২২ জুলাই ২০১৯  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমাজ ভাবনা -বিষয় ॥ অগ্নিকান্ড!

আকস্মিক অগ্নিকান্ড যে কী বিপুল ক্ষয়ক্ষতির স্বাক্ষর রেখে যায় তার প্রমাণ সম্প্রতি পুরান ঢাকার চকবাজার। আগুন যাতে না লাগে সেজন্যে আগেভাগেই সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। অগত্যা আগুন যদি লেগেই যায় তাহলে সক্ষমতা থাকতে হবে দ্রুততম সময়ের ভেতর তা নিভিয়ে ফেলার। প্রয়োজনে নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী অগ্রসর হতে হবে। -এ সবই উঠে এসেছে পাঠকদের লেখায়

.

মৃত্যুপুরী আর নয়

মোমিন মেহেদী ॥ ২০১০ সালের নিমতলী ট্র্যাজেডির পর এ রাতে ফের ঘটে গেল আরেক ট্র্যাজেডি। রাজধানীর চকবাজার এলাকার কয়েকটি ভবনে লাগা আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে অঙ্গার হয়েছে বহু তাজা প্রাণ। এখনও নিখোঁজ ৯ জন। পোড়া লাশ উদ্ধার করে নেয়া হয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। এলাকাবাসীসহ হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের অনেকের মুখেই উচ্চারিত হচ্ছিল- ‘এত লাশ রাখব কোথায়।’

আমরা কিন্তু ভুলে যাইনি, ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ঘটেছিল ভয়াবহ অগ্নিকা-। ওই ঘটনায় ১২৪ জনের প্রাণহানি ঘটে। সেই শোক এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন পুরান ঢাকার মানুষ। চকবাজারের ভয়াবহতা যেন নিমতলী ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি। একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় কেমিক্যাল কারখানা থাকায় আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টায় চকবাজার এলাকা রূপ নেয় ‘মৃত্যুপুরীতে’। এখন অনেকেই অ-নে-ক পরামর্শ দিচ্ছেন। মতামত দিচ্ছেন। এতদিন তারা কোথায় ছিলেন। কোথায় ছিলো তাদের আইনের প্রয়োগ?

পরিকল্পিতভাবে কেমিক্যাল শিল্পাঞ্চল বা ইন্ডাস্ট্রি জোন করে পুরান ঢাকা থেকে সব কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নিতে হবে; ক্ষতিকারক ২৯টি দাহ্য পদার্থ এসব কারখানায় বিক্রি করা যাবে না; পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল ব্যবসা একেবারে বন্ধ করতে হবে; পুরান ঢাকাকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করতে হলে বর্তমান অবকাঠামো ভেঙ্গে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে। আর কেমিক্যাল কারখানাসহ ক্ষতিকর কারখানাগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। এ জন্য উন্নত বিশ্বের আদলে রি-ডেভেলপমেন্ট ফর্মুলার প্রয়োগ করে নতুন করে পুরান ঢাকাকে গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজনে প্রশাসনকে কঠিন পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে সবার আগে দুর্নীতিমুক্ত হতে হবে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষকে। তাহলেই হয়তো আর ফায়ার সার্ভিসের-পরিবেশ অধিদফতরের বেআইনী ছাড়পত্র নিয়ে এগিয়ে যেতে পারবে না আর কেউ; আসবে না আর লেলিহান আগুনের ঢেউ...

তোপখানা রোড, ঢাকা থেকে

.

অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা

এমএইচ উল্লাহ ॥ প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন ঝড়-ঝঞ্ঝা, বজ্রপাত, নদ-নদী, সমুদ্রের পানি স্ফীত হয়ে মানব বসতি পানিতে তলিয়ে প্রায়শই দেশে অগণিত মানুষ মারা যায়, কিন্তু একবার অগ্নিকান্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটলে একসঙ্গে অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটে যেমন প্রাণহানি ঘটেছে পুরান ঢাকার চকবাজারে। নিমিষেই অগ্নিকান্ডের ফলে ৭০ জন মানুষের প্রাণ গেল আর আহত হলেন অনেকেই। বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার ফলে প্রতিদিনই বেশকিছু মানুষ মারা যায়। এই ধরনের অপমৃত্যু পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে তেমন একটা দেখা যায় না। সেদিন ঢাকার ভাসানটেকে অগ্নিকা-ের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আগুন নির্বাপক বাহিনী অর্থাৎ ‘ফায়ার-ব্রিগেড’ এর লোকজন এসে তাদের তাৎক্ষণিক প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে। চকবাজারে অগ্নিকান্ডের মূল কারণ মজুদ বিস্ফোরক দ্রব্যের গুদামে আগুন লাগা। এই ধরনের দাহ্য পদার্থ গুদামে রাখা মোটেই নিরাপদ নয়, তা জেনেও কিছু লোভী মানুষ এসব দাহ্য পদার্থ বেজমেন্টের গুদামে গুদামজাত করে রাখে। ওয়াহেদ টাওয়ারের বেজমেন্টে এসব বিস্ফোরক দ্রব্য গুদামজাত করে রাখা হয় যদিও এরূপ স্থানে এ ধরনের দাহ্য পদার্থ রাখা কোন নিয়ম নেই। একবার আগুন লেগে গেলে মুহূর্তেই মানুষ, ধনসম্পদ, ঘরবাড়ি ও গৃহপালিত জীব-জন্তু মৃত্যু অবধারিত হয়ে পড়ে। পূর্বেও এখানে এ ধরনের অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে এবং জান-মালের প্রভূত ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। উন্নত দেশেও অগ্নিকা-ের মতো ঘটনা ঘটে এবং প্রাণহানি ও ধন-সম্পদ বিনষ্টের মতো ঘটনা ঘটে। এ সবের কারণ অনুসন্ধান করে জানা গেছে ব্যক্তিগত আক্রোশ ও অসন্তুষ্টির জন্যই এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক সময় গোষ্ঠীগত ও দলগত মতভেদের জন্য এ ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটে থাকে।

অগ্নিকান্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা যাতে না ঘটে সেদিকে সংশ্লিষ্ট সকলেরই সজাগ থাকতে হবে। ঘনবসতি এলাকায় বিশেষ করে পুরান ঢাকায় ও বস্তি এলাকায় দাহ্য পদার্থের গুদাম যাতে না থাকে সেইদিকে সরকার থেকে শুরু করে সকল নগরবাসীদের সজাগ থাকতে হবে, কারণ একবার অগ্নিকান্ডের মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটলে প্রাণহানি ঘটবেই। অনেক সময় অনেক সিদ্ধান্তই নেয়া হয়, সেটা ভেবেচিন্তেই হোক আর তাড়াহুড়া করেই হোক, কিন্তু অনেক সময় সমন্বয়হীনতার অভাবে সেই সব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয় না। অতীব গুরুত্বের সঙ্গে এই বিষয়টিতে সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টিদান করা উচিত।

কলাবাগান, ঢাকা থেকে

.

সুপারিশের বাস্তবায়ন জরুরী

অলোক আচার্য ॥ একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে দেশবাসী যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিল ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর, তখন পুরান ঢাকার চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকা-ে পুরো জাতি হতবিহবল, স্তম্ভিত। সবার চোখ ছিল টিভি পর্দায়। একের পর এক মৃতদেহ, পোড়া, আধপোড়া। কত মানুষের স্বপ্ন নিমেষেই ছাই হয়ে গেল। এক স্বামী তার সন্তানসম্ভবা স্ত্রীসহ নামতে পারেননি, নিজেও পুড়েছেন। আহারে! তাদের সন্তান তাদের ভালবাসা সব পুড়ে গেল নিমেষেই। দিনের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুন নিভে যেতে থাকে। সেই সঙ্গে নিহতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে পুড়ে যাওয়া স্বপ্নের সংখ্যা। নিমতলীর পর চকবাজার। দুই এলাকার দুরত্বও বেশি নয়। আগুনের সূত্রপাত গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে। আর আগুন দ্রুতগতিতে বিস্তার লাভ করেছিল কেমিক্যালের কারণে। নিমতলীতেও ভয়াবহ আগুনের পেছনে এই কেমিক্যাল ছিল। আমাদের দেশে প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকান্ডে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়। নিমতলীর এই ভয়াবহ অগ্নিকা-ে ১২৪ জন মারা যাওয়ার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি সেখান থেকে রাসায়নিক গুদাম সরানোসহ ১৭টি সুপারিশ করেছিল। তারপর বহু বছর পার হয়ে গেছে। সুপারিশ কাগজেই রয়ে গেছে। রাসায়নিক গুদাম যেভাবে ছিল সেভাবেই রয়ে গেছে। তারপর আবার এই চকবাজার ট্র্যাজেডি। এবারও তদন্ত কমিটি হয়েছে। সেই সুপারিশ এবং তা বাস্তবায়নের কথা ঘুরেফিরেই আসছে। কারণ সুপারিশ যদি বাস্তবায়িত না হয় তাহলে সেই সুপারিশে মানুষের লাভ কোথায়।

জনগণের জীবন নিয়ে যারা ছেলেখেলা করে তাদের বিরুদ্ধে জোরদার পদক্ষেপ কেন নেয়া হয় না। দুর্ঘটনা ঘটার পর অনেক কিছু করার প্রতিশ্রুতি দেয়ার চেয়ে আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে সেই দিনটাই হয়ত আর দেখতে হয় না। গাড়িতে মেয়াদ উত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার বহনের পাশাপাশি বাড়িতেও কিন্তু এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে বহু অগ্নিাকান্ডের ঘটনা এবং তার ফলে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। আমাদের চোখের সামনেই যে কোন দোকানে গ্যাসের সিলিন্ডার বিক্রি করতে দেখা যায়। অথচ আইন অনুযায়ী এই গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রির জন্য অনুমতির প্রয়োজন এবং সব ধরনের দোকানে বা যত্রতত্র বিক্রি করা যায় না। আবার এই সিলিন্ডারগুলোর মেয়াদ কতটা সতর্কতার সঙ্গে নির্ণয় করা হয় তাই বা কতজন ব্যবহারকারী জানে। চকবাজারে আগুন দ্রুত ছড়ানো এবং ভয়াবহতার পেছনে কেমিক্যালের প্রভাব রয়েছে। যে স্থাপনায় মূলত আগুন লেগেছে সেখানকার বেসমেন্টে প্রচুর কেমিক্যালের ড্রামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। প্রশ্ন হলো একটি রাসায়নিক পল্লী তৈরির কাজ আর কতদূর? অথচ এ রকম একটা ঘিঞ্জি স্থানে কেমিক্যাল ব্যবসা ঝুঁকিপূর্ণ। নিমতলীর মতো একটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডি ঘটার পর খুব দ্রুত অগ্রাধিকার ভিত্তিতে একটি আলাদা স্থানে কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে নেয়ার কথা ছিল। এ রকম বহু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ আমাদের চোখের সামনেই হয় এবং কিছুই হবে না ভেবে মেনেও নেই। তবে দুর্ঘটনা ঘটার পর আর করার কিছুই থাকে না। নিমতলী ট্র্যাজিডিও দেখতে দেখতে আট বছর পেরিয়ে গেছে। যে কোন স্থানেই অগ্নিকান্ডের মতো দুর্ঘটনা ঘটার পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা যাতে সহজেই আগুন নেভানোর কাজটি করতে পারে তার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে বাড়িঘর তৈরি করতে হবে। এর আগেও জলাশয়ের অভাবে আগুন নেভানোর কাজ ত্বরান্বিত করা যায়নি। অথচ ঢাকা শহরের এমন অবস্থা যে হাতেগোনা কয়েকটি জলাশয় অবশিষ্ট আছে। দখলের কবলে সব জলাশয়। বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট মহলে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত। অতীত থেকে শিক্ষা নেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। নাহলে নিমতলী বা চকবাজারের মতো দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।

পাবনা থেকে

.

কার্যকর পদক্ষেপ

নুরুল আমিন ॥ কোন বিপদ বা দুর্যোগ কখনও কাউকে বলে-কয়ে আসে না। যে কোন সময়ই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বিপদের কোন হাত-পা নেই। অন্যান্য দুর্যোগের পাশাপাশি অগ্নিকান্ড একটি বড় ধরনের সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য পূর্বাভাস থাকলেও অগ্নিকান্ডের কোন পূর্বাভাস নেই। এমনকি নদী ভাঙ্গনের কবল থেকে মানুষ জীবন বাঁচাতে স্থানান্তর হওয়ার সুযোগ পেলেও অগ্নিকান্ডের বেলায় তা হয় না। হয় আগুনে পুড়ে মরতে হয়, না হয় দগ্ধ হয়ে বেঁচে থাকতে হয়। সেই সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

দেশে অগ্নিকান্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। এতে জীবনহানি ও হতাহতদের সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি কোটি কোটি টাকার সম্পদ বিনাশ ও ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। যা আমাদের জন্য আদৌ সুখকর নয়।

অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা কখন ঘটবে তা জানার বা অনুমান করার উপায় নেই এ কথা সত্য। কিন্তু সচেতন হলে দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। সাধারণত আমাদের জীবনমান উন্নয়নের সরঞ্জামাদি অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা ঘটার জন্য বিশেষভাবে দায়ী। যেমন বিদ্যুতের শর্টসার্কিট, গ্যাসের চুলা, গ্যাস লাইন লিকেজ হওয়া, বৈদ্যুতিক ত্রুটি বা লিকেজ তার, গ্যাস সিলিন্ডার, রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্য, লাকড়ির চুলা, সিগারেটের আগুন ইত্যাদি নানা কারণে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কলকারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হোটেল ও বাসাবাড়িতে অসতর্কতার কারণে আগুন লেগে থাকে।

বিদ্যুত লাইন, গ্যাসলাইন, গ্যাসের চুলা ও গাড়ির সিলিন্ডারসহ জ্বালানি সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত এসব জিনিস তৈরির সরঞ্জামের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। যেমন মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা নিম্নমানের বিদ্যুতের তার বা গ্যাসলাইনের পাইপ লিকেজ হয়ে অথবা মানহীন গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে আগুনের গোলা ছড়াতে পারে। তাই এগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে কড়া নজর জরুরী।

অগ্নিকান্ডের দুর্ঘটনা এড়াতে যেসব পদক্ষেপ নেয়া একান্ত জরুরী সেগুলো হচ্ছে আবাসিক এলাকায় কোন কারখানা করতে না দেয়া, প্রত্যেক গৃহে বা প্রতিষ্ঠানে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করে রাখা, পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা, ফায়ার সার্ভিসের জরুরী ফোন নম্বর রাখা ও খবর দেয়া, এলাকার সব রাস্তা ও গলি প্রশস্ত করা, কোন যানজট সৃষ্টি হতে না দেয়া, এলাকাভিত্তিক পর্যাপ্ত পানি স্প্রে করার মতো ব্যবস্থা করা, মানসম্মত জ্বালানি সরঞ্জাম ব্যবহার করা, জ্বলন্ত সিগারেট যেখানে সেখানে না ফেলা ইত্যাদি। আবাসিক এলাকা থেকে ফ্যাক্টরি বা কারখানা সরানোর বিষয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান ও বাধ্যতামূলক নিয়ম করা দরকার।

কোথাও আগুন লাগলে দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা ও নেভানো, লোকজন উদ্ধার করা, অন্যত্র সরিয়ে নেয়া এবং হতাহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ, জনবল ও সরঞ্জাম সর্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন। দেশের বিভিন্ন স্থানে বছরের বিভিন্ন সময় আগুন লেগেই থাকে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের দক্ষ জনবল ও সরঞ্জাম প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রত্যেক এলাকায় ছাত্র, যুবক ও তরুণদের দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য তৈরি করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করা একান্ত উচিত। অগ্নিকান্ডের মতো ভয়াবহ ক্ষতিকর দুর্যোগ এড়াতে ও মোকাবেলা করতে সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এতে যে ধরনের প্রস্তুতি থাকা দরকার তার জন্য সময়োপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে। এর জন্য সরকার প্রয়োজনে কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অগ্নিকান্ড থেকে জনগণের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকার এ বিষয়ে অনতিবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন।

লালমোহন, ভোলা থেকে

.

জীবন কি এত সস্তা!

মোঃ তাসনিম হাসান (আবির) ॥ প্রত্যেক মানুষের কাছে তার জীবনটাই সব থেকে দামী, সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান। মানুষ এই জীবনের জন্য কতকিছুই না করে! নিজের জীবনের স্বাভাবিক পরিসমাপ্তির জন্য মানুষ কত অর্থ খরচ করে কত দূর-দূরান্তেই না যাচ্ছে। এই ক্ষুদ্র জীবনে যেমনি স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে এসেছি, তেমনি স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবী থেকে চলে যেতে চাই। কিন্তু অনেক সময় অনেকের ভাগ্যে সেই স্বাভাবিক মৃত্যু জুটে না। আগুনে পুড়ে মরার মতো দুঃসহ মৃত্যুও অনেকের কপালে থাকে। জন্ম, মৃত্যু এগুলা আমাদের হাতে নাই। কিন্তু মানুষ হিসেবে আমরা সাবধানতা অবলম্বন করতে পারি, আর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনকে স্বাভাবিক গতিপথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু আমাদের সমস্যা আমরা ভুল থেকে শিক্ষা নেই না। একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে ক্ষতির পরিমাণটা আরও বাড়িয়ে দেই।

পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম সরিয়ে নিতে ‘বিসিক কেমিক্যাল পল্লী’ নামের ২০২ কোটি টাকার একটি অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্প্রতি কাজ শুরু করেছে বিসিক। আগুনের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে যে কেমিক্যাল দায়ী যদি তা সরিয়ে নেয়া যায় তাহলে ভবিষ্যতে হয়ত আর কোন নিমতলী বা চকবাজারের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হতে হবে না দেশবাসীকে। এসব ঘটনার পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসকে বেগ পেতে হয়েছে আরও কয়েকটি কারণে। তার কয়েকটি হলো ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির প্রবেশমুখ সরু, ঘটনাস্থল থেকে পানির উৎসের দুরত্ব।

বাংলাদেশে গত ১০ বছরে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছে ১৫৯০ জন। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস ও ফায়ার ডিফেন্স অধিদফতরের ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য পাওয়া যায়। এই সময়ের মধ্যে সব থেকে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে ২০১০ সালে, পুরান ঢাকার নিমতলীতে। এতে ১২৪ জন নিহত হয়। এরপর সাভারের আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয় ১১১ জন। এরপরে আরও অনেক ছোট বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। কিন্তু গত ২০ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে আরও একটি বড় অগ্নিকাণ্ড। যেখানে নিহত হয় প্রায় ৭০ জন। কম বেশি হতে পারে। মুহূর্তের মাঝেই আগুনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে রাস্তা থেকে আবাসিক ভবন পর্যন্ত। ঝরে যায় এতগুলা তাজা প্রাণ। সম্পদের ক্ষতির পরিমাণটাও নেহাত কম নয়। নিমতলীর ঘটনার পর তদন্ত কমিটির প্রণীত সুপারিশ আলোর মুখ দেখেনি। চকবাজারের ওই ঘটনাস্থলে যে কয়েকটি ভবনে আগুন ছড়িয়ে পড়ে সেখানের অনেকগুলোতে রাসায়নিক গুদাম আছে। সেখানে তারা খুব ভালভাবেই ব্যবসায় চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের সেখান থেকে সরিয়ে অন্যত্র নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তরের কোন উদ্যোগ আগে নেয়া হয়নি। আজকে যারা লোভের কারণে বেশি টাকা ভাড়া পাওয়ার আশায় এই গুদামের জন্য ভাড়া দেয়, দেখা গেছে তারাও এই আগুনে পুড়ে মারা গেছে। এটাই নির্মম সত্য। এই আগুনের ফলে কত মায়ের কোল খালি হয়ে গেছে, কত সন্তান বাবা, মা হারা হয়েছে, কত পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছে। কিছু লাশ শনাক্তও করা যাচ্ছে না এমনভাবে পুড়ে গেছে। ঢাকা মেডিক্যালে শিশুসন্তান তার মায়ের লাশ শনাক্তের জন্য ডিএনএ টেস্ট করছে। কত নির্মম দৃশ্য। আমরা হয়ত এই শোকও কয়েকদিন পর ভুলে যাব। হয়ত নতুন কোন ঘটনা আসবে, যার ফলে এই ঘটনা পেছনে পড়ে যাবে। কিন্তু যেই পরিবারের সদস্য নিহত হলো বা যেই পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হলো তাদের জন্য এটা ভোলা কখনও সম্ভব না। সারাজীবন তারা এটি বহন করে বেড়াবে। এর থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং ভবিষ্যত এ আরও সচেতন হতে হবে। একটা সমাজে বসবাস করে আমরা স্বাভাবিক মৃত্যু অবশ্যই আশা করতে পারি। কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় আমরা অবশ্যই আশা করতে পারি যে, আমরা নিরাপদে বাসায় ফিরব। আবার রাতে বাসাবাড়িতে ঘুমানোর সময়ও আমরা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যাওয়ার আশা রাখতে পারি। আর তার জন্য প্রয়োজন সবকিছুর সঠিক নিরাপত্তা ও সুষ্ঠু ব্যবহার করা। রাসায়নিক দ্রব্যের গুদামগুলোকে নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। আবাসিক এলাকায় বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এগুলোর লাইসেন্স দেয়া যাবে না। প্রতিনিয়ত এসব এলাকা তদারকি করতে হবে যেন কেউ অবৈধভাবে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম গড়তে না পারে। আর যে নির্দিষ্ট এলাকায় এই গুদামগুলা করা হবে সেখানেরও নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। আমরা সমাজের মানুষেরা যদি একটু সচেতন হই তাহলেই এসব অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব। মানুষের জীবনের মূল্য কোনকিছুতে বিনিময় বা পূরণ করা যায় না। সম্পদের ক্ষতি হয়ত বা দীর্ঘ সময় নিয়ে পূরণ করা যাবে। কিন্তু মানুষের জীবন না। তাই আমাদের পরিবারের কথা ভেবে, দেশের কথা ভেবে নিজেদের জীবনকে অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা থেকে এড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। চকবাজার থেকে রাসায়নিক দ্রব্যের গুদাম সরানোর এখনই উপযুক্ত সময়। আশা করি উর্ধতন কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে জরুরী যথাযথ পদক্ষেপ নেবে। আর যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারকে সহায়তা করবে এবং যারা আহত হয়েছেন তাদেরও প্রয়োজনীয় সকল সুবিধা প্রদান করা হবে। জাতির এই শোকের সময় আমাদের সকলকে একত্রে থাকতে হবে এবং সমাজের সমস্ত মানুষকে তার নিজস্ব জায়গা থেকে সহায়তা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন কিন্তু সস্তা না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে

.

প্রতিরোধে করণীয়

মুহাম্মদ রকিব মিয়া ॥ জনশ্রুতি আছে বাড়িতে চোর-ডাকাত পড়লে অন্তত কিছু জিনিসপত্র রক্ষা পায়, কিন্তু আগুন লাগলে ছাই ছাড়া কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না। সম্প্রতি ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টিতে এক ভয়াবহ অগ্নিকান্ড সংঘটিত হয়েছে। এতে ৭০ জনেরও বেশি লোক মারা গেছে। আহত হয়েছে অনেকেই। একই রকম ঘটনা ঘটেছিল নিমতলীতে। তখন শতাধিক লোকের প্রাণহানি ঘটেছিল। জানা গেছে অত্র এলাকায় প্রচুর পরিমাণে কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থের মজুুদ রয়েছে। ফলে কোথাও আগুনের স্ফুলিংগ দেখা গেলেই অল্প সময়ের মধ্যে তা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। বিস্ফোরণ ঘটে আগুনের লেলিহান শিখা ভয়ংকর ভাবে দিকবিদিক ছড়িয়ে পড়ে। এলাকার সরু গলি দিয়ে দ্রুত গতিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে পারে না। ফলে আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একে তো সরু গলি তার ওপর উৎসুক জনতার ভিড়, সব মিলিয়ে একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থা দেখা যায় অগ্নিকান্ডের স্থলে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। দোষারোপ করলে আঙ্গুল যেমন সরকারের দিকে থাকে তেমনি এলাকাবাসীর দিকেও। সরকারের পাশাপাশি এলাকাবাসিরও অনেক দায়িত্ব রয়েছে অগ্নিকান্ডরোধে। ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেছে। কথায় বলে চোর পালালে বুদ্ধি বারে। এখন সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে এবং এলাকাবাসীকে সহযোগিতা করতে হবে যাতে এমন ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না হয়। জানা গেছে চকবাজার এলাকায় অগ্নিনির্বাপণের জন্য পর্যাপ্ত জলাধার নেই। এ জন্য সরকার এবং এলাকাবাসীর যৌথ উদ্যোগে একাধিক গভীর কূপ খনন করা যেতে পারে। প্রতিটি দোকানে ও বাসাবাড়িতে বালতি ভর্তি বালু রাখতে হবে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বালু ছিটিয়ে দিলে অনেক উপকারে আসে। উৎসুক দর্শক না হয়ে সবাইকে অগ্নিনির্বাপণ এবং আহতদের হাসপাতালে নেয়ার কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে ঘণ্টা বাজাতে হবে, যাতে বাসাবাড়িতে অবস্থানরত মানুষ দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারে নিরাপদ স্থানে। স্থানীয় মসজিদ হতে মাইকিং করতে হবে বার বার। সাংবাদিকদের খবর সংগ্রহের কাজের পাশাপাশি অগ্নিনির্বাপণ কাজে অংশগ্রহণ করা জরুরী। তাদের বুঝতে হবে মানুষ মানুষের জন্য। তাদের জানমাল রক্ষা করা ফরয কাজ। দোকান ও বাসাবাড়ির মালিকদের ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। মৃত্যুর পর দোকান-বাড়িঘর সবই পড়ে থাকবে। কে জানে ওই আগুনের লেলিহান শিখা আপনার ঘর ছারখার করে দেবে কিনা। তাই রাস্তা সরু করার জন্য যার যতটুকু জায়গা ছাড় দেয়া প্রয়োজন ছেড়ে দিন। সরকারকে রাস্তা প্রশস্ত করার কাজে সহযোগিতা করুন। মনে রাখতে হবে বার বার এভাবে আগুনে পুড়ে মরার চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এই মুহূর্তে জরুরী। আমরা দেশবাসী এ ধরনের বীভৎস অপমৃত্যুর মিছিল আর দেখতে চাই না। সরকার চকবাজার থেকে কেমিক্যাল ও দাহ্য পদার্থ সরিয়ে ফেলার জন্য যখন বদ্ধপরিকর, তখন দেখলাম এক শ্রেণীর কুচক্রী মহল তাতে বাধা প্রদান করছে। এটা লজ্জাকর। সরকারকে সহযোগিতা না করলে সরকার কিভাবে আপনার আমার জানমালের হেফাজত করবে। মোদ্দাকথা কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের রক্ষা নিজেদেরই করতে হবে। সরকার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যা করে দেবে সেটা বোনাস।

শ্রীনগর, মুন্সীগঞ্জ থেকে