২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আর নয় ॥ পুরান ঢাকায় রাসায়নিক কারখানা

আর নয় ॥ পুরান ঢাকায় রাসায়নিক কারখানা
  • বার্ন ইউনিটে চকে দগ্ধদের দেখতে গিয়ে বললেন প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সরকারের উদ্যোগ নেয়ার পরও ব্যবসায়ীদের পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক কারখানা সরিয়ে নিতে রাজি না হওয়ার বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, চকবাজার ট্র্যাজেডি পুরান ঢাকার রাসায়নিকের গুদাম মালিকদের জন্য একটি শিক্ষণীয় ঘটনা। এবার নিশ্চয়ই এসব গুদাম অন্যত্র সরিয়ে নিতে তারা (মালিকরা) আর আপত্তি করবেন না। শনিবার বেলা সাড়ে দশটার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চকবাজারে অগ্নিকা-ে দগ্ধদের দেখতে যান প্রধানমন্ত্রী। পরে বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকদের কাছে এ মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। নিহতদের পরিবারের প্রতি আমি সহমর্মিতা জানাই। এজন্য জাতীয় শোক পালন করা হবে। নিমতলীর ঘটনার পর গৃহীত উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগুন লাগার আগে সিদ্ধান্ত হয়েছিল সব রাসায়নিক কারখানা ও গোডাউন সরানো হবে। কেউ তখন রাজি হননি। আমরা আধুনিক গোডাউন করে দিতে চাইলেও মালিকরা রাজি হননি। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। চকবাজারে কেন আগুন লেগেছে তা তদন্ত করে দেখার পাশাপাশি সব স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর জোর দেন শেখ হাসিনা।

পুরান ঢাকার সংকীর্ণ রাস্তা নতুনভাবে গড়তে হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ফায়ার সার্ভিস যে গাড়ি নিয়ে আসবে এত ছোট রাস্তা তার ওপর উৎসুক জনতা ভিড় করে। এরাই এক বালতি করে পানি আর বালি আনলেও ভাল হতো। কিন্তু কেউ সেটা আনেননি।

অগ্নিকা-ের সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্বে কিছু সংবাদকর্মীর আচরণ নিয়েও আপত্তি জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত তাদের কিছু কিছু টিভি প্রশ্ন করছে। এটা কি প্রশ্ন করার সময়? এই জাতীয় ঘটনায় সবাই যেন সুষ্ঠুভাবে কাজ করতে পারে সেটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। শেখ হাসিনা বলেন, ৭২ ঘণ্টা পার হওয়ার আগে আহতদের ছবি তুলতে হাসপাতালে ক্যামেরা যাওয়া, লোকজন যাওয়া বন্ধ রাখতে হবে।

শেখ হাসিনা এ সময় দমকল কর্মী, পুলিশ ও র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী এবং চিকিৎসকদের সচেতনতার এবং রাতদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, তাদের পাশাপাশি সেদিন তিনি নিজেও নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আগুন নেভানোর বিষয়টি তদারকি করেছেন এবং যেসব রোগী মেডিক্যালে এসেছে তাৎক্ষণিক তাদের চিকিৎসার সব রকম ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

হতভাগ্যদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে অনেকের লাশ শনাক্ত হয়েছে এবং তাদের স্বজনরা নিয়ে গেছেন। কয়েকজন এখনও যে শনাক্ত হতে পারেনি তাদের ডিএনএ টেস্ট করে স্বজনে কাছে ফেরত দেয়া হবে, সেই প্রক্রিয়াও আমরা শুরু করেছি।

দুর্ঘটনা থেকে পুরান ঢাকাকে রক্ষার জন্য রাসায়নিকের গুদামগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বহুতল গোডাউন গড়ে তোলার জন্য তাঁর সরকারের পদক্ষেপ নেয়ার কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, এই অলিগলি রাস্তাকে আমাদের নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। যাতে দমকলবাহিনী সহজেই ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় ঢাকার ধোলাইখাল, শান্তিনগর খাল, সেগুনবাগিচা খাল থেকে শুরু করে ঢাকার অনেক খাল ও জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, পুকুর খাল এগুলো যেন আর বন্ধ করা না হয় এগুলো যেন রক্ষা পায়। কারণ এ ধরনের আগুন লাগলে পানির অভাবটা যেন আর না থাকে বিষয়টি খেয়াল করেই সংশ্লিষ্ট সবাই কাজ করবেন।

কয়েকদিন আগেই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লাগার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে সময় চিকিৎসক, নার্স, হাসপাতালের কর্মচারী এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত রোগীদের সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করায় সেখানে আল্লাহর রহমতে কোন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে সেখানে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে এখনও তদন্ত চলছে। এ সময় নতুন রাস্তাঘাট, স্থাপনাসহ বিভিন্ন ভবন নির্মাণের সময় সেসব জায়গায় যেন পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকে সেদিকে দৃষ্টি দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

অন্যদের মধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন, উপমন্ত্রী এনামুল হক শামিমসহ ঢাকা মেডিক্যালের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বুধবার রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে ভয়াবহ এক অগ্নিকা-ে ৬৭ জন জীবন্ত দগ্ধ হয়। আহতদের মধ্যে নয়জনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে, তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক নয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, একটি পিকআপের সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর চুড়িহাট্টা মোড়ে ওই অগ্নিকা-ের সূত্রপাত। পরে তা আশপাশের পাঁচটি ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। ওই মোড়ের আশপাশের দোকান আর ভবনে থাকা রাসায়নিক, প্লাস্টিক ও প্রসাধনীর গুদাম চুড়িহাট্টার আগুনে ভয়াবহ মাত্রা করে বলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের ধারণা। ’১০ সালে নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকা-ে শতাধিক প্রাণহানির পর তদন্ত কমিটি পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেয়ার সুপারিশ করেছিল। নয় বছরেও সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় চুড়িহাট্টায় এমন ভয়াবহ ঘটনা ঘটল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে জনমনেও বিরাজ করছে অসন্তোষ।