২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

উন্নয়নের অভিযাত্রায় এগিয়ে নারী

  • জলি রহমান

দেশের উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ এবং অবদান এখন দৃশ্যমান। উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশের নারীরাও শিক্ষা ও যোগ্যতা বলে নিজ নিজ অবস্থানে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে নজর দিলেই এর প্রমাণ মেলে। কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের উপস্থিতি জানিয়ে দেয় বাংলাদেশের নারীরা এখন আর পিছিয়ে নেই। দেশের প্রতিটি কর্মক্ষেত্রেই নারীদের অংশগ্রহণ সার্বিক উন্নয়ন বেগবান করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় তাদের সময়োপযোগী অবস্থান দেশকে নিরন্তর ধারায় সামনে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপক অগ্রযাত্রার সঙ্গে নিম্নআয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার সব শর্ত পূরণ করছে।

দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও নানা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারী পদে বাংলাদেশের নারীরা কাজ করছে। নারীদের একটি বড় অংশ তরুণ ও কর্মক্ষম। এরা ঘরে বাইরে চাকরি করতে আগ্রহী হচ্ছে। নারীদের দৃপ্ত এগিয়ে চলার প্রমাণ বিভিন্ন জরিপ থেকে পাওয়া যায়। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম প্রদত্ত ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট ২০১৭’ অনুযায়ী নারী আর পুরুষের মাঝে বিভাজনের ক্ষেত্রে বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭। গত বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৭২। অর্থাৎ এই একটি বছরে বাংলাদেশের নারীরা ২৫ ধাপ এগিয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বাকি সবকটি দেশকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। এই তথ্যটি আমাদের দেশের নারীদের মনোবল বাড়িয়ে আরও সামনে এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা জাগাবে।

বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে দেশে ৫১ শতাংশ ছাত্রী পড়াশোনা করছে। এ স্তরে ছাত্রসংখ্যা ছাত্রীদের থেকে ২ শতাংশ কম। মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে ছাত্রীসংখ্যা একটু বেড়ে ৫৩ শতাংশ। কিন্তু কলেজ পর্যায়ে যেয়ে আবার ছাত্রী সংখা কমে মাত্র ৪৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এসব তথ্য থেকে একটা জিনিস বোঝা যায় যে প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে শিশুদের তুলনায় মেয়ে শিশুরা বেশি ভর্তি হলেও উঁচু ক্লাসে উঠতে উঠতে মেয়ে শিক্ষার্থীদের হার কমতে থাকে। তবে মাদ্রাসা শিক্ষায় আবার ছাত্রের তুলনায় ছাত্রী বেশি (৫৪ শতাংশ)। এ ছাড়া প্রফেশনাল শিক্ষায় ৩৯ শতাংশ, শিক্ষক শিক্ষায় ৩৪ শতাংশ ও কারিগরিতে ২৪ শতাংশ নারী লেখাপড়া করছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, বর্তমানে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নারী আছেন। দেশে সরকারী ও আধা-সরকারী প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ১০ লাখ ৯৬ হাজার ৩৩৪টি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৮৩ হাজার ১৩৩ জন। ১৯৭৪ সালে কর্মক্ষেত্রে নারী ছিল ৪ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ৩৩ শতাংশ হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী দেশের পাঁচ কোটি ৪১ লাখ কর্মজীবীর মধ্যে এক কোটি ৬২ লাখ নারী। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের মধ্যে এ সংখ্যা ১৬ হাজার ৬৯৭ জন। বিদেশে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত ৭৬ লাখ প্রবাসীর মধ্যে ৮২ হাজার ৫৫৮ জন নারী। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ কর্মীই নারী। আর দেশের ৯০ শতাংশ ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহারকারীও নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী গত চার বছরে শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। এদিকে ২০১৭ সালের ৭ ডিসেম্বর কঙ্গোতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে প্রথমবারের মতো দু’জন নারী পাইলট হিসেবে যোগদান করেছেন। দুর্গম ও ভিন্ন পরিবেশে শান্তিরক্ষার এই কাজটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন বিমানবাহিনীর পাইলট-ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট নাইমা হক এবং তামান্না-ই-লুত্ফী। দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইন্স বিমান বাংলাদেশে পাইলট রয়েছেন ১৪০ জন, এর মধ্যে নারী পাইলট ৯ জন। পুরুষদের মতো তারাও সাফল্যের সঙ্গে পালন করছেন পেশাগত দায়িত্ব।

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ সফলভাবে এসডিজি অর্জন করবে। সে পথেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ সফলভাবে এমডিজি অর্জন করে পুরস্কৃত হয়েছে। এ দেশের উন্নয়ন বর্তমানে বিশ্ববাসীর কাছে রোল মডেল। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে তিনটি শর্ত পূরণ করতে হয়েছে। প্রথমত মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২৪২ মার্কিন ডলার হতে হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৭৫২ মার্কিন ডলার। দ্বিতীয়ত মানবসম্পদের উন্নয়ন অর্থাৎ দেশের ৬৬ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হতে হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের ৭০ শতাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি হয়েছে। তৃতীয়ত অর্থনৈতিকভাবে ভঙ্গুর না হওয়ার মাত্রা ৩০ শতাংশের নিচে হতে হয়, বাংলাদেশে এ মুহূর্তে তা ২৬ শতাংশ। বিশ্বের ইকোনমিক ও সোশ্যাল কাউন্সিল উল্লিখিত তিনটি বিষয় বিবেচনা করে কোন দেশকে নিম্নআয়ের থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হওয়ার ঘোষণা দেয়। গত বছর মার্চে এ কাউন্সিলের মূল্যায়ন কমিটির সভায় বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ফলে দেশ টেকসই উন্নয়নের পথে একধাপ এগিয়েছে।

নারীর উন্নয়নে এবং সমাজে সর্বক্ষেত্রে পুরুষের সমান অবদান রাখতে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থাও কাজ করে যাচ্ছে। এ কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের দেশেও ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। একসময় নারীরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারত না, কর্মক্ষেত্রে কাজ করতে অনেক প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হতো। সামর্থ্য থাকার পরও আমাদের জনশক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল না, অব্যবহৃত থাকত বিপুল জনশক্তি। শিক্ষার অভাবে নারীসমাজ অনেক পিছিয়ে ছিল। নারীদের অন্ধকার জগৎ থেকে আলোর জগতে আনার জন্য বেগম রোকেয়া আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু তিনি তার প্রচেষ্টার সফলতা দেখে যেতে পারেননি। আজ অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। দেশের সর্বক্ষেত্রে নারীর সরব উপস্থিতি সমাজ ও দেশের অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। নারীরা এখন দেশের অর্থনীতির জন্য বোঝা নয়, সম্পদ। আজ দেশে এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে নারীদের অবদান নেই। আমাদের জাতীয় সংসদের স্পীকার, সংসদ নেতা, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সংসদ উপনেতা সবাই নারী। জাতীয় সংসদে শুধু সংরক্ষিত আসনেই নয়, পুরুষদের সঙ্গে সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে দক্ষতা ও যোগ্যতার সঙ্গে অবদান রাখছেন নারী। দেশে-বিদেশে কর্মক্ষেত্রে নারী তাদের দক্ষতা, মেধা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন। কাজের পরিবেশ, মূল্যায়ন ও উৎসাহ অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের নারীরা অনেক এগিয়ে যাবেন। বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নারী-পুরুষ সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার নতুন মাত্রা যুক্ত করবে। আর সে জন্য দেশের নারী-পুরুষকে কাজ করতে হবে একসঙ্গে। নারীদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা করেছে। বাল্যবিয়ের হার কমেছে। কাজ করে কম মজুরি দেয়া বা নারীদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করার সুযোগ আর নেই। সঙ্গত কারণেই দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। নির্যাতন হলেও তার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিকার পাওয়ার কারণে প্রতিবাদের হার বেড়েছে। থানায় নারী ও শিশু ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতনবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ফলে এখন এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা কমে এসেছে। আপত্তিকর কোন ঘটনা ঘটলেই দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে অতি অল্প সময়ের মধ্যে তার ন্যায়বিচার হচ্ছে।

পৃথিবীর প্রায় সাড়ে ৬০০ কোটি মানুষের মধ্যে অর্ধেক নারী। তাই এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক উন্নয়নে পুরুষের চেয়ে নারীর ভূমিকা কোন অংশে কম নয়। বস্তুত নারী-পুরুষের সম্মিলনেই সমাজ তথা দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সম্ভব। তাই কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। কৃষিকাজের সভ্যতার প্রথম বীজ বপন করেছিল নারী। বীজ বুনে যে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব তা নারীরাই প্রথম আবিষ্কার করেছিল। পুরুষরা নিয়েছিল সহায়ক শক্তির ভূমিকা। একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সে দেশের প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকা রাখতে হয়। সবাই মিলেই দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা সম্ভব। যেহেতু মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। ফলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে নারী সমাজের ভূমিকা পুরুষের সমান। আর দেশ তখনই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে সুখ-সমৃদ্ধিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠবে যখন নারী ও পুরুষ সমান তালে দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাবে।