১৯ জুন ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পাঠ-প্রতিক্রিয়া ‘তাজউদ্দীন আহমদ এক তরুণের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা’

  • আরিফ রহমান

বঙ্গবন্ধুর মতো বড় হৃদয় ও সবাইকে নিয়ে কাজ করার মানসিকতা এখন কোন রাজনৈতিক নেতার নেই। আবার তাজউদ্দীন আহমদের মতো সহিষ্ণু ও আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন এমন নেতাও নেই। এই দুইজন একে অন্যের পরিপূরক। ফলে আমাদের স্বাধীনতা এসেছিল বড় অল্প সময়। যদিও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত কাজ হয়েছে তার এক দশমাংশও তাজউদ্দীনকে নিয়ে হয়নি। একটা বড় সময় স্বাধীনতাবিরোধী সরকার গবেষণা করতে দেয়নি। এই সময়েও অনেকে কাজ করতে চান না। পাছে যদি সরকারের আনুকূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়!

এই বছর তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে একটি কাজ করেছেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। ‘তাজউদ্দীন আহমদ এক তরুণের রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা’ শিরোনামের এই গ্রন্থ নানা দিক থেকে বৈচিত্র্যময়। মাত্র ১১০ পৃষ্ঠার ছোট কাগজে পরিপাটি করে বাঁধাই হয়ে আসা বইটি হাতে নিয়ে ভেবেছিলাম এক বসাতেই শেষ করে ফেলব। সেই এক বসা শেষ হয়েছে পাক্কা ৬ দিনে। বইটি ছোট হলেও নানা তথ্য উপাত্তে ঠাঁসা। অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন বইটি উৎসর্গ করেছেন তার প্রাক্তন ছাত্রী, বর্তমান সংসদ সদস্য সিমির হোসেন রিমিকে। লেখক বইয়ের বিভিন্ন জায়গায় স্মরণ করেছেন পিতা তাজউদ্দীনের স্মৃতিরক্ষায় কন্যার অবদানের কথা। এই বইটি মূলত তাজউদ্দীন আহমদ ট্রাস্টের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত বাৎসরিক তাজউদ্দীন আহমদ বক্তৃতার লিখিত রূপ। পরিমার্জনের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে বেশ কিছু ছবি এবং তথ্যসূত্র।

আলোচিত গ্রন্থের মূল উপজীব্য তাজউদ্দীন আহমদের লেখা ডায়েরিগুলো। এই বইতে জীবন অথবা কর্মকে নিয়ে তেমন আলোচনা করা হয়নি। আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে ডায়েরিগুলোর ভেতরেই। মাত্র ২১ বছর বয়স থেকে নিয়মিত ডায়েরি লিখেছেন তাজউদ্দীন আহমদ। প্রতিদিন লিখতেন। বিস্তারিতভাবে লেখেননি, কিন্তু যা লিখেছেন নিখুঁতভাবে লিখেছেন। দিনক্ষণ, ঘণ্টা, মিনিট সবকিছু নির্ভুলভাবে লেখা। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটা কাজের নির্ভুল বিবরণ। এমন হয়েছে তিনি সারারাত ঘুমোতে পারেননি, জেগে থেকেছেন। তবুও পরদিনের কার্যবিবরণী লিখে রেখেছেন নির্ভুলভাবে। এ যেন এক প্রবাহমান স্মারক গ্রন্থ।

তাজউদ্দীন আহমদ যদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী না হতো তবুও এই নিয়মিত ডায়েরি লেখার কারণে তিনি ইতিহাস গবেষকদের সেই সময় নিয়ে এক বিরাট তথ্যের আঁকর দিয়ে গেছেন। বাংলা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করার সময় বদরুদ্দিন উমর এই ডায়েরিগুলো ব্যবহার করেছিলেন। তিনি লিখেছেন তৎকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস ঠিকমতো নির্মোহভাবে বোঝার ক্ষেত্রে এই ডায়েরি খুবই সাহায্য করে। উমর তাজউদ্দীন আহমদের কাছ থেকে ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৫৬ সালের ডায়েরিগুলো নিয়ে গবেষণা করেন। আশ্চর্যজনক বিষয় এই দশ বছরের প্রতিটাদিন তাজউদ্দীন কিছু না কিছু লিখেছেন। যেই ডায়েরিগুলো উমর পেয়েছিলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়।

ড. মামুন লিখেছেন, বাংলাদেশে যারা রাজনীতি করেছেন তাজউদ্দীন আহমদ সম্ভবত ছাত্র হিসেবে সবচেয়ে মেধাবী। এই তথ্য জেনে অনেকে হয়ত আশ্চর্য হয়ে যাবেন যদিও এই দেশ গঠনের পেছনের দুই নম্বর মানুষ ছিলেন তিনি। মেধাবী ছিলেন, সব সময় স্কলারশিপ পেয়েছেন, কোরআনে হাফেজ ছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন তারপর আইন পড়েছেন। আইন পরিষদের সদস্য থাকা অবস্থায় পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস করে গেছেন!

তাঁর ডায়েরিতে বার বার উঠে এসেছে দ্রব্যমূল্য, আবাহাওয়া, বন্যার দুর্ভোগ ইত্যাদি বিষয়। ১৯৫৪ সালের ডায়েরিতে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কথা বলেছেন। অভাব আর দুর্ভিক্ষের কথাও বলেছেন। লিখেছেন কিভাবে তাঁর এলাকার মানুষ তিন মাইল দূর থেকে খাবার পানি আনছে। দুই মাস যাবত মানুষ গোছল করতে পারত না। গবাদিপশু ঘাসের অভাবে রুগ্ন। পাটের দাম ২২ টাকা থেকে কমে ১৮ টাকা হয়েছে (প্রতি মণ)।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরেও ঠিক একইভাবে মানুষকে দেখেছেন। ১৯৭৪ সালে অনাহারে যখন মানুষ মারা যাচ্ছিল সেসব দৃশ্য দেখে আবার পাশেই নাইটক্লাবে আস্তমুরগি আর বিদেশী মদ খাবার দৃশ্য দেখে হয়েছিলেন মর্মাহত আর লাঞ্ছিত। ২১ বছরের যুবক ৪৫ বছর বয়সে এসেও চিন্তার জায়গায় ঠিক একই রকম আছেন। এ রকম আরও অনেক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় মুনতাসীর মামুন লিখিত বইটিতে। নিজের ভুলের জন্য নিজেই বিবেকের দংশনে দংশিত হতেন। ১৯৪৭ সালের ডায়েরির এক জায়গায় লিখেছেন-

‘কোন আগন্তকের প্রশ্নের জবাব দেয়ার ব্যাপারে সামান্য বেখেয়াল হলে ওই ব্যক্তির জন্য তো ভোগান্তি হতে পারে। ভবিষ্যতে কোন প্রশ্নের জবাব দেয়ার ব্যাপারে আমার আরও সতর্ক হওয়া উচিত। আজ সন্ধ্যায় নিমতলি রেল ক্রসিংয়ের কাছে একজন ভদ্রলোক আমার কাছে পলাশী ব্যারাকে যাওয়ার পথ জানতে চান। আমি কোন চিন্তা-ভাবনা না করে তাড়াহুড়োর মধ্যে তাকে নীলক্ষেতের পথ দেখিয়ে দেই। আমার এই বেখেয়ালের জন্য ভদ্রলোককে কি পরিমাণ দুর্ভোগ যে পোহাতে হয়েছে তা জানি না।’

এই যে মানুষ সেই মানুষটা আবার প্রচ- আশাবাদী একজন মানুষ। তার আশাবাদের ভাবনা নিয়ে মুনতাসীর মামুন বইয়ের একেবারে শেষে লিখেছেন উনিশ বিশ শতকের বাঙালীদের নিয়ে। উনিশ আর বিশ শতকের বাঙালীরা জীবনের এক পর্যায়ে নিজের জাতি নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ঈশ্বরচন্দ্র, রবিঠাকুর, বঙ্গবন্ধু। তাজউদ্দীনের মাঝে এই জিনিসটা কম। তাজউদ্দীনের যৌবনে সেই হতাশা নেই। একাত্তরের দুঃসময়ে যখন পাকিস্তান বাহিনী তার পেছনে লেগে আছে আর আছে নিজের দলের বেশিরভাগ নেতাকর্মী, তখনও তিনি হতাশ নন। তবে স্বাধীনতার পর, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-ের পর তার ভেতর হতাশা দেখা গেল। তিনি লিখেছেন এমন করে-

‘আওয়ামী লীগের বেশ কিছু নেতা তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করেন। যুদ্ধে জয়লাভ করার চেয়ে তাজউদ্দীনের অপসারণ তাদের কাছে শ্রেয়তর মনে হয়েছিল। এরপরে, বঙ্গবন্ধুকে যারা ঘিরেছিলেন, তিনি শহীদ হওয়ার পর অনেকে দল ত্যাগ করেন, আবার ফিরেও আসেন। তাজউদ্দীন আহমদ একদিন বিষণ্ণভাবে নিজের ব্যক্তিগত সচিব তৌফিক আজিজকে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হবে, তবে বাসযোগ্য হবে না’।

আজ মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পর বলতে বাধ্য হচ্ছি তাজউদ্দীন আহমদ একেবারে বেঠিক মন্তব্য করেননি। কী প্রফেটিক মন্তব্য! এবং নিজের কথা প্রমাণ করতে জীবনটাই দিয়ে দিলেন!

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তাকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার কথা হলেও তিনি তা অস্বীকার করেছিলেন। বিনিময়ে নিহত হয়েছিলেন। একদম শেষে এসে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন যে লাইনগুলো লিখেছেন তা নাড়া দেয়ার মতোই-

‘যিনি ইতিহাসের সঙ্গে যান তাঁকে বর্জন করা যায় না। বরং তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেরা সম্মানিত হতে পারি। তাজউদ্দীন আহমদকে আমরা অনেকেই এখন বর্জনের চেষ্টা করতে পাড়ি কিন্তু ইতিহাসের সামান্য ছাত্র হিসেবে বলব, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস তাঁকে বাদ দিয়ে লেখা যায় না। বঙ্গবন্ধু জাতির জনক। কিন্তু, তাঁর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। বর্তমান তাঁকে উপেক্ষা করতে পারে কিন্তু ভবিষ্যতের পক্ষে তাঁকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।’

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক

গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা