২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বঙ্গবন্ধু টানেল

নদীর তলদেশ দিয়ে উপমহাদেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ কর্ণফুলী টানেলের মূল খনন কাজ শুরু হচ্ছে আজ ২৪ ফেব্রুয়ারি রবিবার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘টানেল বোরিং মেশিন’ (টিবিএম) দিয়ে খনন কাজের মাধ্যমে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামাঙ্কিত এই টানেল নির্মিত হলে চট্টগ্রাম হবে চীনের সাংহাই শহরের আদলে ‘ওয়ান সিটি টু টাউন।’ চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় নেভাল একাডেমি থেকে আনোয়ারা উপজেলা পর্যন্ত সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল নির্মাণ কাজের ত্রিশ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৪ অক্টোবর স্বপ্নের এই টানেল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর যৌথভাবে স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনা রাষ্ট্রপতি শিং জিনপিং। ২০২২ সালের জুনের মধ্যে নির্মাণ কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি পূরণ হতে যাচ্ছে দেখে বৃহত্তর চট্টগ্রামের মতো সারাদেশের মানুষ যেমন গৌরবান্বিত, তেমনি আনন্দিত। টানেল চালু হলে উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পথে বাংলাদেশ অর্থনীতিকে পূর্বমুখী করার ক্ষেত্রে বড় একটি এগিয়ে যাবে। এই টানেল ধরেই অদূর ভবিষ্যতে যোগাযোগ সম্প্রসারিত হবে দেশের বাইরে। বদলে যাবে চট্টগ্রামের চেহারাও। গড়ে উঠবে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন ও যুগোপযোগী সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা, সংযোগ স্থাপন হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে। যুক্ত করা হবে নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা শহরের সঙ্গে ‘ডাউন টাউনকে’। ত্বরান্বিত হবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ, বৃদ্ধি পাবে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা ও সুযোগ-সুবিধা। গতি পাবে প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ কাজ। নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা সৃষ্টি হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের মধ্যে। আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের অন্তত নব্বই শতাংশ ‘হ্যান্ডলিং’ করে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরটি। তাছাড়া মিয়ানমার, চীন, থাইল্যান্ড পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশের। চট্টগ্রামকে বাদ দিয়ে পূর্বমুখী হওয়া বা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা অসম্ভব। যে কারণে চট্টগ্রামে বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে অনেক ‘মেগা’ প্রকল্প। দেশের বৃহত্তম অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে মীরসরাই, সীতাকুণ্ড ও সোনাগাজী। যার নামকরণ করা হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্পনগর’। আনোয়ারায় হচ্ছে আরেকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল। মহেশখালীর মাতারবাড়িতে এলএনজি টার্মিনাল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ফোর লেন সড়কসহ বৃহৎ প্রকল্পগুলোর কাজ চলমান। টানেল চালু হলে প্রাচ্যের রানী চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানীতে পূর্ণ হয়ে উঠবে।

এটা সত্য এবং বাস্তব যে, প্রতিবেশী ভারতে সড়ক যোগাযোগে স্থলভাগে টানেল থাকলেও নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণে সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম। অবশ্য ভারত মুম্বাই থেকে আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার হাইস্পিড রেল করিডর নির্মাণের যে পরিকল্পনা নিয়েছে তাতে ২১ কিলোমিটার সাগরের নিচ দিয়ে টানেল থাকবে। তবে তা রেল টানেল, সড়ক নয়। তিন কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্য এই টানেলের নদীর তলদেশের গভীরতা হবে ১৮ থেকে ৩১ মিটার। মোট দুটি টিউব নির্মিত হবে। এর একটি দিয়ে গাড়ি শহর প্রান্ত থেকে প্রবেশ করবে। আরেকটি টিউব দিয়ে অপর পাড় থেকে শহরে আসবে। সড়ক ও সেতু বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে নয় হাজার ৮৮০ কোটি টাকা। মূল টানেলের সমুদয় অর্থ যোগান দিচ্ছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এক্সিম ব্যাংক। সর্বক্ষণিক বিদ্যুত সুবিধার জন্য থাকবে ১৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুত স্টেশন। চার লেনের এই টানেলে চলাচল করতে পারবে ভারি যানবাহনও। এতে করে বন্দর সুবিধা নিয়ে নদীর দক্ষিণ পাড়েও গড়ে উঠবে শিল্প-কারখানা ও শহর। গত ২১ জানুয়ারি নয়া সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে টানেলটি বঙ্গবন্ধুর নামে নামকরণের প্রস্তাব করা হয় মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে। তাদের ভাষ্য, যেহেতু চট্টগ্রামে সর্বসাধারণের ব্যবহারযোগ্য তেমন বড় কোন স্থাপনা নেই, তাই দেশের প্রথম টানেলটি বঙ্গবন্ধুর নামে করা যেতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খনন উদ্বোধনকালে এই নামকরণের ঘোষণা দেবেন বলে বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিকমানের এই টানেল উন্নতি ও অগ্রগতির পথযাত্রায় বাংলাদেশকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেবে বলে আশা করা যায়।