাফন-কাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে ঢাকা জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে দেয়া হয়েছে। দগ্ধদের চিকিৎসায় ২০লাখ টাকা দিয়েছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন ॥ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব) আলী আহমদ খান, পুলিশ মহাপরিদর্শক, র‌্যাব মহাপরিচালক, ডিএমপি কমিশনারসহ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তারা প্রত্যেকেই পুরনো ঢাকা থেকে যে করেই হোক কেমিক্যালের গুদাম সরিয়ে ফেলা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

দুটি তদন্ত কমিটি ॥ পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকা-ের ঘটনায় পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফায়ার সার্ভিসের তিন সদস্যের একটি কমিটি। এই কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। অপরটি ১২ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এই কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন এ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অগ্নিদগ্ধদের দেখতে গিয়ে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ মফিজুল হককে কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। কমিটিতে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, কলকারখানা পরিদর্শন অধিদফতর, বিস্ফোরক অধিদফতর, ঢাকা জেলা প্রশাসন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এবং কেমিক্যাল ব্যবসায়ী সমিতির একজন করে প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে আছেন। বিসিক পরিচালক (প্রকল্প) মোঃ আব্দুল মান্নান কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ঢাকার উপ-পরিচালক দিলীপ কুমার ঘোষকে প্রধান করে তিনি সদস্যের কমিটিতে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিসের ঢাকার সহকারী পরিচালক সালেহ উদ্দিন এবং উপসহকারী পরিচালক আব্দুল হালিম। শিল্পমন্ত্রী বলেন, কমিটির কাজ হলো, অগ্নিকা-ের কারণ অনুসন্ধান, প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও অগ্নি দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ করা। কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারে বুধবার রাতে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকা-ে অন্তত ৭০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ওই ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪১ ব্যক্তি। অধিকাংশ লাশ পুড়ে অঙ্গার হওয়ায় তা শনাক্তে ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।