২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

গণহত্যা ১৯৭১ ॥ মৌলভীবাজারের পাঁচগাঁও

  • মাসুদ রানা

২৭ মার্চ বিকাল ৩টায় পাকিস্তানী বাহিনী মৌলভীবাজার জেলার উত্তরের রাজনগর উপজেলায় প্রবেশ করে। পাকিস্তানী বাহিনীর প্রথম শিকারে পরিণত হয় রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও ইউনিয়নের ভূমিউড়া গ্রামের প-িত শ্যামাপদ কাব্যতীর্থ।

একাত্তরে রাজনগরে পাকিস্তানী বাহিনীর অবস্থানের কারণে স্থানীয় কিছু রাজাকার সুবিধা লাভ করতে শুরু করে। তারা শান্তি কমিটিতে নাম লেখিয়ে গ্রামে প্রভাব খাটাতে থাকে। পাকিস্তানীদের সহযোগীরা (রাজাকার) হিন্দুদের গ্রাম ছাড়া করার জন্য ডাকাতি করতে শুরু করে। ঘন ঘন ডাকাতি হতে থাকলে রাজনগর থানার ওসি মতিউর রহমান কয়েকবার গ্রাম পরিদর্শন করে এবং তাদের গ্রামে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। ওসির অভয় বাণীতে মৌলভীবাজার শহরের মানুষ পাঁচগাঁও গ্রামে আশ্রয় নিতে থাকেন। গ্রামকে ডাকাতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য গ্রামের সাধারণ মানুষ পাহারার ব্যবস্থা করে।

১৯৭১ সালের ৭ মে রাতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রাজাকার আলাউদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে আসে। ভোর রাতে আলাউদ্দিন চৌধুরী, ডা. আনা মিয়া, আব্বাস মেম্বার, আবদুল মতিনসহ কয়েকজন রাজাকার ৫০-৬০ জন পাকিস্তানী সৈন্য নিয়ে পাঁচগাঁও গ্রাম ঘিরে ফেলে। প্রতিটি বাড়ি হানা দিয়ে গ্রামের নিরীহ মানুষকে ধরে আনে এবং বলতে থাকে- ‘পাঁচগাঁও মে চক্কর দেগা, সরকার বাজার মে মিটিং করেগা, উছকো বাদ তুমকো ছোড় দেগা।’ রাজাকাররা বলে তোমাদের কোন সমস্যা হবে না। শান্তি কমিটির মিটিং করেই তোমাদের ছেড়ে দেয়া হবে। মিটিংয়ের কথা বলে ভোর রাতে হিরণ বাবুর বাড়ির দিঘির পাড়ে শতাধিক লোককে একত্র করে।

পুরুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে, মহিলা ও শিশুদের ঘর থেকে বের করে ঘরে ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে থাকে। গ্রামে শুরু করে লুটপাট।

ঘুমন্ত মানুষ আকস্মিক হামলায় দিশেহারা হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। অন্যদিকে আলাউদ্দিন রাজাকারসহ কয়েকজন কয়েকটি বাড়িতে প্রবেশ করে নারী নির্যাতন ও ধর্ষণ করে। পাকিস্তানী বাহিনী রাজাকারদের সহযোগিতায় পাঁচগাঁও গ্রাম পুড়িয়ে দেয়। অবশিষ্ট কিছু বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

হিরণ বাবুর বাড়ির দীঘির পাড়ে একত্রিত করা গ্রামবাসীকে আত্তর ম-ল ও মদরিছ মিয়াসহ প্রমুখ রাজাকার একজনের মাথার সঙ্গে অন্যজনের পা বেঁধে দীঘির পানিতে লাথি মেরে ফেলে দেয়। পাকিস্তানী বাহিনী পানিতে ছটফট করা মানুষগুলোকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে।

পাঁচগাঁও গণহত্যায় বেঁচে যাওয়া সুবোধ মালাকার বলেন- ‘পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের দীঘির পারে নিয়ে গিয়ে রাজাকারদের সহযোগিতায় সবার কাপড় খুলে একজনের সঙ্গে আর একজনকে বেঁধে ফেলে। পাকিস্তানী বাহিনী পুতুল গোসাই নামে একজনকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বলে। তিনি সেই কথা না শুনে বলতে থাকেন, ‘আমরা সবাই মারা যাচ্ছি তোমাদের যা ইচ্ছা তা করো।’ এ কথা শুনে পাকিস্তানী বাহিনী তার হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে ২টি গুলি করে। কিন্তু তখনও মারা যায়নি বলে ৩ নম্বর গুলি করে। সেই গুলির আঘাতে তিনি পানিতে ডুবে যান।

কিছুক্ষণ পরে রাজাকাররা আমাদের সবাইকে একজনের মাথার সঙ্গে আর একজনের পা বেঁধে দীঘির মধ্যে লাথি মেরে ফেলে দিতে থাকে। এরপরে পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের ওপর গুলি চালায়। আমার সঙ্গে যামিনী মালাকার নামে একজন বাঁধা ছিল। আমি কিভাবে বেঁচে যাই জানি না।’

পাঁচগাঁও গণহত্যায় শহীদের মধ্যে ৬৯ জনের নাম পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে নিত্যরাণী শব্দকর নামে একজন মহিলাও ছিলেন। নিরীহ গ্রামবাসীর রক্তে দীঘির পানি লাল হয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তানী বাহিনীর ভয়ে নিহতের আত্মীয়-স্বজনেরা লাশগুলো দাহ করতে পারেনি। পরের দিন গ্রামের কিছু লোকজন পুকুরে জাল ফেলে লাশ তুলে দীঘির পশ্চিম পাড়ে সমাহিত করেন। পাকিস্তানী বাহিনী ১৪ জন গ্রামবাসীকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের সন্ধান আজও পাওয়া যায়নি। ২৯ নবেম্বর পাকিস্তানী বাহিনী রাজনগরের খলা গ্রামের ১৫-২০ জনকে ধরে নিয়ে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের পর স্থানীয় জনগণ এই এলাকার শহিদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান। স্বাধীনতার ৪৪ বছর অতিবাহিত হলেও শহিদের গণকবরটি সংরক্ষণ করা হয়নি। ১৯৯১ সালে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একজন প্রার্থী ইসমাইল মিয়া শহীদের গণকবরটি দেয়াল দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করেন।

এই গণহত্যা সম্পর্কে বিস্তারিত রয়েছে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’ প্রকাশিত জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক তপন পালিতের গবেষণা গ্রন্থ ‘পাঁচগাঁও গণহত্যা’ নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালায়। প্রকাশকাল চৈত্র ১৪২১/মার্চ ২০১৫। এই গ্রন্থমালার সম্পাদক ‘মুনতাসীর মামুন’ ও সহযোগী সম্পাদক ‘মামুন সিদ্দিকী’। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানের গণহত্যা নিয়ে ‘১৯৭১ : গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ জাদুঘর ট্রাস্ট’ ৭০টি নির্ঘণ্ট গ্রন্থমালা প্রকাশ করেছে।

লেখক : কর্মকর্তা, গণহত্যা-নির্যাতন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র্র, খুলনা