১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আন্দোলনের গান

  • কামাল লোহানী

এ দেশের মানুষের জীবন-ইতিহাস সংগ্রামমুখর। মোগল যুগ থেকে শুরু করে বাংলার আপামর জনসাধারণ এই তো সেদিনও ছিল পরপদানত। এই সুদীর্ঘ ইতিহাসের পথপরিক্রমায় বাঙালীকে লড়তে হয়েছে বিদেশী রাজশক্তির বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে দেড়শতাধিক বছরের গৌরবদীপ্ত সংগ্রামের অগ্নিগর্ভ দিনগুলো বাংলার শিল্প-সাহিত্য, ইতিহাস আর ভূগোলে নব নব অধ্যায়ের সূচনা করেছে। সমগ্র ভারতবর্ষের মতো এই ভূখ-ও গর্জে উঠেছিল প্রচ- গর্জনে। জনগণের সশস্ত্র সংগ্রামের অগ্নিবাণে ঝলসে উঠেছিল পথপ্রান্তর, নদীবন্দর আর চমকে উঠেছিল শাসকচিত্ত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ ন্যায়সঙ্গত বলেই জমিন রক্ষায় জনগণ হয়েছিল উত্তাল। বাংলার তল্লাটজুড়ে আগুনের যে লেলিহান শিখা জ্বলে উঠেছিল তারই নাম তেভাগা আন্দোলন, হাজং বিদ্রোহ, নাচোল সশস্ত্র সংগ্রাম, নানকার বিদ্রোহ, পলো বিদ্রোহ, লবণ বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ চলে গিয়েছিল বটে কিন্তু যাওয়ার আগে ভ্রাতৃঘাতী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দেশের মানুষ যেন লড়তেই থাকে, তারই বিষ ছড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিল।

ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী রাজনীতির দু-দশকেরও বেশি সময়জুড়ে এমনি অধ্যায় নির্মিত হয়েছিল এই বাংলায় সেকালের মাশরেকী পাকিস্তানে। সাধের মুসলিম লীগ আর তাঁরনেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ‘কায়েদে আজম’ খেতাব ছড়িয়ে ওরা এদেশটাকে কুক্ষিগত করে হাজার মাইলের ব্যবধানে করাচী শহরে বসে শাসন করতে শুরু করেছিল, নিজেদের হাতে ক্ষমতা পাওয়ার মহানন্দে। ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট ভারত ভাগ হলো হিন্দু ও মুসলমান ধর্মভিত্তিক জাতিগত বিভাজন নীতির কৌশল। কিন্তু এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার এক মাসের মধ্যে সুবে বাংলায় দেখা দিল এক নিদারুণ অসন্তোষ। এর মধ্যে নব্যরাষ্ট্রের ‘জাতির পিতা’ এলেন ১৯৪৮-এর ১৯ মার্চ। ২১ মার্চে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল জনসভায় ‘হাঁক’ ছাড়লেন ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।’ জনসমুদ্রে ফিল পড়ল, নড়েও উঠল কিন্তু ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কার্জন হলে একই দম্ভোক্তি বাংলার বিরুদ্ধে উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রনেতা আব্দুল মতিন ও তাঁর কজন সহযোদ্ধা ‘নো, নো’ ধ্বনিতে সকলকে হতচকিত করে দেন। এ থেকেই সূচিত হয় সংগ্রাম। অন্যদিকে বাংলাভাষার বিরুদ্ধে চক্রান্ত জোরদার করতে থাকে পাকিস্তানীরা এদেশীয় দোসরদের যোগসাজশে। বিভ্রান্ত জাতীয়তাবোধ আর সংকীর্ণ মানস তৎকালের তমদ্দুন মজলিসকে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামরত পরিষদের নেতৃত্বের একাংশের দুর্বলচিত্ততা, সংগ্রামে অনীহা এবং আদর্শ চিন্তায় বিরোধিতা আন্দোলনকে পেছনে ঠেলে দিচ্ছিল। এমন সময় ১১ মার্চ ১৯৪৯ আন্দোলন দিয়েছে। পালনের ডাক এলো। কিন্তু সবাই সাড়া দিলেন না। প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক ছাত্র সংগঠন-ছাত্র ফেডারেশন নিজ দায়িত্বে বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করল এবং পুলিশ লাঠিচার্জ করল, গ্রেফতার হলেন অনেক ছাত্রনেতাই।

যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই, ডাকটিকেট, খাম, পোস্টকার্ড, রেটিকেট, টাকাসহ বাংলাভাষা একেবারে পরিহার করায় তারই প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৪৭ সালের নবেম্বর মাসেই সভা-সমিতি ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে। সেই ঘৃণা জমতে জমতে ১৯৪৯-এর ১১ মার্চ নির্ধারিত হয়েছিল আন্দোলন দিবস হিসেবে। এখানেই রাজনৈতিক আদর্শে বিরোধ, মাতৃভাষা প্রেমবোধ আর জাতীয়তার সংকীর্ণচিন্তা ক্রমশ প্রকাশ পেল। সুতরাং যারা সংগ্রামে টিকে থাকবার তারা শত জেলজুলুম, নানাবিধ চক্রান্ত আর বাধা সত্ত্বেও আন্দোলনের অভ্যন্তরে রয়ে গেলেন। অপসারিত হলো- যারা প্রগতির সঙ্গে আপোস করবে না, তারা। যারা পাকিস্তানী জাতীয়তার বিশ্বাস নিয়ে আন্দোলনে এসেছিল, তারা। সুতরাং ১৯৪৯ থেকে এ আন্দোলনের নেতৃত্ব বর্তাল গিয়ে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনগুলোর ওপর। প্রবল বিস্ফোরণ ঘটল ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর রহমান- এরা শহীদ হলেন। সে কী অভূতপূর্ব আলোড়ন মানবপ্রাণে! দিকবিদিক চমকিত হলো ঘৃণার পাহাড় জমে উঠল একদিকে, আর একদিকে আন্দোলনে নামল মানুষের ঢল।

এ যাবতকালে বাঙালী সংগ্রাম জন্ম দিয়েছে অগণিত গান, নাটক, গল্প, নৃত্যনাট্য, চিত্রকলা। বিদ্রোহ আর বিপ্লবের সময় আর স্থানে, সংগ্রামে আর আন্দোলনে লোকজ সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এই কালের নানান কবির নানান গাথা, বীরত্বগাথা, চারণকবি মুকুন্দ দাসের স্বদেশী গান, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের দেশপ্রেমের অগণতি লেখা ও সুর করা গান, কবি কিশোর সুকান্ত ভট্টাচার্যের সুতীক্ষè কবিতার ধারাল অস্ত্র আমাদের চলার পথে দিয়েছে অবারিত সাহস, অফুরন্ত বৈভব, যা দিয়ে আমরা একাত্তরকে করেছি স্মরণীয় বাঙালী জীবনে, পাকিস্তানী দস্যুদলকে বাইশ বছর পর এদেশ থেকে হটিয়ে, আগ্রাসী শক্তিকে পরাভূত করে।

স্বাদেশিকতার মহতী আদর্শ, আর অকাতরে প্রাণ বলিদানের অকুতোভয় সৈনিকদের আন্দোলনের গান বহুকাল আগে লেখা হলেও বাঙালীর প্রাণে যেন আজকের ধ্বনি তোলে।

২. ‘একুশের চৈতন্য সারাদেশে ব্যাপ্ত। আলাদা

করে এ কারও নয়, তেমনি কাউকে বাদ

দিয়েও এ নয়। সারাদেশের শিরায় শিরায়

এমন অগ্নিপ্রভ স্রোত বুঝি আর হয় না,

মাতৃভাষার প্রেরণা ছাড়া এমন দোলা বুঝি

মানুষের মনে আর কখনও লাগে না।

রক্ত দিয়ে আমরা প্রতিটি হৃদয় এই আত্ম

দর্শনকে অর্জন করেছি; রক্তের অক্ষরে

আমাদের প্রতিটি সাহিত্যিক এই মহাগাথাকে লিপিবদ্ধ করেছেন। তাই সারাদেশে

একুশের কাহিনী আবেগে অমোঘ, বিশ্বাসে

অনন্য।’

বাঙালী জাতির সংগ্রামসংক্ষুব্ধ জীবনে বিস্ময়কর এই দিনটি আজও হতবাক করে দেয় শুধু আমাদের নয়, বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে। যখন শোনে আমাদের এই সাহসী অভিযাত্রার কথা।

কিন্তু আজ আমাদের এই বাংলাদেশেই কিছু কুলাঙ্গার বাংলাভাষীকে যখন অযথা ইংরেজীর ঢোল পেটাতে দেখি, তাদের জীবনযাত্রার দিনলিপি যখন ইংরেজীতে লেখে, ছেলেমেয়েদের যখন বৈদেশী নগর আর নাগরে বিমোহিত হতে দেখি তখন চিত্ত উত্তপ্ত হয়। মাতৃভাষা বিহনে বাঙালীর তো প্রাণ জুড়ায় না। কিন্তু সেই বাংলাভাষার বিকৃত উচ্চারণ, আর পশ্চিমী ঢঙে বাংলার ব্যবহার, কিংবা বাংলা বাক্যগঠনে অযথা ইংরেজীর বাহুল্য প্রয়োগ মনকে পীড়িত করে। তখন রক্ত চড়ে যায় মাথায়। এর পাল্টা যে নেই, তা বলব না। কিন্তু কোন গোঁড়ামিকেই আমরা প্রশ্রয় দিতে রাজি নই। কারণ অযৌক্তিক ও মূল্যহীন বিরোধী কেবল সৎ ও বাস্তব দাবিকেই উপেক্ষা করে। যারা উভয় গোঁড়ামির পক্ষে মাতম তোলেন তাদের প্রত্যেকেরই অন্তর্নিহিত কামনা-সত্যিকার দাবিটি যেন প্রতিষ্ঠিত না হয়।

তাই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূচনার কিছু পর থেকেই তো আমরা যৌক্তিকভাবেই চেয়েছিলাম বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে। চেয়েছিলাম তৎকালীন পাকিস্তানের সকল অঞ্চলের সকল ভাষার সমান অধিকার। সংখ্যাগুরু নাগরিক আমরা ছিলাম বাঙালী। কিন্তু বাংলাভাষাকে কখনই আমরা অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোন দাবি বা চেষ্টাই করিনি। যার ফলে উর্দুভাষী বহু বন্ধু আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলনকে আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছিলেন। যার প্রমাণ আজও সংবাদপত্রের পাতায় বিদ্যমান। কিন্তু কিছু বাঙালী অথবা ঘোষণা বাংলাভাষী- তারাই আজ বাংলার বিরোধিতা করতে বাংলার মাটিতেই সাহস দেখাচ্ছে- কোন্ খুঁটির জোরে জানি না।

কিন্তু যার যত খুশি বাংলার বিরোধিতা করতে পারে- অসুবিধা নেই; কারণ যারা পাকিস্তানী শোষণকালে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষার বিরোধিতা করত, তারাই বিতাড়িত ও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। বাংলা আজও বাংলায়ই আছে। প্রাচীন বঙ্গীয় কবি আব্দুল হাকিম দ্বাদশ শতকে লিখেছিলেন-

যে সব বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন’ জানি।

৩.

১৯৫২ সালের রক্তঝরা একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে আমাদের বাংলা সাহিত্যে, সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে এবং এ সময়ে সৃষ্ট কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও রাজনীতিকরা আজও ব্যাপ্ত চরাচরে। আমাদের কবিরা লিখেছেন অসংখ্য কবিতা ও গান। আজও বায়ান্না একুশকে ঘিরে কত গল্প কবিতা গান রচিত হচ্ছে। শুমার আর তো আর দেখা হয়নি। তবু এদেশে রাজনৈতিক প্রগতির সঙ্গে সঙ্গে গণমানুষের জীবন-সংগ্রাম আমাদের নানান ধরনের গানে ফুটে উঠেছে। আর এইসব অনুষ্ঠান-আয়োজনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, সুকান্ত ভট্টাচার্য, রমেশ শীল, হাকিম ভাই, মোশাররফ উদ্দিন আহমদ, আব্দুল লতিফ, হাসান হাফিজুর রহমান, আব্দুল গাফফার চৌধুরী, তোফাজ্জল হোসেন, বদরুল হাসান, হেমাঙ্গ বিশ্বাস, গাজীউল হক, ফজলে লোহানী, ড. মনিরুজ্জামান, ইন্দু সাহা, নাজিম মাহমুদ, আবু বকর সিদ্দিক আখতার হোসেন, রুহুল প্রামাণিকসহ আরও অনেকের লেখা গান সুর করেছেন আমাদের প্রিয় শিল্পী আলতাফ মাহমুদ, শেখ লুৎফুর রহমান, সাধন সরকার, নিজামুল হক, আব্দুল লতিফ, সুখেন্দু চক্রবর্তী, হাকিম ভাই, আব্দুল আজিজ বাচ্চু, অজিত রায়, মাহমুদুন নবী, রবিউল হোসেন।

ভাষা আন্দোলন-মুক্তিকামী বাঙালীর সবচেয়ে গৌরবের আর বিশাল ও ব্যাপক সংগ্রামের। ঔপনিবেশিক পাকিস্তানী দখলদার শাসকচক্র ও তৎকালীন সাড়ে চার কোটি পূর্ববঙ্গীয় মানুষের জীবনাচার, সংস্কৃতি, সমাজবদ্ধতা, অর্থনীতি, রাজনীতি, এমনকি তাঁর ভাষা, সাহিত্য ও কৃষ্টি পাল্টে দেয়ার কূটকৌশল দারুণ এক চাল চালল বটে; কিন্তু সে চালে তারা বেচায়েন হয়ে পড়ল। শাসনে স্বস্তি রইল না। সারা পাকিস্তানের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি লোকের মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে ভিনদেশী অজ্ঞাত ও অখ্যাত ভাষা উর্দুকে জনগণের ওপর চালিয়ে দিতে চাইল। ভেবেছিল, মোহাম্মদ আলী জিন্নার মুখ দিয়ে একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা প্রকাশিত হলে কোন ব্যক্তিই এর প্রতিবাদ করতে সাহস করবে না, বরং সোল্লাসে মেনে নেবে। না, তা হলো না। ঘটল উল্টো। সাধের পাকিস্তানের প্রাণপ্রিয় অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা কায়েদে আজম-এর মুখের ওপর কয়েকজন অমিতবিক্রম বাঙালী তরুণ এর তীব্র প্রতিবাদ করল।

৪.

প্রতিবাদে প্রচ- ঝড় তুলল বাংলায়। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান)। ছাড়িয়ে বাংলার প্রান্তরে পৌঁছে গেল ঝড় ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে। সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর প্রাণ দিয়ে মাতৃভাষার অবমাননাকে প্রতিরোধের দুরন্ত জোয়ার সৃষ্টি করে গেলেন। আমরা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে চেয়েছিলাম। আমরা দাবি করেছিলাম সকল ভাষার সমান মর্যাদা। এই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন পরিচালনাকালে বাঙালী স্বাজাত্যবোধ আমাদের মধ্যে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য গান, কবিতা, নাটক ও উপন্যাসের। আমাদের দেশের বহু রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের গান রচনা করেছেন। যা আমাদের জীবন-সংগ্রামের পথে প্রত্যহ প্রেরণা জুগিয়েছে সাহস দিয়েছে। তারা হয়ত কোনদিন গান লেখেননি। কিন্তু তাদের গান অমরগাথা হয়ে রয়েছে, যে গানগুলো আমাদের মুক্তিসংগ্রামের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে মানুষের মনে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে।

প্রকৌশলী মোশাররফ উদ্দিন আহমদ সার্ভেয়ার জেনারেল অব পাকিস্তান অফিসে চাকরি করতেন। তিনি রচনা করলেন প্রথম প্রভাতফেরির গান আর তাতে সুরারোপ করলেন আলতাফ মাহমুদ ও শেখ লুৎফর রহমান- বলতে গেলে যৌথভাবেই। মোশাররফ উদ্দিন আহমদের বাসাই বসেই এ কাজটি সেদিন সম্পন্ন করে ছিলেন শিল্পীদ্বয়।

মৃত্যুকে যারা তুচ্ছ করিল

ভাষা বাঁচাবার তরে

আজিকে স্মরিও তারে।

কোথায় বরকত কোথায় সালাম

সারা বাংলা কাঁদিয়া মরো।

মোশাররফ উদ্দিন আহমদ ছিলেন রুচিশীল গণতন্ত্রমনা মানুষ পাকিস্তানী শাসকদের খবরদারিতে চাকরি করলেও বাঙালী সংস্কৃতির ঐতিহ্য আর গৌরব লালিত্যে ছিলেন দৃপ্ত। তাই একুশে বিকেলের হত্যাকা-ের আঘাত তাঁর চৈতন্যকে করেছিল শাণিত।

মোশাররফ উদ্দিনের স্ত্রীও ছিলেন সংস্কৃতিমনস্ক এবং রুচিশীল। সেভাবেই তৈরি করছিলেন ছেলেমেয়েদের। তাই প্রায়শই তাদের বাড়িতে বাঙালী-আড্ডা বসত। আর সে আড্ডায় আসতেন শেখ লুৎফর রহমান, নিজামুল হক, মোমিনুল হক, আলতাফ মাহমুদ প্রমুখ। এছাড়া মোশাররফ উদ্দিনের ছোট ভাই মহিউদ্দিন আহমদ (বরিশালের মহিউদ্দিন নামে সমধিক পরিচিত এবং বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতা) তখন বেশ নামকরা রাজনৈতিক কর্মী এবং জেলা খেটেছেন, জুলুম সইছেন। সুতরাং সরলমনা বাঙালী মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর এর একটা প্রভাব দারুণভাবে কাজ করেছিল।

শোনা যায়, আলতাফ মাহমুদ এখানে বসেই সুর করেছিলেন আর শেখ লুৎফুর রহমান কিছুটা ঘষামাজা করে দিয়েছিলেন আরোপিত সুরটাকে। অবশ্য লুৎফর রহমানকে যখন জিজ্ঞেস করলাম তিনি নিশ্চিত বলতে পারলেন না কিছুই দুজনার মিলিত প্রয়াসের কথাই বললেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের তুখোড় ছাত্র কর্মী যিনি ঐতিহাসিক আমতলা অনুষ্ঠিত ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন, সেই বজ্রকণ্ঠের ছাত্রনেতা, গাজীউল হক রচনা করলেন :

ভুলব না ভুলব না ভুলব না

একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না

লাঠিগুলো আর টিয়ারগ্যাস

মিলিটারি আর মিলিটারি

ভুলব না...

প্রখ্যাত গণসঙ্গীত গায়ক ও সুরকার, নৃত্য পরিকল্পক নিজামুল হক গানটির সুর করলেন। তৎকালীন জনপ্রিয় একটি চলচ্চিত্রের দেশপ্রেমমূলক হিন্দি গান ‘দূর হাটো, দূর হাটো, দূর হাটো, দুটো এ দুনিয়া ওয়ালে’- এর সুরে শব্দগুলোকে স্থাপন করলেন, তারপর প্রভাতফেরিতে গাওয়া হলো। বেশ কয়েক বছরই উল্লেখিত গানটি নিয়মিত গাওয়া হয়েছে। আজকাল খুব একটা শোনা যায় না।

প্রখ্যাত কবিয়াল শ্রদ্ধেয় রমেশ শীল নিজের লেখায় গাইলেন :

ভাষার জন্য জীবন হারালি

বাঙালী ভাইরে রমনার মাটি রক্তে ভাসালি

(বাঙালী ভাইরে) বাঙালীদের বাংলাভাষা জীবনে-মরণে ?

মুখের ভাষা না থাকিলে জীবন রাখি কেমনে ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখলেন একটি কবিতা :

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি?

গানটি প্রথম সুর করলেন প্রখ্যাত লোকপ্রিয় গায়ক আব্দুল লতিফ। এদিকে তখনও স্বল্প পরিচিত এক সংস্কৃতিকর্মী বরিশালের গণশিল্পী ও রাজনৈতিক কর্মী আলতাফ মাহমুদও এতে সুর বসালেন। আর সেই সুর শোনার পর আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় লতিফ ভাই আলতাফকে ডেকে বললেন আমার সুরটা থাক, তোমার সুরেই গেয়ে যাও। আলতাফ মাহমুদের সেই সুরে আজও বাংলার আবালবৃদ্ধবনিতা গায়। বাজে সে সুর বিশ্বময়।

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি।

আমার নয়, সকলেরই বিশ্বাস, বাঙালী জাতি যতদিন বাংলায় কথা বলবে ততদিন এই গান সে গাইবেই। হাজারো ক্রুরশক্তি গলা টিপে ধরলেও এ জাতির গলা থেকে এ গান কেউ আর কোনদিন কেড়ে নিতে পারবে না।

একজন জননন্দিত লোকশিল্প আব্দুল লতিফ, দেশকে ভালবাসেন, মাতৃভাষাকে ভালবাসেন, তাই রচনা করলেন এক সুদীর্ঘ গান, পাঁচালী, কীর্তন, জারি, সারি, নানা ঢঙে সুর বাঁধলেন;

ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়

ওরা কথায় কথায় শিকল পরায়

আমার হাতে পায় ?

গানটি প্রথম গাওয়ার পর মানুষের মনে যে হৃদয়স্পর্শী আবেগ সৃষ্টি করেছিল, মানুষকে অনুপ্রেরণায় উজ্জীবিত করেছিল তাঁর বর্ণনা দেয়া বড়ই কঠিন। শিল্পী লতিফের আবেগময় পরিবেশনা গানটিকে চিরভাস্বর করে রেখেছে।

ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং গণনাট্য সংঘের একজন বলিষ্ঠ সংগঠক সিলেট হবিগঞ্জের গণগায়ক সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস লিখলেন-

শোনো দেশের ভাই ভাগিনী

শোনো এক আচনক কাহিনী

কান্দে বাংলা জননী ঢাকার শহরে ?

বাংলার চারণকবি আব্দুল হাকিম। খুব একটা লেখাপড়া নেই। কিন্তু মন তাঁর সমৃদ্ধ বাংলার জন্য, বাংলার ভাষার জন্য। সভা-সমিতিতে, মাঠে-ময়দানে খালি গলায়, হারমোনিয়াম ও তবলা ছাড়া গাইতেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল তাঁর অসাধারণ জনপ্রিয়তা। পল্টন মানেই হাকিম ভাইয়ের গান-মানত সবাই। তিনি গাইলেন :

বাংলা মোদের মাতৃভাষা

বাংলা মোদের বুলি

সেই বাংলায় কইলে কথা

বুকে চালায় গুলি।

প্রগতিশীল কবি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কৃতী ছাত্র হাসান হাফিজুর রহমান লিখলেন :

মিলিত প্রাণের কলরবে

যৌবন ফুল ফোটে রক্তের অনুভবে।

শহীদ মুখের স্তব্ধ ভাষা

আজ অযুতজনের বুকের আশা

ওদের মরণে প্রাণ পেলাম আজ আমরা সবে।

প্রখ্যাত গণশিল্পী-সুরকার শেখ লুৎফর রহমানের সুরে গানটি অচিরেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

খুলনা বাগেরহাটের এক ‘তেলী’ শামসুদ্দিন আহমেদ হাটে-বাজারে তেল বিক্রি করেন আর গান বাঁধেন মানুষের দুঃখ-বেদনা আর আনন্দ-উল্লাসের। পিশাচ মুসলিম লীগ শাহীর নির্বিচার ছাত্রহত্যায় তাঁর মনেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আর তাই তিনি এক অনন্যসাধারণ হৃদয়স্পর্শী গান রচনা করলেন-

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন করিলিরে বাঙালী

ঢাকার শহর রক্তে রাঙাইলি।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রাম্যকবির মনে যে আকুতি প্রাণের টানে তা এসে গেল ঢাকা শহরে, মিশে গেল সংস্কৃতি আন্দোলনের মূল স্রোতধারায়। আলতাফ মাহমুদ যখন শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে হারমোনিয়ামের রিডে হাত রেখে বুকটা টান করে গলাটাকে আকাশপানে তুলে ধরতেন গান আর আবেগাপ্লুত বলিষ্ঠ কণ্ঠে গাইতেন এই গান তখন শ্রোতৃম-লীকে আমি ফুঁপিয়ে কাঁদে দেখেছি।

আমাদের দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠক, ধারাবিবরণী রচয়িতা, বলিষ্ঠ ধারাভাষ্য পাঠক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকর্মী বদরুল হাসান ৬০ সালে লিখলেন :

ঘুমের দেশে ঘুম ভাঙতে

ঘুমিয়ে গেল যারা

জ্বলছে স্মৃতি আলোর বুকে

ভোরের করুণ তারা ?

১৯৬৭ সালে কিছু নতুন গান জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। অনুষ্ঠান পল্টনে, শহীদ মিনারে, বাংলা একাডেমি অঙ্গনে টিএসি চত্বরে।

১. ঐ শোনো শহীদের আহ্বান

২. রক্ত শিমুল তপ্ত পলাশ দিল ডাক-সুরারোপ করলেন গণশিল্পী সুরকার শেখ লুৎফর রহমান।

৩. অনেক একুশ দেখেছি, দেখেছি, তোমায় নাগরিক বেশে রচয়িতা- তোফাজ্জল হোসেন

৪. এই পথ এই কালো পথ

পিচে ঢাকা ইতিহাস- একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা থেকে সংগৃহীত এবং মাহমুদুন্নবীর করা সুরে গীত।

৫. শীতর পৃথিবী অবশ নগর-ফজলে লোহানী, সুরারোপ করেছিলেন খান আতাউর রহমান।

৬. রক্তে আমার আবার প্রলয় দোল- আব্দুল গাফফার চৌধুরী। এটির সুর করেছিলেন শ্রদ্ধেয় শেখ লুৎফর রহমান।

অসংখ্য গান রচিত হয়েছে এবং আজও হচ্ছে এই মহান রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ঘিরে। কারণ আমাদের মুক্তির লড়াইয়ে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা দিয়েছে এবং জাতীয় সম্ভ্রম রক্ষাকারী এই ঘটনাটি। প্রতিটি বছরে যখন একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্যাপনের সময় আসে তাকে ঘিরে শুরু হয় এক অভাবনীয় কর্মতৎপরতা, সাংগঠনিক ব্যস্ততা।