১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গাড়ির সিলিন্ডারে বিপদ জানাল চকবাজার ট্র্যাজেডি

গাড়ির সিলিন্ডারে বিপদ জানাল চকবাজার ট্র্যাজেডি

অনলাইন রির্পোটার ॥ সিএনজিচালিত বাহনের গ্যাস সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার বিধান থাকলেও বেশির ভাগ মালিকই তা মানছেন না বলে অভিযোগ আছে। আর গাড়ির মালিকদের অনীহার কারণে যে বিপদ তৈরি হয়েছে, সেটিরই যেন প্রমাণ দিয়ে গেল চকবাজার ট্র্যাজেডি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আগুনের সূত্রপাত ধরে দুটি গাড়ির মধ্যে পাল্লাপাল্লির পর ধাক্কা লেগে একটির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। গাড়িতে গাড়িতে সংঘর্ষ এর আগেও হয়েছে, কিন্তু এই ধরনের বিস্ফোরণ দেখা যায়নি কখনো। এই বিস্ফোরণের পর ছড়িয়ে পড়া আগুন পাশপাশের বিভিন্ন গ্যাসের সিলিন্ডারে গিয়ে পড়েছে। আর একেকটি গ্যাস সিলিন্ডার যেন বোমার মতো হয়ে গিয়েছিল।

যানবাহনে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারের কী ফল হতে পারে, তা নিয়ে বারবার আশঙ্কার কথা বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু এখনও পুনঃপরীক্ষাবিহীন তিন লাখের বেশি গ্যাস সিলিন্ডার ঘুরছে দেশের সড়কগুলোতে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে সরকারী-বেসরকারী মিলিয়ে ১৮০টি সিএনজি কনভার্সন ওয়ার্কশপ রয়েছে। সিএনজিচালিত গাড়ির প্রচলনের পর গত ১৫ বছরে দেশে আড়াই লাখের বেশি গাড়ি জ্বালানি তেল থেকে সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। এসব গাড়িতে সিলিন্ডার রয়েছে চার লাখের বেশি।

সবশেষ খবর অনুযায়ী ১৫ বছরে মাত্র ৯৪ হাজার সিলিন্ডার রিটেস্ট করা হয়েছে। এ হিসাবে দেশের সড়কে চলাচলকারী গাড়িতে (ট্রাক, বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার) তিন লাখের বেশি সিলিন্ডার এখন পর্যন্ত রিটেস্ট করা হয়নি। অনিরাপদ এসব সিলিন্ডার বিস্ফোরণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা, প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। শেষ তিন বছরে দেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে দুর্ঘটনায় পড়ে ১৭৫টি গাড়ি। এসব দুর্ঘটনায় প্রায় ৫০০ লোকের প্রাণহানি ঘটে।

সিএনজিচালিত যানবাহনের নিরাপত্তার স্বার্থে ব্যবহৃত সিলিন্ডার প্রতি পাঁচ বছর পর পর পুনঃপরীক্ষার বিধান রয়েছে। সব ধরনের সিলিন্ডারের পুনঃপরীক্ষার অনুমোদন দেয় বিস্ফোরক অধিদপ্তর। এ ছাড়া যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

অন্যদিকে সিএনজি রূপান্তরসহ সিলিন্ডারের পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলে সরকারের রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। যানবাহনের গ্যাস সিলিন্ডার ও সার্বিক বিষয়ে নজরদারির দায়িত্বপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পাশাপাশি আছে গাফিলতিও। যে কারণে দেখভাল ও নিয়ন্ত্রণের কাজটা ঠিকভাবে করছে না তারা। দুর্ঘটনার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির পাশাপাশি গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারকারী যানবাহনের মালিকদের অনীহা ও আন্তরিকতাকেও দায়ী করা হয়েছে।

একটি গাড়ির সিএনজি সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার জন্য দুই থেকে তিন দিন সময় লাগে। আর এ কাজ করতে ২০ থেকে ৪০ লিটারের প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য দুই হাজার টাকা, ৪০-৬০ লিটারের জন্য আড়াই হাজার টাকা, ৬০-৮০ লিটারের জন্য তিন হাজার টাকা এবং ৮০ লিটারের বেশি প্রতিটি সিলিন্ডারের জন্য সাড়ে তিন হাজার টাকা খরচ হয়। গাড়ির মালিকরা নিরাপত্তার এ প্রক্রিয়াকে বাড়তি খরচ ও সময় নষ্ট বলে মনে করেন। এক ধরনের অনীহা থেকেই এ কাজ অবহেলায় পড়ে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, মাঝে মাঝে কিছু ব্যক্তিগত গাড়ির সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়া যায়। কিন্তু বাস-ট্রাক বা অন্য বাহনগুলোর বেশির ভাগেরই কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে আছি। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর আমরা তার মাত্রাটা টের পাই। এবারও সেটাই হয়েছে। সবকিছুই অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলছে। এর ফলে গাড়ি বাড়ছে, গাড়ির মালিক বাড়ছে। কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাঠ পর্যায়ে তদারকির জন্য একদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ নেই। আবার সরকারও তাদের প্রয়োজনীয় লোকবল দিতে পারে না।’

‘দীর্ঘ দিনের এমন অবহেলা ও অযত্নেই এখন অহেতুক জানমালের ক্ষতি হচ্ছে। পদ্ধতিগতভাবে যেভাবে কাজগুলো হওয়ার কথা, সেটা না হয়ে একেবারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে হচ্ছে। সরকারকে সহজ চিন্তা করলে হবে না। বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হবে।’

পুনঃপরীক্ষার বিষয়ে গাড়ি ব্যবহারকারীদের অনীহা প্রসঙ্গে এ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘অনীহা কার নাই। সবাই সুযোগসন্ধানী। কিন্তু জনস্বার্থে সরকারের উচিত হবে গাড়ি ব্যবহারকারীদের এ কাজে বাধ্য করানো।