১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিনে স্বদেশী ভাষা, পুরে কি আশা?

  • আলী এরশাদ

মায়ের কাছে শেখা বুলি পৃথিবীতে সবচেয়ে মধুর। এরচেয়ে মধুর আর কোনো ভাষা হতে পারে না।

যে যতো বড় শিক্ষিত, ডিগ্রীধারী পণ্ডিতই হোক না কেন মাতৃভাষা ছাড়া তার পক্ষে মনের আবেগ-অনুভূতিটুকু সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকলেই সহজ ও সাবলীলভাবে মায়ের ভাষায় তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘শিক্ষায় মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধস্বরূপ!’ এর অভাবে শিক্ষা পরিপুষ্টি লাভ করে না, সর্বাঙ্গীণ হয় না সর্বোপরি প্রতিদিনের জীবনযাত্রা।

তাঁর এই উক্তিটি যে কতটুকু সত্যি তা আমরা মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের জীবনীতে দেখি, তিনি রাতারাতি নাম, যশ, খ্যাতি অর্জনের আশায় নিজ ভাষা পরিত্যাগ করে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় ব্রতী হন, কিন্তু কিছুদিন যেতেই তাঁর ভুল ভাঙে। তাইতো তিনি লিখেছেন-

‘‘ হে বঙ্গ, ভা-ারে তব বিবিধ রতন;-

তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি,

পর-ধন-লোভে মত্ত, করিনু ভ্রমণ

পরদেশে, ভিক্ষাবৃত্তি কুক্ষণে আচরি।’’

আজ যে বাংলা ভাষায় আমরা কথা বলি, সেই প্রাণের ভাষা, গানের ভাষার জন্য আমার ভাইয়ের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিতে হয়েছে রাজপথে। বিশ্বের বুকে বাংলা হচ্ছে একমাত্র ভাষা যার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে, রক্ত দিতে হয়েছে।

বর্তমানে জনসংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৭ম, বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি লোক এ ভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষা বিশ্বের সর্বাধিক প্রচলিত ভাষাগুলোর মধ্যে চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ব্রিটিশভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্ম হয়। কিন্তু পাকিস্তানের দু’টি অংশ: পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত বিষয়ে মৌলিক পার্থক্য ছিলো স্পষ্ট, সাদৃশ্য যা ছিলো তা হচ্ছে ধর্ম।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৭ সালে তমদ্দুন মজলিস পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে ‘বাংলা নাকি উর্দু’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে যেখানে সর্বপ্রথম বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণার দাবি করা হয় । উল্লেখ্য, সেই সময়ে সরকারী কাজকর্ম ছাড়াও সকল ডাকটিকেট, পোস্টকার্ড, ট্রেন টিকেটে কেবলমাত্র উর্দু এবং ইংরেজিতে লেখা থাকতো, অথচ হাস্যকর হলেও সত্য, উর্দু ছিলো পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ লোকের ভাষা। অপরদিকে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ ভাগ লোকের ভাষা ছিলো বাংলা।

মাথামোটা পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে বাদ দিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

ডিসেম্বরের শেষের দিকে গঠিত হয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং তমদ্দুন মজলিসের আহবায়ক অধ্যাপক নুরুল হক ভুইয়া এর আহ্বায়ক নিযুক্ত হন ।

জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্টুডেন্টস লীগের জন্ম । এর প্রথম সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তখন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ।

১১ মার্চ ১৯৪৮, এইদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠার দাবিতে একটি বড় সমাবেশ আয়োজন করা হয়। সমাবেশ শেষে বের হওয়া মিছিলে মুসলিম লীগ সরকারের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালায় এবং মিছিল থেকে শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহবুব, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, অলি আহাদসহ বেশ কয়েকজন ছাত্র ও রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।

পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে হিন্দুদের ভাষা এবং বাংলা সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি হিসাবে অভিহিত করে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ইসলামীকরণের অংশ হিসাবে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামেন।

২১ মার্চ-১৯৪৮, রেসকোর্স ময়দানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফর উপলক্ষে আয়োজিত একটি বিশাল সমাবেশে জিন্নাহ স্পষ্ট ঘোষণা করেন যে ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ সমাবেশস্থলে উপস্থিত ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও জনতার একাংশ সাথে সাথে তার প্রতিবাদ করে ওঠে। জিন্নাহ সেই প্রতিবাদকে আমলে না নিয়ে তার বক্তব্য অব্যাহত রাখেন।

২৪ মার্চ-১৯৪৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সমাবর্তন অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘স্টুডেন্টস রোল ইন নেশন বিল্ডিং’ শিরোনামে একটি ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে তিনি ক্যাটাগরিক্যালি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠার দাবিকে নাকচ করে দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে একটি এবং সেটি উর্র্দু, একমাত্র উর্দুই পাকিস্তানের মুসলিম পরিচয়কে তুলে ধরে।

জিন্নাহর এই বক্তব্য সমাবর্তনস্থলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং ছাত্ররা দাঁড়িয়ে ‘নো নো’ বলে প্রতিবাদ করেন। জিন্নাহর এই বাংলা বিরোধী স্পষ্ট অবস্থানের ফলে পূর্ব পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলন আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে এবং আন্দোলন ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে।

২৬ মার্চ-১৯৪৮, জিন্নাহ ছাত্র নেতৃবৃন্দের সাথে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে বৈঠক করেন এবং বৈঠকে তিনি উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে তার অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে দেন। সেই সাথে ১৫ই মার্চ স্টুডেন্টস একশন কমিটির সাথে খাজা নাজিমুদ্দিনের বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক ভাষা হিসাবে স্বীকৃতির অঙ্গীকারনামা বাতিল ঘোষণা করেন। ২৮ মার্চ-১৯৪৮, ঢাকা ত্যাগের প্রাক্কালে এক রেডিও ভাষণে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে তার মনোভাব পুনর্ব্যক্ত করেন। ৬ এপ্রিল-১৯৪৮, জিন্নাহর ঢাকা ত্যাগের পর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন আরো বেগবান হয়ে ওঠে।

কবি বলেছেন, “নানান দেশের নানান ভাষা।

বিনে স্বদেশীয় ভাষা,

পুরে কি আশা?”

তাই তো পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত শ্রেণী-পেশার লোক মায়ের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে দিন দিন আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে।

১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে।

১৮ ফেব্রুয়ারি-১৯৫২, পাকিস্তান সরকার, ২১ ফেব্রুয়ারি ডাকা সাধারণ ধর্মঘটের পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে এবং সকল সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ।

২১ ফেব্রুয়ারি-১৯৫২, সকাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিমনেশিয়াম মাঠের পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজের (তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত) গেটের পাশে ছাত্র-ছাত্রীদের জমায়েত শুরু ।

সকাল ১১ টা কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, গাজীউল হক প্রমুখের উপস্থিতিতে ছাত্র-ছাত্রীদের সমাবেশ শুরু হয়।

সাধারণ ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং মিছিল নিয়ে পূর্ব বাংলা আইন পরিষদের (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের অন্তর্গত) দিকে যাবার উদ্যোগ নেয় । এ সময় পুলিশ লাঠিচার্জ এবং গুলি বর্ষণ শুরু করে । গুলিতে ঘটনাস্থলেই আবুল বরকত (ঢাবির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের ছাত্র), রফিকউদ্দিন আহমদ এবং আব্দুল জব্বার নামের তিন তরুণ মৃত্যুবরণ করেন। পরে হাসপাতালে আব্দুস সালাম যিনি সচিবালয়ে কর্মরত ছিলেন মৃত্যুবরণ করেন। অহিউল্লাহ নামে ৯ বছরের একটি শিশুও পুলিশের গুলিতে মারা যায়। পুলিশের সাথে ছাত্রদের ৩ ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ চলতে থাকে কিন্তু পুলিশ গুলিবর্ষণ করেও ছাত্রদের স্থানচ্যুত করতে ব্যর্থ হয় ।

২২ ফেব্রুয়ারি-১৯৫২, হাজার হাজার ছাত্র-জনতা সকাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জড়ো হতে থাকে। উপস্থিত ছাত্র-জনতা ২১ ফেব্রুয়ারি নিহতদের স্মরণে কার্জন হল এলাকায় জানাজা নামাজ আদায় করে এবং একটি শোকমিছিল বের করে। শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপর পুলিশ পুনরায় গুলি চালালে শফিউর রহমানসহ চারজন ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। উত্তেজিত জনতা রথখোলায় অবস্থিত সরকারপক্ষীয় পত্রিকা “দি মর্নিং নিউজ “ এর অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়। নুরুল আমিন পুলিশের পাশাপাশি আর্মি নামিয়ে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। আর্মি ও পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা ভিক্টোরিয়া পার্কে (বর্তমানে বাহাদুর শাহ পার্ক) জমায়েত হয় এবং সেখানে অলি আহাদ, আব্দুল মতিন, কাজী গোলাম মাহবুব বক্তব্য রাখেন ।

উপায়ান্তর না দেখে নূরুল আমিন তড়িঘড়ি করে আইন পরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব আনেন এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাশ হয় ।

সারা বাংলা অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়। ব্যাপক আন্দোলন সংগ্রাম ও বাঙালিদের ইস্পাত কঠিন ঐক্যের কাছে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়।

অবশেষে ১৯৫৬ সালের ২৩ শে মার্চ পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। শহীদের আত্মদান বৃথা যায়নি। ২১ শে ফেব্রুয়ারি এখন শুধু বাঙালির মহান ভাষা দিবস নয়। ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে, ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে।

২১ শে ফেব্রুয়ারি এখন সারাবিশ্বের মানুষ “আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস” হিসাবে পালন করে।

ইতোমধ্যে বাংলাকে জাতিসংঘের ৭ম দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা দেয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে, তা যদি হয়

বাংলা ভাষা এবং বাঙালিরা বিশ্বের বুকে স্বমহিমায় মাথা উঁচু করে নিজেদের স্থান করে নেবে, শহীদের আত্মা পাবে তৃপ্তি।

ভাষার কারণে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের দরবারে সগৌরবে স্বীকৃত। শুধু তাই নয়, আফ্রিকান রাষ্ট্র সিয়েরালিওনে বাংলা ভাষাকে অন্যতম সরকারী ভাষার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসামসহ সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি লোকের মাতৃভাষা ‘বাংলা’।

তবে, শুধু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আর বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ভাষা বাংলা এই ভেবে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুললে হবে না। সর্বত্র শুদ্ধ বাংলা ভাষার চর্চা করতে হবে। একুশের চেতনাকে মনে-প্রাণে লালন করতে হবে, তবেই ভাষা আন্দোলন তথা শহীদের আত্মদান সার্থক হবে।

(তথ্যসমূহ-ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত)