২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় প্রকাশ করুন ॥ প্রধানমন্ত্রী

উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় প্রকাশ করুন ॥ প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় প্রকাশ করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আান্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আয়োজিত অনুষ্ঠানের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী রায় বাংলায় প্রকাশ করার তাগিদ দিয়ে বলেছেন,আদালতের রায় অন্য ভাষায় লেখা হলেও বাংলায় প্রকাশ করা উচিত। রায় লেখা হয় ইংরেজীতে। ফলে রায় বোঝার জন্য নির্ভর করতে হয় আইনজীবীর ওপর। নিজে পড়ে তো আর বুঝে নিতে পারেন না তাই অনেকে হয়রানির শিকার হন।

অনুষ্ঠানে চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে মৃত্যুর ঘটনায় শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রাতে খবর এলো চকবাজারে আগুন লেগেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ফায়ার সার্ভিস উদ্ধার কাজ শুরু করেছে। ৭০ জনের মতো নিহত হয়েছেন। বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। চার-পাঁচজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে গেছেন। বাকিদের অবস্থা গুরুতর। যারা আহত হয়েছে তাদের তাড়াতাড়ি সুচিকিৎসার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি যারা নিহত হয়েছেন সেসব পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও সমবেদনা জানাচ্ছি। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ভাষা আর্কাইভের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী উচ্চ আদালতের রায় বাংলায় প্রকাশের পরামর্শ দিয়ে বলেন, উচ্চ আদালতের রায় প্রকাশ করা উচিত বাংলায়। ইংরেজীতে লেখা হলেও সেটা রোমান ইংরেজীতে না লিখে সহজ ইংরেজীতে লেখা যায়। যেন সহজে সবাই বুঝতে পারে। তারপর সেটা বাংলায় অনুবাদ করা যায়। তাহলে আমাদের মতো অল্প শিক্ষিতদের সুবিধা হবে রায় বুঝতে।

আমাদের দেশের অনেক সাধারণ মানুষ আছেন যারা ইংরেজী জানেন না। তাই রায় পড়ে আইনজীবীরা যা বোঝান, সেটাই তাকে বুঝতে হয়। উচ্চ আদালতে ইংরেজীতে রায় লেখাটা দীর্ঘদিনের একটি পদ্ধতি। চট করেই এটার পরিবর্তন সম্ভব নয়। তবু আমরা আশা করি, ধীরে ধীরে এটাও চালু হবে। কারণ বিচার প্রত্যাশী সাধারণ জনগণকে রায়টা তো পড়ে বুঝতে হবে। উচ্চ আদালতের রায় লেখার ক্ষেত্রেও বাংলার ব্যবহার শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে বিচার প্রত্যাশীদের ভোগান্তি অনেকাংশে লাঘব হবে।

উচ্চ আদালতসহ সর্বক্ষেত্রে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিতকরণে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন আইন, ১৯৮৭’ রয়েছে। সেটা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় আদালতসহ বিভিন্ন সরকারী দফতরকে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ওই আইনের তৃতীয় ধারায় বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সর্বত্র তথা সরকারী অফিস, আদালত, আধা-সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল-জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলী অবশ্যই বাংলায় লিখিতে হবে।’

বর্তমান আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হক হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে ২০০৭ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলায় মামলার রায় লেখা শুরু করেছিলেন। প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরও তা চালু রেখেছিলেন তিনি। সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান ও এ বি এম খায়রুল হক ছাড়াও হাইকোর্টের কয়েক বিচারক বিভিন্ন মামলার রায় দিয়েছেন বাংলা ভাষায়। হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এআরএম আমিরুল ইসলাম চৌধুরী তার সব আদেশ, নির্দেশ ও রায় বাংলায় দিতেন ।

এমন এক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে আরও বলেন, আমরা মনে করি আমাদের যারা আদালতে আছেন, তারা যদি মাতৃভাষায় লেখার অভ্যাসটা করেন, সেটা অন্তত আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, তাদের খুব সুবিধা হবে রায়টা পড়ে বোঝার।

তিনি বলেন, ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতেই সরকারের তরফ থেকে পৃথিবীর নয়টি ভাষা নিয়ে একটি এ্যাপ তৈরি করা হয়েছে। তার মাধ্যমে কিন্তু মানুষ অনেক ভাষা শিখতে পারে। ইংরেজী সারা বিশ্বে একটা মাধ্যম হয়ে গেছে। কাজেই আমাদের দেশের দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে সেটা শিখতে পারে। সঙ্গে বাংলা ভাষা মাতৃভাষা, যে ভাষার জন্য আমরা জীবন দিয়েছি সেই ভাষাটাও সবাই যাতে শেখে সেই ব্যবস্থাটাও করা একান্তভাবে প্রয়োজন।

ভাষা আন্দোলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, এ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকার কথা সে সময়ের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকেই জানা যায়। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা নিয়ে বদরুদ্দীন উমরের একটি লেখার সমালোচনা করে তিনি বলেন, তৎকালীন গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকেই স্পষ্ট এ আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষার আহ্বান জানান। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম বাংলাদেশে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব, যেন সারা বিশ্বের ভাষা সংরক্ষণ করতে পারি, গবেষণা করতে পারি, জানতে পারি। তখনই এই ইনস্টিটিউট করার পরিকল্পনা হয়। আমার আমন্ত্রণে তখন জাতিসংঘ মহাসচিব কোফি আনান বাংলাদেশে আসেন। এই ইনস্টিটিউটের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

তবে সরকার পরিবর্তনের পরই সেটা বন্ধ। দীর্ঘ সাত বছর পর আমরা আবার সরকার গঠন করলাম এবং এই ইনস্টিটিউটের কাজ শুরু করি। পরে সেটা আমরা আইনও তৈরি করে দেই। যেন এটা সব সময় কাজ করতে পারে। তখনই আমরা এখানে ভবন ও ভাষা ইনস্টিটিউট গড়ে তুলি। কেউ গবেষণা করতে চাইলেও সেই সুযোগটা আমরা রেখেছি।

অন্যদের মাতৃভাষার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষাও আমরা সংরক্ষণ করছি। তাদের কোন বর্ণমালা নেই। তারপরও তারা যেন ভুলে না যায়, সেজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভাষাগতভাবে যোগাযোগ এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ব এখন গ্লোবাল ভিলেজ। তাই দ্বিতীয় কোন ভাষা শিখতে হবে। ইংরেজী এখন বিশ্বে যোগাযোগের অন্যতম ভাষা। তবে যে ভাষার জন্য জীবন দিয়েছি, সেটাও চর্চা করতে হবে।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে ভারতের ভাষাবিজ্ঞানী অধ্যাপক গণেশ দেবি বলেন, ভাষার বৈচিত্র একটি দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলে, তাই সকল জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংরক্ষণ করতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ছিলেন শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসেইন চৌধুরী ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জিনাত ইমতিয়াজ আলী।

বাংলার পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা নিয়ে গবেষণার জন্য ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বর্ণাঢ্য আয়োজন করা হয় প্রতিবছরই। এবারও দু’দিনের অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে ইনস্টিটিউটটি।