২০ মার্চ ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইমুপাখির বাণিজ্যিক সম্ভাবনা

  • মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

অস্ট্রেলিয়ান পাখি হলো ইমু। এটি অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে বৃহত্তম পাখি। বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম পাখি। গড় উচ্চতা ৫ ফুট, ওজন ৪৫ কেজির মতো হয়। অস্ট্রেলিয়াতে ৮৫ কেজি ওজন হওয়ার রেকর্ড আছে। উড়তে না পারলেও এরা দ্রুত গতিতে দৌড়াতে পারে। প্রায় ৫০ কিলোমিটার বেগে ছুটতে পারে। স্বভাবে এরা খুবই শান্ত। মানুষের সঙ্গ পছন্দ করে। মানুষকে ভয় পায় না। ইমুপাখির মূল খাবার ঘাস, লতাপাতা, ভুসি, শাক-সবজি। খাবায় খায় অল্প। একটি ইমু ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রাম খাবার দৈনিক খায়। পানি খেয়ে থাকে ১০০ গ্রামের মতো। ইমুপাখির ডিমগুলো হয় সবুজ রংয়ের। প্রায় ১ কেজির মতো ওজন হয়। পুরুষ ইমু ডিমে তা দেয়, বাচ্চা ফুটায়, বাচ্চাদের দেখাশোনাও করে। এক সময় ইমুপাখির চর্বি ইউরোপে জ্বালানি হিসাবে ব্যবহার করা হতো। নির্বিচারে সে সময় ইমু হত্যা করা হতো। সে কারণে অস্ট্রেলিয়ান সরকার ইমু হত্যা বন্ধে আইন পাস করে।

আশরাফুল আলম খান। খুলনায় বটিয়াঘাটা উপজেলার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। উপজেলা চেয়ারম্যান। শখের বসে ইমুপাখির খামার গড়ে তুলেছেন। এক বিঘা জায়গাজুড়ে তার খামার। প্রথমে ২০০টি পাখি নিয়ে তিনি খামার শুরু করেন। তিনি জানান ইমুপাখির খামারে ব্যাপক বাণিজ্যিক সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের দেশে নতুন হলেও বিদেশে এর মাংসের প্রচুর চাহিদা। চর্বি কম থাকায় খেতে সুস্বাদু। ইমুর মৃত্য হার খুব কম। তার ২০০টির মধ্যে মাত্র ১০টির মতো পাখি মারা গেছে। আশরাফুল জানান, বাংলাদেশের আবহাওয়া ইমুপাখির জন্য আরামদায়ক। খুব বেশি গরম, ঠা-া না হওয়ায় এরা ভাল থাকে। সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ঘাষ, লতা পাতা, নুড়ি পাথর খেয়ে থাকে। এক বছর বয়সে একটি ইমুপাখি শারীরিক পূর্ণতা পায়। ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত বেচে থাকে। প্রথমবার ১৮ থেকে ২০টি ডিম পারলেও পরেরবার ৩০/৩৫টি ডিম পারে। ৫০টি ডিম ও কখনও কখনও পারে বলে জানা যায়। সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ এই ছয় মাস ডিম দেয়। জন্ম নেয়ার পর ইমুর বাচ্চা হালকা বাদামি রঙের হয়। ধীরে ধীরে রং গাঢ় বাদামি হয়। একটি স্ত্রী ইমু দেড় থেকে দুবছর বয়সে প্রজনন ক্ষমতা লাভ করে। আশরাফুল জানান, তিনি প্রতিটি বাচ্চা ১৬ হাজার টাকা দিয়ে কিনে আনেন। তখন বাচ্চার ওজন ছিল ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম। এখন প্রতিটির ওজন ৪০ থেকে ৫০ কেজি। সারা বিশ্বে ইমুপাখির মাংস জনপ্রিয়। ইসলাম ধর্মমতে ইমুর মাংস খাওয়া হালাল। ইমুপাখির মাংসের জনপ্রিয়তার কারণ হিসাবে আশরাফুল জানালেন ইমুর মাংস ৯৮ ভাগ পর্যন্ত চর্বিমুক্ত। এর চামড়ার নিচে একটি চর্বির আবরণ রয়েছে। যা দিয়ে মূল্যবান ওষুধ তৈরি করা হয়। তিনি আশা করেন, দেশে দ্রুত ইমুপাখির জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে। বেকার যুবক-যুবতীদের উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠবে ইমুপাখি পালন। মাত্র ৪০০ গ্রামের ইমুর বাচ্চা ১২ মাস পরে ৬০ কেজির মতো ওজন হয়। দ্রুত তারা বড় হয়। এমনটাই জানালেন ইমু পালনকারী মোঃ ইমরান হোসেন। ইমরানের মতে, ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায় কেনা ইমুর বাচ্চা ১৪ মাস পর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় বিক্রি করা যায়। ডিম থেকে বাচ্চা ফুটিয়েও তা বিক্রি করা যায়। জবাই দিয়ে গরু, ছাগলের মতো কেজি দরে মাংস বিক্রি করলেও ক্ষতি নেই।

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের সাইদুল ইসলাম ইমুপাখি পালন করেন। তিনি জানেন সকালে, রাতে খাবার আর দুপুরে গোসল দিেেলই হয়। এছাড়া তেমন কোন যতœআত্তি করতে হয় না। সাইদুল ৯টা থেকে ৫টা চাকরি করেন। পাশাপাশি ইমুপাখি পালন করেন। এ পর্যন্ত তার কোন লোকসান হয়নি বলে জানান। রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা বেশি। কোন ওষুধ খাওয়াতে হয় না বলে সাইদুল জানান।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ বঙ্কিম কুমার হালদার জানান, ইমুপাখির মাংস খুব সুস্বাদু। এর মাংসে কোলেস্টলের নেই। ৯৮ ভাগ পর্যন্ত চর্বিমুক্ত। ইমুপাখির মৃত্যুর হার টার্কি বয়লারের চেয়ে অনেক কম। বাণিজ্যিকভাবে ইমুর অনেক সম্ভাবনা। বিদেশে ইমুপাখির মাংসের প্রচুর চাহিদা। পাকিস্তানে বাণিজ্যিকভাবে ইমু পালন করা হয়। বিদেশে ইমুপাখির প্রতি কেজি মাংস বাংলাদেশী টাকায় ৮০০-৯০০ টাকা বলে একটি সূত্র জানায়। জানা যায় ডিম, মাংস, চামড়া, নখ সব কিছুই কাজে লাগে। বাণিজ্যিক মূল্য আছে এসব কিছুর।

ইমুপাখির প্রচার, পালন, বাণিজ্যিক সম্ভবানা কাজে লাগানোর জন্য সরকারী সাহায্য সহযোগিতা দরকার বলে এ সেক্টরের সঙ্গে জড়িতরা মনে করছেন। দেশীয় মাংসের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি আয়ের মাধ্যম হতে পারে ইমুপাখি।