২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বাংলা ভাষা আমার সুখ-দুঃখ

  • মোহাম্মদ গোলাম রাব্বানী

১৯৪৪ সালের শীতকাল। আমি তখন পিরোজপুর সরকারী স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ি। আব্বা স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক। সে সময় আব্বা পাবনা জিলা স্কুলে বদলি হলেন এবং বিদায়কালে স্কুলের ছাত্ররা তাঁকে অনেক বই উপহার দিল। সেগুলোর মধ্যে ছিল রবীন্দ্রনাথের বলাকা কাব্যগ্রন্থ আর নজরুলের অগ্নিবিনা। পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হয়ে বার্ষিক পরীক্ষা দিয়ে যথেষ্ট সময় পেলাম এবং কাব্যগ্রন্থ দুটির কবিতাগুলো কখনও মনে মনে, কখনও উচ্চৈঃস্বরে পড়তে ব্যস্ত থাকলাম- সেগুলোর অর্থ বোধগম্য হোক না হোক। ছন্দের জাদুতে শব্দের মায়ায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এই প্রথমবার মাকে ভালবাসারতুল্য আর একজনকে পেলাম। এ এক নতুন জগতে প্রবেশ করলাম। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে কৈশোরের প্রেমের উন্মেষ হলো। মা আর মাতৃভাষা একাকার হয়ে গেল।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ আমি অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। দ্বিপ্রহর। আমাকে পাওয়া গেল পাবনা শহরের রাস্তায় ছাত্রদের মিছিলে। সকলের সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে চিৎকার করে চলেছি ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই।’ বাইরের রোদ আর ভেতরের ক্রোধ মিলে আমাদের সমবেত সেস্নাগান উচ্চ থেকে ক্রমশ উচ্চতর হয়ে শেষ হলো এডওয়ার্ড কলেজ প্রাঙ্গণে। বাসায় ফিরে এসে পড়ার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসে আচমকা মনে হলো পাকিস্তানের রাষ্ট্রটির পূর্ব আর পশ্চিম অংশ মিলে একটি দেশ নয়, দুটি ভিন্ন দেশ। দুই অংশের বাসিন্দারা একই ভাষায় কথা বলে না। আমার মাতৃভাষা যদি কোন দেশের রাষ্ট্রভাষা না হয়, সে দেশ আমার হবে কেমনে!

আব্বা সে সময় বরিশাল জিলা স্কুলের হেড মাস্টার। সেখান থেকে ম্যাট্রিক পাস করে পড়ছি ঢাকা কলেজে। থাকি আরমানিটোলায় ‘বান্ধবকুটির’ ছাত্রাবাসে। ১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির রাতে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে আশপাশে বহুদূর রাত্রিবেলায় দেয়ালে পোস্টার সেঁটেছি। পরদিন দুপুরে ছাত্রাবাসে আমার কক্ষে শুয়ে আছি। এমন সময় খবর পেলাম মেডিক্যাল কলেজের সামনে ছাত্রদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছে। ছাত্রাবাসে যাঁরা ছিলাম তখনই দল বেঁধে বের হলাম। মেডিক্যাল কলেজে পৌঁছে একটি ঘরের মেঝেতে দেখলাম একজন শুয়ে আছেন। তার পরনে পরিষ্কার ধোয়া প্যান্ট ও বুশ শার্ট। প্রশান্ত মুখ, যেন ঘুমিয়ে আছেন। তাঁর পেছন ফিরে দেখি মাথার খুলির পশ্চাদভাগ নেই, পুলিশের গুলিতে উড়ে গেছে। পরে জেনেছি তিনি শহীদ আবুল বরকত। সেই মুহূর্ত থেকে আমি নিশ্চিত হলাম পাকিস্তান রাষ্ট্রে আমার মাতৃভাষার মর্যাদা নেই। পাকিস্তান আমার দেশ নয়।

অবশেষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পত্তন হলো। সে রাষ্ট্রটির সংবিধানে উচ্চারিত হলো ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ কিন্তু আমার মুখের পাত্রটি তো কানায় কানায় পূর্ণ হলো না। লেখাপড়া শেখার বয়ঃপ্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের খুদে নাগরিকদের বাংলাভাষার জাদুর জালে আটকানোর সে শিক্ষাক্রম কই? যদিও বাংলাদেশের সংবিধানে ‘রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি’ ভাগে ১৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑ ‘রাষ্ট্র (ক) একই পদ্ধতির গণমুখী ও সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এবং আইনের দ্বারা সকল বালক-বালিকাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাদানের জন্য; (খ) সমাজের প্রয়োজনের সহিত শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করিবার জন্য এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করিবার উদ্দেশ্যে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা-প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টির জন্য; (গ) আইনের দ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিরক্ষরতা দূর করিবার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।

যা বলছিলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিতে প্রতিটি বাঙালী শিশু কৈশোরে পৌঁছেই মাতৃভাষাকে ভালবাসবে, মা আর মাতৃভাষা তাদের সমান আদরের ধন হবেÑ সে কার্যক্রম, যা বাংলাদেশের সংবিধানে উচ্চারিত সেটা কই? এটাই একমাত্র কার্যক্রম নয়। আর একটি রাষ্ট্রের কার্যক্রম হবে বিশ্বের অন্যান্য ভাষায় লেখা সাহিত্যের ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণাগুলোর নিরবচ্ছিন্ন বঙ্গানুবাদ। আব্বাসীয় খলিফাদের আমলে রাজধানী বাগদাদ শহরে কিংবা মুসলিমশাসিত স্পেনে কর্ডোভা শহরের বিশ্ববিদ্যালয়ে যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অসাধারণ চর্চা হতো তার উল্লেখযোগ্য অংশের ভিত্তি ছিল ইউরোপের অন্যান্য দেশের ভাষায় লেখা পুস্তকগুলোর আরবী ভাষায় অনূদিত সংস্করণ।

এ প্রসঙ্গে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বহুকাল আগে আমাদের সতর্ক করে লিখেছিলেন, ‘মাতৃভাষা ব্যতীত আর কোন ভাষা কানের ভেতর দিয়ে মরমে পশিয়া পরান আকুল করে? কাহার হৃদয় এত পাষাণ যে মাতৃভাষার অনুরাগ তাহাতে জাগে না? পৃথিবীর ইতিহাস আলোচনা করিয়া দেখ মাতৃভাষার উন্নতি ব্যতীত কোন জাতি কখনও কি বড় হইতে পারিয়াছে? পারস্যকে আরব জয় করিয়াছিল। কিন্তু পারস্য আরবের ভাষা লয় নাই; শুধু লইয়াছিল তাহার ধর্মভাব আর কতগুলো শব্দ। যেদিন লাতিন ছাড়িয়া ওয়াইক্লিফ ইংরেজী ভাষায় বাইবেলের অনুবাদ করিলেন, সেই দিন ইংরেজদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন হইল।’