২৬ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মর্মান্তিক অগ্নিকান্ড!

রাজধানী ঢাকার আদি অংশ পুরান ঢাকা বলে পরিচিত অতিরিক্ত জনভারাক্রান্ত। এই পুরান ঢাকার নিমতলীতে প্রায় এক দশক আগে কেমিক্যাল উপাদানের গুদামে অগ্নিকান্ডে বহু হতাহতের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল। এবার একুশের প্রথম প্রহরের কিছু আগে সেই পুরান ঢাকারই চকবাজারে একই ধরনের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে বহুসংখ্যক মানুষের অপমৃত্যুর জন্য আমরা কাকে দায়ী করব? সবার আগে আমাদের নিজেদের দিকেই ফিরে তাকানো কর্তব্য। আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিই না। আমরা ভুল সংশোধনের জন্য আন্তরিক ও জোরালো হই না।

পুরান ঢাকার প্রতিটি ভবন অতিরিক্ত বাসিন্দার ভারে ভারাক্রান্ত। তার অলিগলি অনেক সঙ্কীর্ণ। সেখানে কোন দুর্ঘটনা ঘটলে ভিকটিমদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। এটা হলো বাস্তবতা। আগুন লাগার পর যানবাহন রাস্তার ওপরে ফেলেই বেশ কয়েকজন দৌড়ে স্থান ত্যাগ করে নিজেদের সম্ভাব্য বিপদ থেকে রক্ষা করেন। এ থেকেই বোঝা যায় অগ্নিকান্ডের সময় গোটা সড়ক কতটা অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছিল যানচালক ও আরোহীদের কাছে। চকবাজারের যে ভবনটিতে আগুন প্রথমে ছড়িয়ে পড়ে সেখানে দমকল বাহিনীর অপারেশনে যেতে বিঘ্ন ঘটে এবং বিলম্ব হয়। সময়মতো আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে হয়ত অনেক লোককে বাঁচানো যেত। তাছাড়া অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে গোটা পুরান ঢাকাই। দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে প্রায় প্রতিটি এলাকায়। আবাসিক ভবনেই রয়েছে গুদাম। ফলে কোন কারণে দাহ্য পদার্থের গুদামে আগুন লাগলে গোটা ভবনটিই নিমিষে আগুনের আগ্রাসনে পতিত হয়।

এখন আমরা যদি পুরান ঢাকাকে নিরাপদ করে তুলতে চাই, যদি চাই আগামীতে আর কখনই এ ধরনের ভয়ঙ্কর অগ্নিকান্ডে মানুষ মারা না যাক, তাহলে একের পর এক কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সবার আগে আবাসিক এলাকা থেকে সব ধরনের দাহ্য পদার্থের বা কেমিক্যালের গুদাম সরিয়ে ফেলতে হবে। এরপর আসে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত পদক্ষেপ। সেজন্য অবকাঠামোগত পরিকল্পনা নিতে হবে। রাস্তাগুলোকে বড় করতে হবে, যাতে দমকল বাহিনী ও এ্যাম্বুলেন্স সহজে দুর্গত এলাকায় প্রবেশ করতে পারে। এ যাবত জনপ্রতিনিধিসহ প্রশাসনের যারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ দেখেও দেখেননি, অনিয়ম রোধে কঠোর হননি তাদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে। নিশ্চয়ই দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু সবার আগে চাই সুরক্ষা এবং একই সঙ্গে পুরান ঢাকাবাসীদেরও সচেতনতা। যারা মারা গেছেন তারা ফিরে আসবেন না। কিন্তু পুরান ঢাকাবাসী যেন এ ধরনের মর্মান্তিক মৃত্যুঝুঁকির মধ্যে না থাকেন সেজন্য তো এখন থেকেই পরিকল্পনা নিয়ে সে অনুসারে কাজ শুরু করা দরকার।

চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও স্পীকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আহত ব্যক্তিদের যথাযথ চিকিৎসা এবং নিহত ব্যক্তিদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। দেশের মানুষ মর্মান্তিক অগ্নিকান্ডের ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত। সবারই চাওয়া সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে, যাতে এমনভাবে আর পুরান ঢাকার মানুষকে অপমৃত্যুর শিকার না হতে হয়। নিমতলী, চকবাজারের পর আর কোন নাম যেন ‘ট্র্যাজেডি-বুকে’ ঠাঁই না পায়। চকবাজারের ঘটনায় মৃত্যুর শিকার ব্যক্তিদের পরিবারবর্গের জন্য রইল আমাদের গভীর সমবেদনা। যারা অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিদারুণ কষ্টে রয়েছেন তাদের প্রতিও জানাই আমাদের আন্তরিক সহমর্মিতা।