২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা

আদিম বন্য মানুষ হিংস্র জন্তু জানোয়ারের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকত। এক সময় সেই সব ভয়ঙ্কর প্রাণীকে পোষ মানাতে গুহাবাসী মানুষ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে লাগল। যখন আগুনের আবিষ্কার হয়নি তখন শিকার করা পশুর কাঁচা মাংস আদিম মানুষের খাদ্যের যোগান দিত। এ ছাড়া গাছের ফলমূল, শাক-সবজিও তাদের আহারের সংস্থান করত। পাথরে পাথরে ঘর্ষণের ফলে যখন আগুনের বিস্ময়কর যাত্রা শুরু হলো, তখন আদিম মানুষ পশু-প্রাণীর মাংস আগুনে ঝলসে ভক্ষণ করত। বিবর্তনের পর্যায়ক্রমিক ধারায় মানুষ এক সময় হিংস্র বন্য প্রাণীকে বশে আনতে সফলও হলো। আর তাই আদিম অর্থনীতিতে পশুপালন পর্বটিও ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী হয়ে থাকল।

গরু, ঘোড়া, হাঁস, মুরগি, কুকুর, বিড়াল এগুলো মানুষের সহায়ক শক্তি হিসেবে প্রতিদিনের যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ হতেও সময় লাগেনি। এক জায়গা থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতে গরু ও ঘোড়ার গাড়ি পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে কতখানি অবদান রেখেছিল সেটাও অস্বীকার করার উপায় নেই। সব সময়ের এমন সঙ্গীকে সভ্য মানুষ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও নিজেদের প্রয়োজনে নিকটতম সাথী হিসেবে পাশেই রেখেছে। গৃহপালিত গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি যেমন আধুনিক মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যের বিশেষ উপাদান, তেমনি কুকুর, বিড়ালকেও সযত্নে পারিবারিকভাবে লালন পালন করা হয়।

কিন্তু এর বিপরীতে অনেক দুর্ঘটনাও ঘটে এসব প্রাণীকে নিয়ে। ফলে আইন করতে হয় যে, কোন পশুর ওপর অবিচার, অনিয়ম কিংবা অকারণ নির্যাতন করা দন্ডনীয় অপরাধ। ১৯২০ সালে আইনানুগ বিধানে ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধ আইন’ প্রবর্তন করা হয়। যথার্থ কারণ ছাড়া পশুহত্যা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে সময়ের পরিবর্তনে, তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রসরমান যুগে অপরাধের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পুরনো আইন কোনভাবেই পশুদের সুরক্ষায় যথেষ্ট নয়। আগের আইনে পশুর ওপর হওয়া অন্যায়ের বিচার নির্ধারিত হতো ৩ মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড আর ১ হাজার টাকা জরিমানা। ফলে প্রয়োজন হয় আইনের বিধিবিধান সংস্কারের এবং আরও শক্ত আইন তৈরি করা। রবিবার জাতীয় সংসদে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু প্রাণীকুলের যথাযথ সুরক্ষায় নতুন আইনের বিল উপস্থাপন করেন। গৃহপালিত কুকুরকে টানা ২৪ ঘণ্টা আটকে রাখা যাবে না। তাকে চলাফেরার সুযোগ দিতে হবে। এর অন্যথা হলে তা নিষ্ঠুরতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে অপরাধের মাত্রায় চলে যাবে। এই ধরনের অমানবিক আচরণের জন্য ৬ মাসের জেলসহ ১০ হাজার টাকা অর্থদ- দেয়া হবে। পশু নিধন (গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি) ইত্যাদি মানুষের খাদ্য তালিকার প্রতিদিনের আয়োজন হওয়ায় এসব আইনের আওতায় আনা যাবে না। তবে অযৌক্তিকভাবে অকারণে, অপ্রয়োজনে পশুহত্যা দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবেই বিবেচিত হবে। নতুন আইনটি কার্যকর হলে অপরাধের বিচার ভ্রাম্যমাণ আদালতে পরিচালনা করার সুযোগ থাকবে। এ ছাড়াও কর্তৃপক্ষের আদেশ ব্যতিরেকে কোন প্রাণীকে খেলার কৌশলেও আনা যাবে না। তবে আইনশৃঙ্খলা ও প্রতিরক্ষা বাহিনী এসব প্রাণী দিয়ে যে ধরনের অনুসন্ধান চালায় রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে, সেটা অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে না। উৎসব, আয়োজন আর ধর্মীয় কারণে উৎসর্গিত পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা প্রদর্শনের কার্যকলাপ আইন কোনভাবে গ্রহণ করবে না। এমন অযাচিত নৃশংসতা প্রতিরোধে আইনী বিধিবিধান প্রয়োগ করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। পশুর প্রতিও সহমর্মিতা, মানবিকতা ও ন্যায়বোধ অত্যন্ত জরুরী। পশু-পাখিও আমাদের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদের অপব্যবহার কিংবা বিরূপ ব্যবস্থাপনা দেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই এমন একটি আইনের আবশ্যকতা অস্বীকার করা যায় না।