২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ্যানিমেশনে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ

  • ইব্রাহিম নোমান

রবীন্দ্রনাথের লেখা- চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির। স্বাধীনতা কি তাই? স্বাধীনতা শব্দটি আসলে কার কাছে কী অর্থে ধরা দেয়? দেশ থেকে দেশান্তরে ‘স্বাধীনতা’ কি আলাদা কোন তাৎপর্য বহন করে? ইতিহাস এবং ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় মানুষ কিছু ঘটনা এবং স্মৃতিকে আপন করে নেয়। আর এ আপন করে নেয়ার বিভিন্ন স্তর এবং সময়ের পথ ধরেই ঘটে সংস্কৃতির বিকাশ। প্রতিটি জাতি ও সভ্যতা সংস্কৃতির মাধ্যমে খুঁজে পায় তার নিজস্ব অনুভূতি এবং স্বকীয় বৈশিষ্ট্য। নিজস্ব সংস্কৃতি বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হলো ভাষা। বাংলা ভাষায় শিশুর বোলই আমাদের নিজস্ব অনুভূতি, যা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার অর্জনের কথা।

প্রতিটা শিশু পৃথিবীতে আসে পরম মায়া নিয়ে। ওরা যেন পবিত্রতার চাদরে মাখা একটি দিনের একটি সকাল। ওদের চোখের ভাষা, বুলি যেন হাজার আদরের বিশাল ভাস্কর্য। একসময় শিশুদের নিয়ে এত ভাবা হতো না। এখন শিশুদের নিয়ে দেশ, জাতি, পরিবার, শিক্ষক সবাইকে ভাবতে হচ্ছে। এরাই আগামীর কর্ণধার! শিশুদের ঠিকমতো পরিমার্জনে পরিবার হতে শুরু করে সকলে এগিয়ে এসেছে। আসতেই হবে। শিশুদের ভূমিকা এখন সর্বক্ষেত্রে। ওদের বয়স অনুযায়ী মেধা, দক্ষতা, পরিবেশনায় বড়দের চাইতে কোন অংশে কম নয়। তাই তো বড়দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিশুরা তাদের সব দক্ষতাকে কাজে এগিয়ে নিচ্ছে। কবিতা আবৃত্তি, গান, নাচ, অভিনয় দিয়ে যেমন দেশে রত্নের সংখ্যা এখনই জানান দিচ্ছে তেমনি যে কোন উপলক্ষকে কেন্দ্র করে নিজেদের আর চৌকস প্রমাণে মেলে ধরছে প্রতিনিয়ত। যে কোন দিবসে শুধু মেধা পরিবেশনায় নয় সাজে, কেনাকাটায়, ঘোরাফেরায়, খেলাধুলা, আনন্দে শিশুরা এখন যোগ দিচ্ছে সরাসরি। এটি আশার আলো বটে এবং শিশু অবস্থায় নিজেদের ভেতরের কলিগুলোকে রিহার্সেল করার সময় পাচ্ছে। ঝালাই করে নিচ্ছে তাদের সব যোগ্যতা। এটি আমাদের দেশের জন্য এক শুভ লক্ষণ। নব্বই আশি দশকে শিশুরা এতটা সুযোগ পেত না, যত না পাচ্ছে বিংশ ও একবিংশ শতকে। বড়দের মনমানসিকতা পরিবর্তনের কারণে এই স্বর্ণ সময় আমরা দেখতে পাচ্ছি। আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে অকল্পনীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেখা মিলবে শীঘ্রই।

শিশু মন চঞ্চল ও স্বপ্নবাজ। বাংলায় আমাদের শিশুসাহিত্যের ক্ল্যাসিকগুলো অনেক সমৃদ্ধ। কিন্তু সেই সঙ্গে এ যুগের শিশুদের জন্যও সমৃদ্ধ সাহিত্য প্রয়োজন। দশ বছরের নিচের শিশুরা মূলত ছবি দেখে বই পছন্দ করে। তাই নিয়ম করে শিশুকাল থেকেই পাঠ্যসূচীর বাইরের শিশুসাহিত্য পড়তে উদ্বুদ্ধ করা দরকার। প্রযুক্তির এই যুগে তো আরও বেশি করে করা দরকার। তাহলেই হয়ত একটা বই পড়ার সংস্কৃতি বহাল থাকবে, যা জাতির মননকে সমৃদ্ধ করবে। শিশুর মন যদি মোবাইল, ল্যাপটপ, ফেসবুক, হোয়াটসএ্যাপের গ-ি থেকে বেরিয়ে কোন সুদূরে ভেসে না বেড়ায়, তাহলে তার কল্পনার জগত তৈরি হবে না। তবে ট্যাব বা স্মার্টফোনেও যদি আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে, ইতিহাসের সঙ্গে মিল রেখে গেমস খেলে, তাহলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য হবে সহায়ক।

এ্যানিমেশনের দুনিয়ায় ডুব দেয়ার কোন বয়স নেই। ছেলে-বুড়ো সবাই এর প্রতি সমআগ্রহী। ছোট হোক, বড় হোক কার্টুন-কমিকস ভাল লাগে না এমন মানুষ কমই পাওয়া যাবে। এ্যানিমেশন শিল্পের ডিজিটাল মাধ্যম। শিল্পী রং-তুলির বদলে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে তার শৈল্পিক দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলেন। গেমসের বিভিন্ন চরিত্র আজ দেশে দেশে এত জনপ্রিয় শুধু এ্যানিমেশনের কারণেই। বিজ্ঞাপন, কার্টুন, লোগো কিংবা টয় স্টোরি থেকে শুরু করে হালের অস্কার বিজয়ী শ্রেষ্ঠ ছবিগুলো এ্যানিমেশনকে এনে দিয়েছে অসাধারণ জনপ্রিয়তা। এ্যানিমেটেড ছবি, গেম কিংবা কার্টুনের জনপ্রিয়তা এক সময় ছোটদের কাছে থাকলেও এখন বিশ্বব্যাপী বড়দের কাছেও জনপ্রিয়। তবে তরুণদের কাছে এ্যানিমেটেড ছবির জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। কারণ তরুণরা সব সময়ই উচ্ছলিত প্রাণে বিজ্ঞানের ছোঁয়া লাগানো কাল্পনিক জগতকে ভালবাসে। তাই এর সঙ্গে যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সমন্বয় করা যায় তাহলে তা শিশু-কিশোর ও তরুণদের জন্য হবে হৃদয়গ্রাহী। বিংশ শতকে শিশুদের নিয়ে যে বিষয়শৈলীতে বই লেখা হতো, এখন একবিংশতে শিশুরা যে সমাজ ও সময়ে বড় হচ্ছে, তা বইতে খুঁজে পেতে, শিশুদের কাছে টানতে অলঙ্করণে বৈচিত্র্য এসেছে। বর্তমান সময়ে শিশু-কিশোরদের অবসর সময়ের বেশিরভাগ কাটে কম্পিউটার, ট্যাব বা স্মার্টফোনে। তাই শিশুদের বইয়ের সৌরভে আটকে রাখতে, নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন আমাদের ইতিহাস-সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ই-বুক, গেমস, গ্রাফিক নভেল তৈরি করা। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন, মুজিব এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এত ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে বিভিন্ন সময়ে যে, শিশু অবস্থা থেকেই বিষয়গুলোর সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন।

শিশু-কিশোরদের সঙ্গে কমিউনিকেট করার জন্য কমিকস একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ওরা গল্পের বইয়ের চেয়েও কমিকস পড়তে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে ভিজুয়াল সাপোর্ট থাকার কারণে। তেমন একটি আদর্শ কমিকস হচ্ছে গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’।

নেলসন ম্যান্ডেলা, উইনস্টন চার্চিল, জওহরলাল নেহরু, নেতাজি সুবাস চন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধীসহ বিশ্বের বড় নেতাদের কমিক বা গ্রাফিক নভেল রয়েছে। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’-এর কাহিনীকে উপজীব্য করে তাকে শিশুদের আরও কাছের এক বন্ধু করে তোলার প্রত্যয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’।

১৯৬৭ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী মুজিবুর রহমান তাঁর আত্মজীবনী লেখা শুরু করেন। সেটি অসমাপ্তই রয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত। তবুও এর মধ্যে উঠে এসেছে তাঁর শৈশব, বিপ্লবী তরুণ বয়সী দিনগুলো, কারাজীবন এবং তাঁর ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার গল্প। প্রথম পর্বে খেলাধুলা, পড়াশোনা, ডাক্তারের কাছ থেকে পালানো, প্রথমবারের মতো কারাবরণের মতো বিভিন্ন কৌতূহলোদ্দীপক কাজের পাশাপাশি দেশের প্রতি তরুণ বয়স থেকেই নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে দেখা যায় কিশোর শেখ মুজিবকে। দ্বিতীয় পর্বে তার রাজনীতির হাতেখড়ির পাশাপাশি তার প্রেরণা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে পিতা ও পুত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতার ঘটনাও বিশদভাবে জানা যায়। মুজিব-৩ এ বঙ্গবন্ধুকে স্কুল ও কলেজের শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকা-, দুর্ভিক্ষের সময় মানবিক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে। এর আগে গ্রাফিক নভেলের তিনটি পর্ব প্রকাশিত হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রকাশিত হয়েছে ‘মুজিব ৪ : দিল্লী অভিযান’। প্রকাশের অপেক্ষায় আছে আরও আটটি পর্ব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের রাজধানী দিল্লীতে ‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কনফারেন্স’-এ যোগ দেন। ওই সময় তাঁর ছাত্র রাজনীতির দুই সহযোদ্ধা মাখন ও নূরুদ্দিনের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। অর্থাভাবে এক টিকেটে তিনজনের ভ্রমণসহ বেশ কিছু মজাদার বিষয় যুক্ত করা হয়েছে এই পর্বে।

কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের তৎকালীন রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা অর্জন, দলের স্বার্থে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তর্ক এবং তার পরও গুরুর কাছ থেকে স্নেহ-ভালবাসা লাভের বিষয়গুলো উঠে এসেছে ‘মুজিব গ্রাফিক নোভেল ৪ : দিল্লী অভিযান’-এ। নভেলটির শিল্পী সৈয়দ রাশাদ ইমাম তন্ময় ও এবিএম সালাউদ্দিন শুভ। প্রকাশক বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান সিদ্দিক ববি ও বিদ্যুত-জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। সব শ্রেণীর পাঠকের কথা মাথায় রেখে এই নভেলের তিনটি বাংলা পর্ব প্রকাশের পর এবার প্রথম পর্বটি প্রকাশ করা হয়েছে ইংরেজীতে। ইংরেজী সংস্করণে ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী উভয় শ্রেণীর পাঠকের কথা মাথায় রাখা হয়েছে। গ্রাফিক নভেলের ইংরেজী সংস্করণ প্রকাশ করেছে ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টার। নভেলটি শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল মনন বিকাশে হবে খুবই সহায়ক।

ছবি দেখে দেখে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত জীবনীকে জানা। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকে জেনে মনে দেশপ্রেম জাগ্রত করা। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ জীবন কমিক গ্রাফিকের মাধ্যমে অল্প সময়ে জানা যায়। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখিনি, তাদের সামনে এগিয়ে যেতে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস জানতে, তরুণ প্রজন্মের কাছে বর্তমানের ‘এ্যান্ড্রয়েড যুগে’ বিজয়ের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে শিশু-কিশোরদের মনন উপযোগী স্মার্ট পদ্ধতিতে। শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে আমরা যতটা উদ্বিগ্ন মন নিয়ে ততটা নই। শিশু কতটুকু লম্বা হলো, কতটুকু স্বাস্থ্যবান হলো, স্কুলে রোল নম্বরটা কয়েক ধাপ এগিয়ে এলো তা নিয়েই আমরা চিন্তিত। ভাল হলে উপচে পড়ে আনন্দ। আর খারাপ হলে দুশ্চিন্তার সাগরে উথলে ওঠে মনে। এ সবই শিশুর দৃশ্যমান বিষয়। শিশুর ভেতর তার আবেগ, অনুরাগ, আকাক্সক্ষা, হাতাশা, বোধ, অনুরাগ, বিরাগ, ভাল লাগা, মন্দ লাগা ইত্যাদি কতগুলো অদৃশ্য বিষয় রয়েছে। এসব বোঝা যায় না, উঁকি দিলে দেখা যায় না। মনের গহীন থেকে এসব বিষয় অনুভব করতে হয়।

লাল-সবুজ পতাকার স্বাধীন এই বাংলাদেশ আজ যতটা এগোচ্ছে তার চেয়ে বেশি নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। সাতচল্লিশ থেকে একাত্তর পর্যন্ত যারা বাঙালীর সংস্কৃতির অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার অস্বীকার করেছে, তাদের প্রেতাত্মারা এখনও বাঙালী স্বপ্নস্বাদকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। ষড়যন্ত্রে মেতে আছে ছোবল দেবার দুষ্ট কামনায়। একাত্তরের পর কখনও কখনও এমন সময়ও গেছে যখন অত্যন্ত সুকৌশলে আমাদের ভাষা আন্দোলন ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ’৭১-এর রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের যে ইতিহাস রয়েছে তার বিকৃতি করার চেষ্টা হয়েছে। তাই সঠিক ইতিহাস জানতে শিশুদের জন্য দুয়ার খুলে দিতে হবে। ছোটরা সব সময়ই গেমস বা কমিকসের প্রতি আগ্রহী। তাদের ইতিহাস পড়ার ব্যাপারে আগ্রহ কম। সেই ইতিহাসকে যদি তাদের প্রিয় জিনিসগুলো- মানে কমিকস বা গেমের মাধ্যমে উপস্থাপন করা যায়- তাহলে নিঃসন্দেহে ব্যাপারটা অনেক বেশি আকর্ষণীয় হবে। গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’-এর চমৎকার সব রঙিন ছবি আর দারুণ গ্রাফিক্স ছোটদের মুগ্ধ করতে বাধ্য। এই মুগ্ধতার সঙ্গেই তাদের জানা হয়ে যায় ইতিহাস। তাই গ্রাফিক নভেল ‘মুজিব’ আমাদের শিশু-কিশোরদের ইতিহাস সম্পর্কে জানার কৌতূহল তৈরি করছে।