১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলা কাব্যের শিকড় সন্ধান ও প্রশস্তি

  • ড. সফিউদ্দিন আহমদ

পণ্ডিত ও ভাষাতাত্ত্বিকদের ভাবনার বিষয় হতে পারে- ভাষার নামে দেশ নাকি দেশের নামে ভাষা। আমাদের গর্ব ও গৌরবের বিষয় এই যে, এ দু’টি অভিধাই বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। নির্ধারিত সময় ও তারিখ ঠিক করে কোন ভাষায়ই সাহিত্য চর্চা হয় না। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য চর্চার ইতিহাস আলোচনা প্রসঙ্গে উপর্যুক্ত কথাটি আমাদের বিশেষভাবে স্মরণে রাখতে হবে। বাংলা ভাষা পরিণত ও স্বাতন্ত্র্য রূপ লাভ করার আগেও বাংলাদেশ এবং বাঙালি ছিল। সাহিত্যের যুগবিভাগের কালধারার প্রাক প্রাচীন ও প্রাচীন যুগে অনেক বাঙালি কবি ছিলেন। কাব্য রচনায় তাঁরা উৎকৃষ্ট শিল্পগুণের পরিচয় দিয়েছেন। সে সময় বাঙালি কবিদের মধ্যে অনেকেই সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশ বা অবহট্ট ভাষায় কাব্য রচনা করেছেন। কোনো কোনো সাহিত্যের ইতিহাসবেত্তার মতে, বিশাখ দত্তের মুদ্রারাক্ষস, নারায়ণ ভট্ট বা ভট্টনারায়ণের ‘বেণীসংহার’ কবি মরারির ‘অনর্ঘ রাঘব’, ক্ষেমিশ্বরের ‘চ- কৌশিক’ প্রভৃতি নাটক সেদিনকার বাংলাদেশের বাঙালি কবিদের রচনা। চুটকি কবিতার তখন খুব উৎকর্ষ ঘটেছিল। নাটক ও চুটকি কবিতা ছাড়াও সে সময়ের বড় দু’টি কাব্য সংকলন পাওয়া গেছে। নেপাল থেকে প্রাপ্ত একটি কাব্য সংকলনের কোন নাম না পেয়ে সম্পাদনার সময় এফ ডাবলু টমাস এর নামকরণ করেন ‘কবীন্দ্র বচন সমুচ্চর।’ পরে অবশ্যি সংকলনের ভেতরই এর নাম পাওয়া গেছে ‘সুভাষিত রত্ন কোষ।’

‘সুভাষিত রত্নকোষে’ ১১১ জন কবির নাম পাওয়া যায়। এর মধ্যে বেশ ক’জন কবি বাঙালি ছিলেন এবং নামেই এই সাক্ষ্য মেলে।

একই সময়ে শ্রীধরদাস সংকলিত ‘সদুক্তিকর্ণামৃত’ একটি উল্লেখ্য সংকলন। সংকলনে মোট কবির সংখ্যা ৪৮৫ জন। এর মধ্যে ৮০ জন বাঙালি কবির নাম পাওয়া যায়। এই কবিদের মধ্যে কেহ কেহ রাজা, রাজপুত্র ও রাজামাতা এবং সাধারণ বাঙালি ছিলেন।

সংস্কৃত ভাষায় ‘রামচরিত’ কাব্যের কবি অভিনন্দ নিজকে ‘গৌড়ীয় কবি’ হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন। সংস্কৃত ভাষায় এটি বাঙালি কবির লেখা রামচরিতের ওপর প্রথম কাব্য। অন্য এক ‘রামচরিতের’ কবি সন্ধ্যাকর নন্দী এবং বিখ্যাত কবি সাগর নন্দীও বাঙালি ছিলেন। অন্য একজন কবির প্রকৃত নাম পাওয়া যায় না। তবে নিজকে তিনি ‘বঙ্গাল কবি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে গর্ববোধ করেছেন। একটি শ্লোকে তিনি গঙ্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করতে গিয়ে নিজকে শুধু ‘বঙ্গাল কবি’ হিসেবে পরিচয় দিতে গিয়েই গর্ববোধ করেননি তিনি আরও বলেছেন যে, ‘বঙ্গালবাণী’ চিরকালের এক চিরন্তন বাণী। এ অর্থে তিনিই প্রথম ‘বঙ্গালবাণী’ ও বাংলাদেশ বন্দনার প্রথম কবি। অন্য অর্থে বলা যায়, বাংলাদেশকে নিয়ে তিনিই প্রথম দেশপ্রেমের কবিতা লিখেছেন।

বাংলা ভাষার প্রতি বিদ্বেষ প্রাচীনকাল থেকেই। বার বার বাধার আল ও প্রাচীর ডিঙিয়ে বাংলা ভাষাকে আজকের পর্যায়ে আসতে হয়েছে এবং এর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখতে পাব যে-

সেই প্রাচীনকাল থেকেই আর্যদের বাংলা, বাঙালি ও বাংলা ভাষার প্রতি একটা অবজ্ঞা, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যপূর্ণ মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে। আর্য সংস্কৃতির বাইরে যারা তারাই ছিল ঘৃণা ও অবজ্ঞার পাত্র এবং আর্য ভাষা ছাড়া অন্য ভাষাকেও মনে করত অন্ত্যজজনের ভাষা। শুধু ভাষা কেন আর্যদের ধর্মগ্রন্থ এমনকি পুরাণ পড়াও বাঙালিদের জন্য নিষেধ ছিল-

পুরাণ পড়িতে নাই শূদ্রের অধিকার।

পাঁচালী পড়িয়া তর এ সংসার!

আমরা জানি পরবর্তীকালে বাংলাদেশে মুসলিম অধিকারের ফলেই শূদ্রেরা পুরাণ পড়ার সাহস ও অধিকার পেয়েছিল-

ভগবৎ শুনিল আমি প-িতের মুখে।

লৌকিকে কহিয়ে সার বুঝ মহাসুখে।

তাই দেখা যায় আর্যদের কাছে বাঙালি যেমন পাপ, অসুর, রাক্ষস, পিশাচ, পক্ষী, যাযাবর, বর্বর ও দস্যু হিসেবে ঘৃণিত, বাংলা ভাষাও তেমনি এ ঘৃণা ও গ্লানির পঙ্কেই নিমজ্জিত।

‘ঐতরেয় আরণ্যক’ গ্রন্থের একটি পদে এমনি ঘৃণা ও অবজ্ঞায় বাঙালিদের বলা হয়েছে ‘বায়াংসি বঙ্গবগধেস্বর পাপ’- এখানে ঘৃণা ও অবজ্ঞায় বাঙালিদের পক্ষী জাতি এবং বাংলা ভাষাকে পক্ষী শ্রেণীর ভাষা বলা হয়েছে। ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণে’ বাঙালিদের সরাসরি দস্যু ও পিশাচ এবং বাংলা ভাষাকে পিশাচের ভাষা বলা হয়েছে। ভীমের দিগি¦জয়ে বাংলাদেশের সমুদ্র তীরের অধিবাসীদের ম্লেচ্ছ বলা হয়েছে এবং ভাগবৎ পুরাণে এ অঞ্চলের লোকদের বলা হয়েছে ‘পাপ।’ ‘বোধোদয়ের ধর্মসূত্রে’ পূর্ববাংলার লোকদের বলা হয়েছে ‘সংকীর্ণ যোনয়’: আর্যরা এখানে এলেই তাদের প্রায়শ্চিত্ত ও মনস্তাপ করতে হতো। শুধু আর্যরা কেন প্রাচীন জৈন এবং বৌদ্ধ গ্রন্থেও বাঙালি এবং বাংলা ভাষাকে তাচ্ছিল্য ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। ‘আর্যমঞ্জুশ্রীকল্প’ গ্রন্থেও তৎকালীন বাঙালিদের ভাষাকে বলা হয়েছে অসুরের ভাষা।

পক্ষী, রাক্ষস, পিশাচ, অসুর, পাপ, যাযাবর ও ম্লেচ্ছ ভাষা বাংলায় দেবদেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনা ও রচনা এবং অনুবাদ করা ছিল মহাপাপ আর তা কেউ করলে ছিল চরম শাস্তির বিধান। দেবভাষা সংস্কৃত থেকে কেউ কিছু বাংলায় অনুবাদ করলে তার চোখে ও কানে উত্তপ্ত গলিত সীসা ঢেলে দেবার ব্যবস্থা ছিল এবং তার স্থান নির্ধারণ করা হতো রৌরবে।

অষ্টাদশ পুরাণানি রামস্য চরিতানিচ

ভাষায়াং মানবঃ শুত্বা রৌরবং নরকংব্রজেৎ।

সেদিন মুসলমানরাও মনে করত যে, আরবি খাস আল্লাহর মুখের ভাষা আর এ ভাষায় কোরান-হাদিস রচিত। সুতরাং কাফেরী ও মোনাফেকী এবং হিন্দুস্থানী ভাষা বাংলায় কোরান- হাদিস অনুবাদ করলে তা হবে অমার্জনীয় পাপ।

বিজাতি, বিভাষীর বার বার আক্রমণ, রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও সমস্ত বাধাবিপত্তিকে উপেক্ষা করে বাঙালি জাতি যেমন স্বকীয়তা, স্বাতন্ত্র্য ও আত্মমর্যাদায় সগৌরবে বিশ্বের বুকে শির তুলে দাঁড়িয়েছে তেমনি সে বিজাতির যা ভাল ও মহৎ তা আত্মস্থ ও আত্মসাতের মাধ্যমে নিজের করে নিয়েছে কিন্তু অপরের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে দেয়নি। রাজরোষ, নরক ও দোজখের ভয় এবং আক্রমণের ঝড় ও রাজনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে, বিভাষার প্রভাবকে উপেক্ষা করে, অবহেলা, অবজ্ঞা, ঘৃণা ও তাচ্ছিল্যকে ভ্রƒক্ষেপ না করে বাংলা ভাষা আজ প্রাণসম্পদ ও প্রাণৈশ্বর্যে ঋদ্ধ এবং স্বতন্ত্র ও স্বকীয় মহিমায় উজ্জ্বল ও ভাস্বর।

ব্রাহ্মণ্য প্রতাপ, শাস্ত্রীয় বিধান উপেক্ষা করে বাংলা ভাষায় রামায়ণ-মহাভারত করেছিলেন বলে সেদিন বলা হতো-

কৃত্তিবেসে, কাশীদেশে আর বামুণ ঘেঁষে

এ তিন সর্বনেশে।

আমাদের প-িতদের অভিমত, দেশ বিভাগের পর থেকেই ভাষা আন্দোলন ও মাতৃভাষার প্রতি সচেতনতা। কিন্তু এ অভিমত যুক্তিসঙ্গত ও যথার্থ নয়। চর্যাপদের সময় থেকেই বাংলা ও বাঙালি এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল এবং তখন থেকেই বাঙালির অস্তিত্ব, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যের সংগ্রাম শুরু হয়। বাঙালি কবি ভুসুকু তাই বলেছেন- ‘ভুসুকু তুই আবার বঙ্গালী ভইলে’

প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতি, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি আর্যদের রুদ্ররোষ ছিল। এ রোষের কবল থেকে রক্ষা পাবার জন্যই মালাধর বসু বাংলায় ভাগবৎ, বিষ্ণু পুরাণ এবং হরিবংশের অনুসরণের শ্রীকৃষ্ণ বিজয় কাব্য লিখতে গিয়ে স্বপ্নাদেশের আশ্রয় নিয়েছিলেন-

স্বপ্নে আদেশ করেন প্রভু ব্যাস তাঁর আজ্ঞা মতে গ্রন্থে করিনু রচনা।

আর্য সমাজ বাংলাকে অসুর, পাপ ও রাক্ষসের ভাষা হিসেবে ঘৃণা, অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য করেছে। সে সময় বাংলা ভাষা চর্চায় ছিল নরকের ভয় আর ধর্মীয় ও সামাজিক কড়া শাসনÑচোখে ও কানে গলিত সীসা ঢেলে দেবার ভয়। মুসলমানদের কাছে বাংলা ছিল কাফেরী ও হিন্দুস্থানী ভাষা। এ ভাষা কোরান ও হাদিস অনুবাদে ছিল হাবিয়া দোজখের ভয় কিন্তু সে মধ্যযুগেও অনেক হিন্দু এবং মুসলমান কবি বাংলা ভাষা চর্চায় যে দুঃসাহসী ও গভীর শ্রদ্ধা দেখিয়েছেন তা সত্যিই বিস্ময়ের বিষয়।

শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষা প্রসঙ্গটি তখন অনেকেই সচেতনভাবে ভেবেছিলেন।

গবর্নর স্যার জনশোর তাঁর ঘড়ঃবং ড়হ ওঘউওঅঘ অঋঋঅওজঝ এ বলেছেন-

১। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ বঞ্চিত একটি জাতিকে অন্ততপক্ষে মাতৃভাষা শিক্ষালাভের সুযোগ করে দিতে হবে।

২। মাতৃভাষার মাধ্যমেই পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-দর্শন শিক্ষার সুব্যবস্থা করে দিতে হবে।

ডিরোজিও’র শিষ্য ইয়ং বেঙ্গলরাও শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে মাতৃভাষার দাবি তুলেছিল। তাদের ‘সর্বতত্ত্বদীপিকা’ নামক সংগঠনের ঘোষণাপত্রে ছিল-

১। মাতৃভাষা বাংলায় শিক্ষা ও সাহিত্যচর্চা করা

২। সংগঠনের সমস্ত কাজকর্ম মাতৃভাষা বাংলায় পরিচালনা করা

৩। মাতৃভাষা চর্চার জন্যই তাদের জ্ঞানান্বেষণ পত্রিকা দ্বিভাষিক অর্থাৎ বাংলা ও ইংরেজীতে প্রকাশ করা হতো।

প্রাচ্যপ্রেমিক উইলসন সাহেব মাতৃভাষা বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন-

জাতীয় শিক্ষা ও সাহিত্য কেবল মাতৃভাষার মাধ্যমেই গড়ে উঠতে পারে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যদি কেবল বিদেশী ভাষার গ-ির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে তবে তা সমাজের একদল মুষ্টিমেয় লোক যাদের অর্থ ও অবসর দু’ই-ই আছে তাদের বিলাসের বিষয় হয়ে উঠতে পারে এবং ইংরেজী কখনও এদেশের মানুষের শিক্ষার বাহন হতে পারে না। ইংরেজীর মাধ্যমে শ্রেণীগত শিক্ষার ভিত গড়ে উঠতে পারে আর মাতৃভাষার মাধ্যমে জাতীয় শিক্ষার বিকাশ ঘটে।