২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণহত্যা ১৯৭১ ॥ রাজশাহীর তাহেরপুর

  • মোহাম্মদ আরিফুল হক

২১ এপ্রিল ১৯৭১ তাহেরপুর পিয়াজহাটায় ১৯৭০ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে রাজশাহী-৭ আসন হতে পরাজিত প্রার্থী রাজশাহী জেলা মুসলিম লীগ (কনভেনশন) নেতা আয়েনউদ্দিন একটি শান্তি সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশে পুঠিয়া থানার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান আইয়ুব আলীকে সভাপতি ও বাগমারা থানার শ্রীপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের নূর মোহাম্মদ মৌলভীকে সেক্রেটারি করে শান্তি কমিটি ঘোষণা করেন।

উক্ত সমাবেশে আয়েনউদ্দিন বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যে বলেন, আগামী ২৩ এপ্রিল পাকিস্তানী মিলিটারি তাহেরপুরে আসবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের আশ্বাস দেন আপনাদের কোন ভয় নেই। তিনি বক্তব্যে বলেন, মুসলমানেরা পাঞ্জাবি ও লুঙ্গি পরে আসবেন। হিন্দুরা পায়জামা ও পাঞ্জাবি পরে আসবেন। আপনারা পাকিস্তানি মিলিটারিদের স্বাগত জানাবেন। আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি আপনাদের কারও কোন ক্ষতি হবে না। বক্তব্যের মধ্যে হিন্দু মুসলমানদের পোশাকের পার্থক্যের কথায় এলাকার সচেতন নাগরিক ও হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদের মধ্যে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। তাহেরপুরবাজার ও আশপাশের মহল্লার স্বাধীনতাকামী জনতার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে আওয়ামী লীগের ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নেতৃবৃন্দ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা ২২ মে সারাদিনের মধ্যে এলাকা ছেড়ে পার্শ্ববর্তী নিরাপদ অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। এ সংবাদ শান্তিকমিটির লোকজন জানতে পেরে খুবই ক্ষুব্ধ হয়। ঐ দিনই তারা তাহেরপুর হাটের ঝাড়ুদার প্রবির হাঁড়িকে দিয়ে পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিরাপদে আশ্রয় নেওয়া লোকজনকে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসতে বলে ঢোল শহরত দেয়। ঢোল শহরত দেওয়ার ফলে কিছু কিছু ব্যবসায়ী হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা বাড়িতে ফিরে আসে। কারণ শুক্রবার তাহেরপুরের বড়হাট বার। হাটে ব্যবসার প্রয়োজনে ফিরে আসে তারা।

২৩ এপ্রিল শুক্রবার সকালে তাহেরপুরহাট এলাকায় শান্তিমিছিল হয়। মিছিলের সামনে ভাবনপুরের আনার পাকিস্তানের পতাকা নিয়ে শান্তির পক্ষে মিছিলে স্লোগান দেয়। জুমার নামাজের পরেই পাকিস্তানী মিলিটারিরা রাজশাহী থেকে পুঠিয়া হয়ে কয়েকটি জীপ ও ট্রাকে করে তাহেরপুরে আসে। সে দিন ছিল হাটবার। প্রচুর লোকের সমাগম। মিলিটারিরা হাটে নেমেই ফাঁকা গুলি ছুড়ে হাটে আতঙ্কের সৃষ্টি করে।

গুলির আওয়াজ শুনে লোকজন দিদ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করে। পাকিস্তানী মিলিটারিরা এলাকার শান্তি কমিটির লোকজনের সহায়তায়, ‘মালু কন হ্যায়’ উচ্চারণ করতে করতে তাহেরপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তেজেস রায়ের মিষ্টির দোকানে হানা দেয়। তেজেস রায়ের পরিবার, ভাগ্নেœ বিজয় ভট্টাচার্য্যকে দোকানের দায়িত্ব দিয়ে ২২ এপ্রিল তাহেরপুরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী বিরু স্যান্যালের গ্রামের বাড়ি পার্শ্ববর্তী নাটোর মহকুমার ব্রহ্মপুর ইউনিয়নের সড়কুতিয়া গ্রামে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তান বাহিনী দোকানে হানা দেওয়ার পূর্বে তাহেরপুর হাই স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক মৌলভী মকলেছুর রহমান ঐ পথ দিয়ে যাবার সময় ছাত্র বিজয় ভট্টাচার্য্যকে পালিয়ে যেতে বলেন। বিজয় ভট্টাচার্য্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। দোকানের কর্মচারী মানিক ব্রহ্মাকে শান্তি কমিটির সদস্য জলিল স্বর্ণকার ধরে ফেলে। পাশের মিস্টির দোকানদার পঞ্চানন দাসকেও ধরে ফেলে। দু’জনকে সামান্য উত্তরে পিয়াজহাটায় নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে।

হাটের লোকজনকে তাদের দোকানপাট লুটপাট করতে নির্দেশ দেয়। তাহেরপুর হাট অনেক বড় এলাকা জুড়ে অবস্থিত হওয়ায় অন্য দোকানপট্টির দোকানী ও ক্রেতাসাধারণ বুঝে ওঠার পূর্বেই হাটের মধ্যে অবস্থিত বিরু স্যান্যালের দোকানে হামলা চালিয়ে শান্তিকমিটির লোকেরা লুটপাট করে, জনগণকে লুটপাটে উৎসাহিত করে এবং কোরোসিন তেল ঢেলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়।

তারা হাটের পূর্ব দিকে গিয়ে গৌর চন্দ্র নামে একজন হিন্দু লোককে ধরে ফেলে এবং পাকিস্তানী মিলিটারিরা বলে ‘কাপড়া উঠাও কলেমা বলো’। গৌর চন্দ্র তাদের কথামত কাজ করে না। ফলে পাকিস্তানী একজন মিলিটারি গৌর চন্দ্রকে রাইফেলের বাট দিয়ে আঘাত করে। গৌর চন্দ্রও পাল্টা আক্রমণ করে। ফলে দুইজনের মধ্যে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে গৌরচন্দ্রকে গুলি করে হত্যা করে। আরও ক্ষিপ্ত হয়ে তারা হাটের কুমারপট্টিতে হামলা চালায়।

সেখানে নিরীহ গরিব হিন্দু সম্প্রদায়ের ৫ জন পাতিল বিক্রেতা ও তাদের পাতিলের ভারবাহক ১ জন মুসলমানকে হত্যা করে। তারপর তারা দই পট্টিতে হামলা চালিয়ে কয়েকজন হিন্দু ধর্মীয় দই বিক্রেতাকে হত্যা করে। শান্তিকমিটির লোকেরা হাটের বিভিন্ন জায়গায় হিন্দুদের গোলাঘর, দোকানপাট লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করতে থাকে এবং পাকিস্তানী মিলিটারিরা সাধারণ হাটুরিয়াদের লুটপাটে বাধ্য করে।

পরে হিন্দু মহল্লা বাজারপাড়া, তিলিপাড়া, জেলেপাড়া, খিড়কিপাড়াসহ প্রতিটি হিন্দু মহল্লায় আক্রমণ চালিয়ে তাদের বাড়ি ঘর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেয়। বহু নারীর তারা সম্ভ্রম নষ্ট করে। গোটা তাহেরপুর এলাকা একটি ধ্বংস স্তূপে পরিণত হয়। ২৩ এপ্রিল শুক্রবার হাটের মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করে। এই নৃশংস সাম্প্রদায়িক নারকীয় হত্যাকা-, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে প্রত্যক্ষভাবে পাকিস্তানী মিলিটারিদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছিল তাহেরপুর আঞ্চলিক শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান পুঠিয়া থানার শিলমাড়িয়া ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী, সেক্রেটারি শ্রীপুর ইউনিয়নের জগন্নাথপুর গ্রামের নূর মুহাম্মদ মৌলভী, তাহেরপুরের মনির হাজি, ভাবনপুরের জলিল সোনাল, তাহেরপুর মাদ্রাসার তৎকালীন সুপার আবু বকর আনছারী, দুর্গাপুর থানার আনুলিয়া গ্রামের সিদ্দিক রাজাকার ও স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতাকর্মীরা।

তাহেরপুর হাটে নারকীয় গণহত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ শেষে বিকেল ৪টার দিকে তারা তাহেরপুর ত্যাগ করে রাজশাহী চলে যায়। যাওয়ার সময় স্থানীয় জনগনদের বলে যায় লাশগুলো মাটি চাপা দিতে। লাশগুলোর মধ্যে একজন অনেক রাত পর্যন্ত জীবিত ছিল। সে বার বার জল জল করছিল। ভাবনপুরের মফিজ একটি মাটির পাত্রে জল দিয়েছিল। কিন্তু তার জল খাবার আর শক্তি ছিল না। সে শুধু বাক শক্তিহীনভাবে মাটির জলপাত্রের দিকে চেয়েছিল। জলপাত্রের দিকে নির্বাক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকার দৃশ্য যেন বাংলার আকাশকে শোকাহত করেছিল। স্বজনহারাদের চোখের পানির ভার তাহেরপুরের আকাশ সেদিন ধরে রাখতে পারেনি। ঐ রাতে স্বামীহারা স্ত্রী, পিতাহারা পুত্র, কন্যা সন্তানহারা মা-বাবার চোখের জলের সঙ্গে আকাশের মেঘও কেঁদেছিল। রাতে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিল। লাশগুলোর সৎকার বা মাটিচাপা কোনটিই সেদিন হয়নি। রাতে হিং¯্র পশুরা একটি লাশকে ক্ষতবিক্ষত করে ছিল। সকালে শান্তি কমিটির লোকেরা স্থানীয় মেথর ক্লিষ্ট দফাদার, তার তিন পুত্র ও মেথর সিবু, এদের দ্বারা তিলিপাড়ার নলডাঙ্গা রোডের চন্দ্রর পুকুরপাড় এলাকায় একটি গর্তে (বর্তমান শ্রীনাথের বাড়ি) মাটিচাপা দিয়ে রাখে। সে বধ্যভূমিতে উঠেছে এখন বিশাল অট্টালিকা। বসবাস করছে স্বাধীন বাংলদেশের মানুষ।

১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের উদ্যোগে প্রকাশিত গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘণ্ট গ্রস্থমালায় তাহেরপুর গণহত্যা নিয়ে একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। নজরুল ইসলাম ম-ল লিখিত সেই গ্রন্থে আজগড়া গণহত্যা নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।

লেখক : গবেষণা কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র, খুলনা